‘তাজিয়া’ শব্দের অর্থ কী, কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মিছিল

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ২০: ৩৬
তাজিয়া মিছিল। ছবি: সংগৃহীত

পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবারা থেকে বের হয়েছেন শত শত মানুষ। তাদের গায়ে কালো পোশাক। মুখে ধ্বণি—ইয়া হোসেন… ইয়া হোসেন। কাঁধে কারবালার প্রতীকী সমাধি। তারা হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে।

এই দৃশ্যের নাম ‘তাজিয়া মিছিল’। প্রতি বছর মহররম মাসের ১০ তারিখে এমন দৃশ্য দেখা যায়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য অনেকের কাছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আবার অনেকের কাছে এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যেরও অংশ।

কারবালার শোক থেকেই তাজিয়ার সূত্রপাত

তাজিয়া মিছিলের ইতিহাসের মূল উৎস ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের কারবালার যুদ্ধ। বর্তমান ইরাকের কারবালায় ইমাম হোসেন ইবনে আলী (রা) এবং তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গী ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হন।

মুসলিম ইতিহাসে এই ঘটনাকে ন্যায়, সত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে শিয়া মুসলমানরা মহররমের প্রথম দশ দিন গভীর শোক পালন করেন এবং ১০ মহররম বা আশুরার দিনে ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত স্মরণ করেন।

‘তাজিয়া’ শব্দের অর্থ কী?

‘তাজিয়া’ শব্দটি আরবি ‘তাআজিয়াহ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ সমবেদনা, সান্ত্বনা বা শোক প্রকাশ। পরে ফারসি ও উর্দু ভাষার মাধ্যমে শব্দটি দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় তাজিয়া বলতে সাধারণত ইমাম হোসেনের (রা.) কারবালার সমাধির প্রতীকী রূপকে বোঝানো হয়। এটি বাঁশ, কাঠ, কাগজ, রঙিন কাগজ, কাপড়, কাঁচ কিংবা ধাতব অলংকার দিয়ে তৈরি করা হয়। মহররমের শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে এসব তাজিয়া শোভাযাত্রায় বহন করা হয়।

কখন শুরু হয় তাজিয়া মিছিল

ইতিহাসবিদদের মতে, কারবালার ঘটনার পর প্রথম দিকে শোকপালন হতো মূলত প্রার্থনা, শোকসভা ও ধর্মীয় আলোচনা দিয়ে। তখন তাজিয়ার প্রচলন ছিল না। প্রায় ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পারস্যে প্রতীকী কারবালা স্মরণ অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। বিশেষ করে সাফাভি সাম্রাজ্যের শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর শোকানুষ্ঠান আরও সুসংগঠিত রূপ পায়। সেখান থেকেই প্রতীকী সমাধি বা তাজিয়া তৈরির রীতি বিস্তার লাভ করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় যেভাবে এল

ভারতীয় উপমহাদেশে তাজিয়া মিছিল জনপ্রিয় হয় মূলত দিল্লি সালতানাত ও পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে। তবে সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা আসে অযোধ্যার নবাব এবং উত্তর ভারতের শিয়া শাসকদের কাছ থেকে। লখনৌ, হায়দরাবাদ, মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন শহরে মহররম উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ তাজিয়া নির্মাণ ও শোকযাত্রা শুরু হয়। ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্য বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলায় তাজিয়া মিছিলের ইতিহাস

বাংলায় তাজিয়া মিছিলের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলে ঢাকায় শিয়া অভিজাত ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্যোগে মহররম পালন শুরু হয়। পুরান ঢাকার হোসেনি দালান এই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সপ্তদশ শতকে নির্মিত এই স্থাপনাটি আজও বাংলাদেশের মহররম পালনের অন্যতম কেন্দ্র। প্রতি বছর এখান থেকে হাজারো মানুষ শোক মিছিলে অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে এই আয়োজন শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও ঐতিহ্যগত কারণে এই শোভাযাত্রা প্রত্যক্ষ করেন।

তাজিয়া মিছিলে কী থাকে

তাজিয়া মিছিলের মূল উদ্দেশ্য আনন্দ প্রকাশ নয়, এটিকে শোক, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক তুলে ধরা। মিছিলে সাধারণত দেখা যায় তাজিয়া বা প্রতীকী সমাধি বহন, কালো পোশাক পরিধান, কারবালার ঘটনা স্মরণ করে শোকগাথা পাঠ, ধর্মীয় স্লোগান ও মর্সিয়া পাঠ, কোথাও কোথাও প্রতীকী ঘোড়া, যা ইমাম হোসেনের (রা.) ঘোড়া ‘জুলজানাহ’র স্মৃতিকে ধারণ করে অনেক দেশে আশুরার দিন শেষে তাজিয়া প্রতীকীভাবে নদী বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়ার রীতিও রয়েছে। তবে সব অঞ্চলে এই প্রথা অনুসরণ করা হয় না।

Ad 300x250

সম্পর্কিত