এক কলস পানির সংগ্রাম থেকে উদ্যোক্তা, ঝর্ণার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

ঘরে পানি আসায় ঝর্ণার জীবনে দুটো বড় পরিবর্তন হলো। এক. পরিবারের ডায়রিয়া, কলেরা বা গ্যাস্ট্রিকের মতো রোগবালাই কমে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ কমে যাচ্ছে। দুই. পানির খোঁজে যে সময় নষ্ট হতো ঝর্ণার, সে সময় বাঁচতে শুরু করল।

তানভীর তুষার
তানভীর তুষার

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১২: ১৯
খুলনার পাইকগাছায় নিজের সবজিখেতে কাজ করছেন ঝর্ণা সরকার। স্ট্রিম ছবি

খুলনার পাইকগাছার জিরবুনিয়া গ্রাম। উপকূলের এই গ্রামের ঝর্ণা সরকারের সকালটা একসময় শুরু হতো অন্যরকম এক যুদ্ধে। ঘুম থেকে উঠে ছুটতে হতো এক কলস নিরাপদ পানির খোঁজে। কখনো বহু দূরের নলকূপ, কখনো বা প্রতিবেশীর দুয়ার, একটু খাওয়ার পানির জন্য দিনের অনেকটা সময় চলে যেত তাঁর।

৩৬ বছরের ঝর্ণার সংসারে স্বামী, ছেলে আর বৃদ্ধ শ্বশুর। উপকূলের মাটিতে তখন লবণাক্ততার থাবা। চাষাবাদে ফলন নেই, সংসারে অভাব লেগেই আছে। এর মধ্যে নদীর পানি নোনা, ভূগর্ভস্থ পানিও পানের অযোগ্য।

অতীতের স্মৃতি হাতড়ে ঝর্ণা বলেন, ‘নিরাপদ পানি তখন আমাদের কাছে বিলাসের মতো। এত কষ্ট করে পানি আনতাম, তবু সেই পানি খেয়ে বাড়ির সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ত।’

হতাশার এই আঁধার কাটতে শুরু করে একটি সরকারি উদ্যোগে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুরু হয় ‘জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)’ প্রকল্প। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও ইউএনডিপির সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় মানুষের জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো।

প্রকল্পের আওতায় ঝর্ণাকে দুই হাজার লিটারের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি ট্যাংক দেওয়া হয়। কীভাবে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সেটার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় তাঁকে। এরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট।

ঝর্ণার ভাষায়, ‘প্রথমবারের মতো মনে হলো, নিরাপদ পানি এখন আমাদের ঘরেই। পানির জন্য আর মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় না।’

ঘরে পানি আসায় ঝর্ণার জীবনে দুটো বড় পরিবর্তন হলো। এক. পরিবারের ডায়রিয়া, কলেরা বা গ্যাস্ট্রিকের মতো রোগবালাই কমে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ কমে যাচ্ছে। দুই. পানির খোঁজে যে সময় নষ্ট হতো ঝর্ণার, সে সময় বাঁচতে শুরু করল।

আগে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগত। এখন মনে হয়, আমি পারি। পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই সবচেয়ে বড় শান্তি। ঝর্ণা সরকার, উদ্যোক্তা

এই বেঁচে যাওয়া সময়টাই ঝর্ণাকে নতুন পথ দেখাল। জিসিএ প্রকল্পের আওতায় ‘পদ্মা উইমেনস লাইভলিহুড প্রোগ্রামে’ যুক্ত হলেন তিনি। আরও ২৫ জন নারীর সঙ্গে শিখলেন বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি আর অ্যাকুয়া-জিওপনিক্স পদ্ধতি। রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার দিয়ে কীভাবে বিষমুক্ত সবজি ফলাতে হয়, সেটাও জানলেন। পেলেন বাজারজাতকরণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার তালিম।

প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজের বাড়ির ছোট্ট উঠোনটিকেই কৃষিখামার বানিয়ে ফেললেন ঝর্ণা। পরিবারের পুষ্টি মিটিয়ে সেই সবজি এখন বাজারেও যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই শুধু সবজি বেচে তাঁর আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৭৫ টাকা।

ঝর্ণা বলেন, ‘আগে বাজার থেকে সবজি কিনতে হতো। এখন নিজেরাই খাই, আবার বিক্রিও করি।’

শুধু সবজি নয়, নিজের জমানো হাজারখানেক টাকা দিয়ে হাঁসের বাচ্চা কিনেছিলেন তিনি। এখন তাঁর খামারে বেশ কয়েকটি হাঁস। ডিম বিক্রি করে আসছে বাড়তি টাকা।

যে নারী একসময় এক কলস পানির জন্য দিনের অর্ধেক সময় পার করতেন, তিনি এখন পরিবারের অর্থনীতির অন্যতম খুঁটি। নিজের নামে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন, নিয়মিত সঞ্চয় করছেন ভবিষ্যতের জন্য।

ঝর্ণা বলেন, আগে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগত। এখন মনে হয়, আমি পারি। পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই সবচেয়ে বড় শান্তি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত