মাহজাবিন নাফিসা

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কে, জিজ্ঞেস করলে অনেকেই নির্দ্বিধায় বলবেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম। যদি প্রেসিডেন্টই আমেরিকার একমাত্র চালিকাশক্তি হন, তাহলে কেন একজন প্রেসিডেন্ট চলে যাওয়ার পরও বহু নীতি একই ধারায় চলতে থাকে? আবার রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা অনেক ক্ষেত্রেই একই বড় কর্পোরেশনের স্বার্থের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। কেনই বা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সমাজ বারবার মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে?
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘মাল্টিকালচারালিজম’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবস্থাকে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, ক্ষমতার বহুস্তরবিশিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সেই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো করপোরেট ক্ষমতা।
কানাডীয় দার্শনিক উইল কিমলিকার বলেছেন, ‘উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই বৈচিত্র্যকে রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই মাল্টিকালচারালিজম’। অর্থাৎ ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষকে নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে সমান অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করার সুযোগ দেওয়া হয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষ থাকার কারণে এর প্রভাব সমাজ ও রাজনীতেও পড়ে।
নিউইয়র্কের মতো প্রধান বা বড় কোনো শহরে গেলে দেখা যাবে, একই রাস্তায় পাশাপাশি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, কোরিয়ান সুপারশপ, মেক্সিকান খাবারের দোকান বা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। এই বৈচিত্র্যই আধুনিক আমেরিকার পরিচয়।
উইল কিমলিকা তাঁর ‘মাল্টিকালচারাল সিটিজেনশিপ’ বইয়ে বলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু সবার জন্য একই আইন করাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষকে সমান মর্যাদা দেওয়াও জরুরি। অন্যদিকে দার্শনিক চার্লস টেলর তাঁর ‘দ্য পলিটিক্স অব রিকগনিশন’ প্রবন্ধে বলেছেন, মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ নিজের সংস্কৃতি চর্চা করতে না পারলে দেশের শাসনব্যবস্থার প্রতি তারা আস্থা ও আগ্রহ হারিয়ে বিরূপ মনোভাবের দিকে চলে যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে তার দেশের সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিতে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে।
চীনের বিখ্যাত খাবার হলো ‘হটপট।’ একটি বড় গরম পাত্র বা হটপটে ঝাল স্যুপ বা ব্রথ জ্বাল হতে থাকে। এতে মাংসের টুকরা, সবজি ইত্যাদি সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শকে এর সঙ্গে তুলনা করে ‘মেল্টিং পট’ বলা হত। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ নিজেদের পুরোনো পরিচয় ছেড়ে একটি নতুন ‘আমেরিকান’ পরিচয়ে মিশে যাবে।
কিন্তু ১৯৬৫ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’-এর পর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে অভিবাসন দ্রুত বাড়তে থাকে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক বাস্তবতাও বদলে যায়। আজকের আমেরিকাকে তাই অনেকেই ‘স্যালাড বোল’-এর সঙ্গে তুলনা করেন—যেখানে সবাই একই সমাজের অংশ হয়েও নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখে।
এই পরিবর্তন শুধু সমাজকে নয়, রাজনীতি ও অর্থনীতিকেও নতুন রূপ দিয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার ও ইউএস সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। ফলে অভিবাসন, জাতিগত পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এখন নির্বাচনী রাজনীতিরও অন্যতম বড় ইস্যু।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অনেকবারই প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে, তবে অনেক নীতি কেন একই ধারায় চলছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানী সি রাইট মিলস ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পাওয়ার এলিট’ বইয়ে যুক্তি দেন এভাবে:
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র শুধু নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের হাতে নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বড় করপোরেশন এবং সামরিক নেতৃত্ব—এই তিন শক্তির সমন্বয়ে একটি পাওয়ার এলিট গড়ে উঠেছে। একই সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে এই গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণে সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত করেন সমাজবিজ্ঞানী জি উইলিয়াম ডমহফ। তাঁর বহুল আলোচিত ‘হু রুলস আমেরিকা’ গবেষণায় তিনি ক্লাস ডমিনেশন থিওরি উপস্থাপন করেন। ডমহফের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, করপোরেট বোর্ড, থিংক ট্যাংক এবং ব্যবসায়িক সংগঠন মিলেই একটি ‘করপোরেট কমিউনিটি’ গড়ে তুলেছে। ডমহফের দাবি, তারা সরাসরি রাষ্ট্র না চালিয়ে অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক অনুদান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও লবিংয়ের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করে।
ওয়াল স্ট্রিট শুধু শেয়ারবাজার নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেন্দ্র। ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড ও স্টেট স্ট্রিটের মতো সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে এবং হাজারো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে।
এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব নীতিনির্ধারণেও পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। যদিও অন্য গবেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান মূলত বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিচালনা করে। তাই তাদের প্রভাব নিয়ে অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
তবে একটি বিষয় নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই—করপোরেট স্বার্থ ও সরকারের মধ্যে অন্যতম বড় সংযোগ হলো লবিং।
যুক্তরাষ্ট্রে লবিং একটি বৈধ প্রক্রিয়া। ব্যক্তি, শ্রমিক সংগঠন, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, ওষুধ, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের বড় কোম্পানিগুলোও কংগ্রেস ও সরকারের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা ওপেন সিক্রেটসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এই লবিং কার্যক্রমে বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকভাবেই বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্টিন গিলেনস ও বেঞ্জামিন পেইজের গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অভিজাত ও সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর মতামত সরকারি নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সাধারণ নাগরিকের পছন্দ একাই নীতিনির্ধারণে সমান প্রভাব ফেলতে পারে না। যদিও এই গবেষণা নিয়েও একাডেমিক বিতর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং সরকারি ডিইআই (ডাইভার্সিটি, ইকুইটি, ইনক্লুশন) কর্মসূচির বিরোধিতাকে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, অতিরিক্ত অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তা, শ্রমবাজার ও ঐতিহ্যগত আমেরিকান পরিচয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসী মেধার ওপর নির্ভরশীল। তাই বহুসংস্কৃতিবাদ দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
এই বিতর্ককে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও জোসেফ নাই। হান্টিংটন মনে করেন, অতিরিক্ত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য জাতীয় পরিচয়কে দুর্বল করতে পারে। বিপরীতে নাই যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের উন্মুক্ত সমাজই তার ‘সফট পাওয়ার’-এর অন্যতম উৎস। বিশ্বের সেরা মেধাকে আকর্ষণ করার ক্ষমতাই দেশটিকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে রেখেছে।
এক শব্দে এর উত্তর পাওয়া কঠিন। প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবান, কিন্তু তিনি একা নন। কংগ্রেস, আদালত, অঙ্গরাজ্য সরকার, সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, লবিং গ্রুপ, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহুসংস্কৃতির সমাজ—সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো।
সি রাইট মিলস ও জি উইলিয়াম ডমহফ আমাদের মনে করিয়ে দেন, করপোরেট এলিট ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের প্রভাব বাস্তব এবং তা বোঝা জরুরি। আবার কিমলিকা, চার্লস টেলর ও জোসেফ নাই দেখান, বহুসংস্কৃতিবাদ শুধু সামাজিক মূল্যবোধ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাই নির্বাচিত সরকার, শক্তিশালী করপোরেট স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী এবং বহুসংস্কৃতির সমাজ—এই সবকটির প্রতিযোগিতা ও ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কে, জিজ্ঞেস করলে অনেকেই নির্দ্বিধায় বলবেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম। যদি প্রেসিডেন্টই আমেরিকার একমাত্র চালিকাশক্তি হন, তাহলে কেন একজন প্রেসিডেন্ট চলে যাওয়ার পরও বহু নীতি একই ধারায় চলতে থাকে? আবার রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা অনেক ক্ষেত্রেই একই বড় কর্পোরেশনের স্বার্থের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। কেনই বা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সমাজ বারবার মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে?
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘মাল্টিকালচারালিজম’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবস্থাকে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, ক্ষমতার বহুস্তরবিশিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সেই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো করপোরেট ক্ষমতা।
কানাডীয় দার্শনিক উইল কিমলিকার বলেছেন, ‘উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই বৈচিত্র্যকে রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই মাল্টিকালচারালিজম’। অর্থাৎ ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষকে নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে সমান অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করার সুযোগ দেওয়া হয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষ থাকার কারণে এর প্রভাব সমাজ ও রাজনীতেও পড়ে।
নিউইয়র্কের মতো প্রধান বা বড় কোনো শহরে গেলে দেখা যাবে, একই রাস্তায় পাশাপাশি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, কোরিয়ান সুপারশপ, মেক্সিকান খাবারের দোকান বা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। এই বৈচিত্র্যই আধুনিক আমেরিকার পরিচয়।
উইল কিমলিকা তাঁর ‘মাল্টিকালচারাল সিটিজেনশিপ’ বইয়ে বলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু সবার জন্য একই আইন করাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষকে সমান মর্যাদা দেওয়াও জরুরি। অন্যদিকে দার্শনিক চার্লস টেলর তাঁর ‘দ্য পলিটিক্স অব রিকগনিশন’ প্রবন্ধে বলেছেন, মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ নিজের সংস্কৃতি চর্চা করতে না পারলে দেশের শাসনব্যবস্থার প্রতি তারা আস্থা ও আগ্রহ হারিয়ে বিরূপ মনোভাবের দিকে চলে যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে তার দেশের সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিতে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে।
চীনের বিখ্যাত খাবার হলো ‘হটপট।’ একটি বড় গরম পাত্র বা হটপটে ঝাল স্যুপ বা ব্রথ জ্বাল হতে থাকে। এতে মাংসের টুকরা, সবজি ইত্যাদি সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শকে এর সঙ্গে তুলনা করে ‘মেল্টিং পট’ বলা হত। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ নিজেদের পুরোনো পরিচয় ছেড়ে একটি নতুন ‘আমেরিকান’ পরিচয়ে মিশে যাবে।
কিন্তু ১৯৬৫ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’-এর পর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে অভিবাসন দ্রুত বাড়তে থাকে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক বাস্তবতাও বদলে যায়। আজকের আমেরিকাকে তাই অনেকেই ‘স্যালাড বোল’-এর সঙ্গে তুলনা করেন—যেখানে সবাই একই সমাজের অংশ হয়েও নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখে।
এই পরিবর্তন শুধু সমাজকে নয়, রাজনীতি ও অর্থনীতিকেও নতুন রূপ দিয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার ও ইউএস সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। ফলে অভিবাসন, জাতিগত পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এখন নির্বাচনী রাজনীতিরও অন্যতম বড় ইস্যু।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অনেকবারই প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে, তবে অনেক নীতি কেন একই ধারায় চলছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানী সি রাইট মিলস ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পাওয়ার এলিট’ বইয়ে যুক্তি দেন এভাবে:
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র শুধু নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের হাতে নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বড় করপোরেশন এবং সামরিক নেতৃত্ব—এই তিন শক্তির সমন্বয়ে একটি পাওয়ার এলিট গড়ে উঠেছে। একই সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে এই গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণে সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত করেন সমাজবিজ্ঞানী জি উইলিয়াম ডমহফ। তাঁর বহুল আলোচিত ‘হু রুলস আমেরিকা’ গবেষণায় তিনি ক্লাস ডমিনেশন থিওরি উপস্থাপন করেন। ডমহফের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, করপোরেট বোর্ড, থিংক ট্যাংক এবং ব্যবসায়িক সংগঠন মিলেই একটি ‘করপোরেট কমিউনিটি’ গড়ে তুলেছে। ডমহফের দাবি, তারা সরাসরি রাষ্ট্র না চালিয়ে অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক অনুদান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও লবিংয়ের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করে।
ওয়াল স্ট্রিট শুধু শেয়ারবাজার নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেন্দ্র। ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড ও স্টেট স্ট্রিটের মতো সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে এবং হাজারো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে।
এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব নীতিনির্ধারণেও পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। যদিও অন্য গবেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান মূলত বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিচালনা করে। তাই তাদের প্রভাব নিয়ে অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
তবে একটি বিষয় নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই—করপোরেট স্বার্থ ও সরকারের মধ্যে অন্যতম বড় সংযোগ হলো লবিং।
যুক্তরাষ্ট্রে লবিং একটি বৈধ প্রক্রিয়া। ব্যক্তি, শ্রমিক সংগঠন, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, ওষুধ, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের বড় কোম্পানিগুলোও কংগ্রেস ও সরকারের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা ওপেন সিক্রেটসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এই লবিং কার্যক্রমে বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকভাবেই বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্টিন গিলেনস ও বেঞ্জামিন পেইজের গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অভিজাত ও সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর মতামত সরকারি নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সাধারণ নাগরিকের পছন্দ একাই নীতিনির্ধারণে সমান প্রভাব ফেলতে পারে না। যদিও এই গবেষণা নিয়েও একাডেমিক বিতর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং সরকারি ডিইআই (ডাইভার্সিটি, ইকুইটি, ইনক্লুশন) কর্মসূচির বিরোধিতাকে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, অতিরিক্ত অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তা, শ্রমবাজার ও ঐতিহ্যগত আমেরিকান পরিচয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসী মেধার ওপর নির্ভরশীল। তাই বহুসংস্কৃতিবাদ দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
এই বিতর্ককে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও জোসেফ নাই। হান্টিংটন মনে করেন, অতিরিক্ত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য জাতীয় পরিচয়কে দুর্বল করতে পারে। বিপরীতে নাই যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের উন্মুক্ত সমাজই তার ‘সফট পাওয়ার’-এর অন্যতম উৎস। বিশ্বের সেরা মেধাকে আকর্ষণ করার ক্ষমতাই দেশটিকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে রেখেছে।
এক শব্দে এর উত্তর পাওয়া কঠিন। প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবান, কিন্তু তিনি একা নন। কংগ্রেস, আদালত, অঙ্গরাজ্য সরকার, সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, লবিং গ্রুপ, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহুসংস্কৃতির সমাজ—সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো।
সি রাইট মিলস ও জি উইলিয়াম ডমহফ আমাদের মনে করিয়ে দেন, করপোরেট এলিট ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের প্রভাব বাস্তব এবং তা বোঝা জরুরি। আবার কিমলিকা, চার্লস টেলর ও জোসেফ নাই দেখান, বহুসংস্কৃতিবাদ শুধু সামাজিক মূল্যবোধ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাই নির্বাচিত সরকার, শক্তিশালী করপোরেট স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী এবং বহুসংস্কৃতির সমাজ—এই সবকটির প্রতিযোগিতা ও ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয়।
.png)

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে কথা হয় তার সঙ্গে। আবাদি জানান, অনেক আমেরিকানের মতো তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আবদি ডাইভার্সিটি ভিসা প্রকল্পের মাধ্যমে আমেরিকায় এসেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমেরিকান ড্রিম বেঁচে আছে বটে, তবে তা ভালো নেই।’
৩৪ মিনিট আগে
তাহলে প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, রকস্টার পরিচয়ের আড়ালে কি কবি জিম মরিসন হারিয়ে গেলেন? উত্তরটি সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—দুটোই।
১২ ঘণ্টা আগে
টম ক্রুজ আজ কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত একজন সুপারস্টার। কিন্তু জীবনের শুরুতে তাঁর পরিকল্পনা ছিল একেবারেই অন্যরকম। খুব ছোটবেলায় তিনি চেয়েছিলেন ধর্মযাজক হতে। সেই লক্ষ্যেই সেমিনারিতে তিন বছর পড়াশোনাও করেছিলেন। কিন্তু একদিন বন্ধুদের সঙ্গে মিলে অ্যালকোহলের বোতল লুকিয়ে রাখার মতো ভুল করে বসেন। সেই অ
১৫ ঘণ্টা আগে
ট্রাম্পের এই ক্রিপ্টো-বান্ধব অবস্থানের কারণে গত বছরের অক্টোবরে বিটকয়েনের দাম রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ ডলারে পৌঁছেছিল। সংগৃহীত ছবি
০২ জুলাই ২০২৬