২৪৪ বছর আগে আশুরার দিনে সিলেটে কেন আতঙ্কিত হয়েছিল ব্রিটিশরা

স্ট্রিম গ্রাফিক

সিলেটের আম্বরখানা ছাড়িয়ে শাহি ঈদগাহের টিলায় দাঁড়ালে আজও বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন কোনো এক সুদূর অতীতের দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে। কিন্তু জানেন কী, আজ থেকে প্রায় আড়াই শ বছর আগে ১৭৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর আশুরার দিনে সেখানে বয়ে গিয়েছিল রক্তের ধারা।

আমরা সাধারণত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ মনে করি। কিন্তু ইতিহাসবিদ ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর বিখ্যাত ‘অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন, সেই শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যে আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছিল, তা আজও মূলধারার ইতিহাসে প্রায় অনালোচিত।

১৭৮২ সালের সেই দিনটি ছিল ১০ মহররম। কিন্তু সেদিন শাহি ঈদগাহের সিঁড়িতে ঘটেছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক মরণপণ লড়াই।

তবে এ বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট একদিনে তৈরি হয়নি। ১৭৮১ সালের এক প্রলয়ংকরী বন্যায় সিলেটের কৃষিজীবী মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল। নষ্ট হয়েছিল খেতের সব ফলন। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের তথ্যমতে, সেই বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ায় সিলেটে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, যাতে প্রাণ হারান এই অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। কিন্তু এই বিপর্যয়ের মধ্যেও কর আদায়ের চাবুক থামেনি।

তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে ছিলেন এক নিষ্ঠুর শাসক। তাঁর আত্মজীবনী ‘অ্যানেকডোটস অব অ্যান ইন্ডিয়ান লাইফ’-এ তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, তিনি সিলেটে এসেছিলেন মূলত ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াতে। তিনি চুনাপাথর, বুনো হাতি ধরা আর বেতের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেছিলেন। যখন হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মরছে, লিন্ডসে তখন ব্যস্ত ছিলেন ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মুনাফা আর কঠোরভাবে খাজনা আদায়ে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক সাক্ষাৎ মৃত্যদূত, যিনি মানুষের ক্ষুধার হাহাকারের চেয়ে নিজের ব্যবসার হিসাবকে বড় করে দেখতেন।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৭৮২ সালের এই বিদ্রোহ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। ১৭৬০ সাল থেকে বাংলায় চলমান ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের যে রেশ ছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল সিলেটের এই আন্দোলনে। মজনু শাহের নেতৃত্বে মাদারী ফকিরদের ব্রিটিশবিরোধী অভিযান এবং সন্ন্যাসীদের আক্রমণ তখন বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করছিল। সিলেটের পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলে সন্ন্যাসীদের তৎপরতা পীরজাদা ভাইদের মনে সাহস জুগিয়েছিল মহররম বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে।

গবেষক মুহাম্মদ মজলুম খান তাঁর ‘দ্য মুসলিম হেরিটেজ অব বেঙ্গল’ গ্রন্থে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহীরা যেভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোম্পানির বাণিজ্য কুঠিগুলোতে হানা দিচ্ছিল, সেই একই মডেলে সিলেটের বিদ্রোহীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সেই ধাক্কা এবং ১৭৭০-এর ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের’ পুঞ্জীভূত ক্ষোভই সিলেট বিদ্রোহকে একটি বৈপ্লবিক রূপ দিয়েছিল। পীরজাদা ভাইয়েরা বুঝতে পেরেছিলেন, ফকির ও সন্ন্যাসীদের মতোই সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া এই বিদেশি বণিকদের তাড়ানো সম্ভব নয়।

কোম্পানি সরকারের বঞ্চনা আর অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন হজরত শাহজালালের (রহ.) দরগাহের সারেকওম সৈয়দ পরিবারের পীরজাদা সৈয়দ মুহম্মদ হাদি (হাদা মিয়া) এবং তাঁর ভাই সৈয়দ মুহম্মদ মাহদি (মাদা মিয়া)। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’-এ এই দুই ভাইয়ের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেছেন।

তত্ত্বনিধির মতে, লিন্ডসে তাঁদের ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও বাস্তবে তাঁরা ছিলেন স্থানীয় মানুষের শেষ আশ্রয়। পীরজাদা ভাইয়েরা বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশরা কেবল শাসন করছে না, তারা স্থানীয় মানুষের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যের মূলে আঘাত করছে। তাই তাঁরা মুহররমের মর্সিয়া, যা কারবালার অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, সেটিকেই প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে বেছে নেন। তাঁরা প্রচার করেন, ফিরিঙ্গিদের দাসত্ব করার চেয়ে যুদ্ধের ময়দানে মরাই সম্মানের।

১৭৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। লিন্ডসে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, সেদিন প্রায় ৩০০ সশস্ত্র মানুষ নিয়ে পীরজাদা ভাইয়েরা একটি তাজিয়া মিছিল বের করেন। মিছিলটি শাহি ঈদগাহের টিলায় পৌঁছালে লিন্ডসে সৈন্যসহ তাদের বাধা দিতে যান। লিন্ডসে বর্ণনা করেছেন সেই রোমহর্ষক মুহূর্তের কথা। টিলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পীরজাদা সৈয়দ হাদি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা কি ফিরিঙ্গিদের কুকুর যে তাদের হুকুম তামিল করব? আজ মারবার অথবা মরবার দিন। ইংরেজ রাজত্ব আজ খতম।’

এরপর শুরু হয় লড়াই। লিন্ডসে নিজে তরবারি হাতে পীরজাদার মুখোমুখি হন। যুদ্ধের একপর্যায়ে পীরজাদার আঘাতে লিন্ডসের তলোয়ারটি ভেঙে যায়। লিন্ডসে তখন জনৈক মুসলমান জমাদারের দেওয়া পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়লে শহীদ হন সৈয়দ হাদি। এর পরপরই সিপাহিদের বেয়নেটে নিহত হন হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া। শহীদের রক্তে শাহি ঈদগাহের চত্বর লালে লাল হয়ে যায়।

এই ভবনে বাস করতের রবার্ট লিন্ডসে। ছবি: উইকিপিডিয়া
এই ভবনে বাস করতের রবার্ট লিন্ডসে। ছবি: উইকিপিডিয়া

সিলেটের এই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের মনে এক স্থায়ী আতঙ্ক গেঁথে দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, ধর্মীয় জমায়েতগুলো আদতে যেকোনো সময় গণপ্রতিরোধে রূপ নিতে পারে। বি সি অ্যালেন তাঁর ‘আসাম ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার, সিলেট’ বইতে যদিও এ ঘটনাকে কেবল একটি ‘দাঙ্গা’ বলে লঘু করার চেষ্টা করেছেন, যা ছিল মূলত একটি ঔপনিবেশিক প্রপাগান্ডা।

তবে এর পর থেকেই ব্রিটিশরা প্রতিটি কলোনিতে মহররম পালনকারীদের ‘অপরাধী’ বা ‘বিদ্রোহী’ তালিকায় তুলতে শুরু করে। সিন্ধু প্রদেশের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জন জ্যাকব তাঁর এক কুখ্যাত আদেশে মহররমকে ‘ধর্মের অজুহাতে বুনো উন্মাদনা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর এই আদেশগুলো পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন লুইস পেলি তাঁর ‘দ্য ভিউস অ্যান্ড অপিনিয়নস অব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জন জ্যাকব’ গ্রন্থে সংকলিত করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ধর্মীয় মিছিল নিয়ন্ত্রণ করাই হলো কলোনিতে শান্তি বজায় রাখার উপায়।

গবেষক টর্সটেন শ্যাচার ২০২২ সালে তাঁর গবেষণাপত্র ‘মহররম ইন দ্য ব্রিটিশ কলোনিজ’-এ দেখিয়েছেন, ব্রিটিশরা কীভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে মহররমকে একটি ‘অপরাধী কার্নিভাল’ হিসেবে চিহ্নিত করত। তাদের কাছে মহররম পালনকারী মানেই ছিল সম্ভাব্য বিদ্রোহী। এটি ছিল মূলত মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল।

শ্যাচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তিনি দেখিয়েছেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে মহরমকে ‘ধর্মীয়’ ও ‘অধর্মীয়’—এই দ্বৈত শ্রেণিবিভাগের মধ্যে ফেলে তাকে নিষিদ্ধ করার একটি রাজনৈতিক কৌশল নির্মাণ করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টসের একমাত্র ‘স্থানীয়’ জনগোষ্ঠী মালয়রা, আর তারা নাকি মহরমে অংশগ্রহণ করে না, যদিও বাস্তবে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যায়। এই যুক্তির ভিত্তিতে মহরমকে ‘বিদেশি ভারতীয়’দের উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং দাবি করা হয় যে এটি কোনো সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় আচার নয়। ফলে একে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রও তৈরি হয়।

১৮৬৭ সালের পেনাং দাঙ্গার পর মহরমের শোভাযাত্রা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে শ্যাচারের মতে, এই নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত কারণ ছিল প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; বরং স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টসকে ভারতীয় প্রশাসনের আওতা থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র ক্রাউন কলোনিতে রূপান্তরের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক প্রকল্প। মহরমের শোভাযাত্রা ভারতীয় দণ্ডিত শ্রমিক, সৈনিক ও অভিবাসীদের সম্মিলিত উপস্থিতি ও সামাজিক শক্তির এক দৃশ্যমান প্রকাশ ছিল, যা নতুন ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।

শ্যাচার আরও দেখান যে, মহরমকে কেবল শিয়াদের শোকানুষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক চরিত্র বোঝা যায় না। বাস্তবে এটি ছিল এক বহুসাংস্কৃতিক, কার্নিভালধর্মী জনউৎসব, যেখানে সুন্নি মুসলমান, হিন্দু, এমনকি চীনা অংশগ্রহণকারীরাও নাচ, সঙ্গীত, প্রতিযোগিতা ও নানা ধরনের জন-উৎসবে অংশ নিতেন।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন ‘এই শোভাযাত্রা কি ধর্মীয়’—এই প্রশ্নটিকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল। কোনো অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা সহনীয় বলে বিবেচিত হতো। তবে সেটিকে যদি সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা যেত, তবে তা নিষিদ্ধ করার পথ সহজ হয়ে যেত।

তবে মহরমের সাংস্কৃতিক রূপ পুরোপুরি বিলীন হয়নি। ১৮৮৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সিঙ্গাপুরের ভারতীয় মুসলমানরা শোভাযাত্রা বের করেন। এবার তাজিয়ার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় জুবিলি লণ্ঠন, আর হাতি-বাঘের মুখোশের জায়গা নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতাকা। ‘কুদু’, তাজিয়ার মালয় নাম ব্যবহার করা হলেও, এই শোভাযাত্রা মূলত সাম্রাজ্যবাদী আনুগত্যের প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল।

তবে মহররম বিদ্রোহের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাঈদ উল্লাহ নামের এক যুবকের এক বিস্ময়কর কাহিনী। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর ‘হজরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, পীরজাদা ভাইদের নির্মম হত্যার প্রতিশোধ নিতে সাঈদ উল্লাহ সুদূর স্কটল্যান্ডে লিন্ডসের প্রাসাদে পৌঁছে গিয়েছিলেন। লিন্ডসে তাঁর নিজের স্মৃতিকথায়ও এই রোমহর্ষক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তবে সাঈদ উল্লাহ লিন্ডসেকে হত্যা না করে তাঁর পরিবারের পাচক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মনে করা হয়, আজকে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় তথা বাঙালি রসনার যে জয়জয়কার, তার পেছনে সাইদ উল্লাহর মতো মানুষেরই অবদান।

আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ১৭৮২ সালের সিলেট মুহররম বিদ্রোহ কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা নয়। আমরা যখন ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখি, তখন বি সি অ্যালেন কিংবা লিন্ডসেদের বর্ণনায় পীরজাদা ভাইদের ‘অপরাধী’ মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষণা প্রমাণ করে, তাঁরা ছিলেন এদেশের মাটির প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আজ আশুরার দিনে যখন তাজিয়া মিছিল বের হয়, তখন যেন সেই পুরনো ইতিহাস আবার নতুন করে ডাক দিয়ে যায়, যে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস কোনোদিন অপরাধ হতে পারে না। ১৮৫৭-র অনেক আগে সিলেটের পাহাড়ঘেরা শাহি ঈদগাহের সিঁড়িতে যে প্রতিরোধের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য এবং অবহেলিত অধ্যায়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত