নারী দিবস বা শ্রমজীবী নারী দিবস হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল শ্রমজীবী মানুষের একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর দিন। এই দিন সর্বহারা নারীদের শক্তি আর তাদের সংগঠন কতখানি মজবুত হলো তা ঝালিয়ে নেওয়ার দিন।
তবে এই দিনটি যে শুধু নারীদের জন্যই বিশেষ কিছু, তা কিন্তু নয়। ৮ই মার্চ তারিখটি শ্রমিক-কৃষক, রাশিয়ার প্রতিটি মেহনতি মানুষ এবং সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। ১৯১৭ সালের এই দিনটিতেই রাশিয়ায় মহান ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছিল। আর সেই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গের শ্রমজীবী নারীরাই। তারাই প্রথম জার ও তার দোসরদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা ওড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাই আমাদের কাছে শ্রমজীবী নারী দিবস মানে এক সাথে দুটো আনন্দ, দ্বিগুণ উদযাপন।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এটি যদি সকল সর্বহারা মানুষেরই সাধারণ ছুটির দিন বা উৎসব হয়, তবে আমরা একে আলাদা করে ‘নারী দিবস’ বলি কেন? কেন আমরা বিশেষ করে নারী শ্রমিক আর কিষানিদের লক্ষ্য করেই এই সব সভা-সমাবেশ আর উৎসবের আয়োজন করি? এতে কি শ্রমিক শ্রেণির একতা আর সংহতিতে কোনো ফাটল ধরার ভয় থাকে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে ঠিক কীভাবে আর কোন উদ্দেশ্যে এই নারী দিবসের জন্ম হয়েছিল।
নারী দিবস কীভাবে এবং কেন শুরু হয়েছিল?
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এই তো মাত্র বছর দশেক আগেও নারীর সমঅধিকার আর পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা সরকার পরিচালনায় অংশ নিতে পারবে কি না—তা নিয়ে তপ্ত বিতর্ক চলত। সব পুঁজিবাদী দেশেই শ্রমিক শ্রেণি লড়াই করছিল শ্রমজীবী নারীদের অধিকারের জন্য। কিন্তু পুঁজিপতিরা এই অধিকারগুলো মেনে নিতে নারাজ ছিল। পার্লামেন্টে শ্রমিকদের ভোটের শক্তি বাড়তে দিতে বুর্জোয়ারা রাজি ছিল না। তাই প্রতিটি দেশেই তারা এমন সব আইন আটকে দিচ্ছিল যা শ্রমজীবী নারীদের ভোটাধিকার দিতে পারে।
উত্তর আমেরিকার সমাজতন্ত্রীরা ভোটাধিকারের দাবিতে বিশেষভাবে অনড় ছিলেন। ১৯০৯ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সমাজতন্ত্রী নারীরা শ্রমজীবী নারীদের রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে দেশজুড়ে বিশাল সব বিক্ষোভ মিছিল আর সভার আয়োজন করেন। সেটিই ছিল প্রথম ‘নারী দিবস’। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট দিনে নারী দিবস পালনের এই উদ্যোগটি প্রথম নিয়েছিলেন আমেরিকার শ্রমজীবী নারীরাই।
এরপর ১৯১০ সালে, শ্রমজীবী নারীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন একটি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ আয়োজনের প্রস্তাব তোলেন। সেই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রতি বছর প্রতিটি দেশে একই দিনে একটি ‘নারী দিবস’ পালন করা হবে। আর সেই দিবসের স্লোগান হবে— ‘নারীদের ভোটাধিকার সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে আমাদের শক্তিকে একতাবদ্ধ করবে।’
সেই সময়গুলোতে পার্লামেন্টকে আরও গণতান্ত্রিক করা, অর্থাৎ ভোটাধিকারের পরিধি বাড়ানো ও নারীদের সেই অধিকার দেওয়া ছিল এক জ্বলন্ত ইস্যু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই রাশিয়া বাদে সব বুর্জোয়া দেশেই পুরুষ শ্রমিকদের ভোটাধিকার ছিল। শুধু পাগলদের সাথে এক কাতারে রেখে নারীদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে পুঁজিবাদের রূঢ় বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল অপরিহার্য। প্রতি বছরই কল-কারখানা, কর্মশালায় কিংবা পরিচারিকা ও ধোপানি হিসেবে কাজ করা নারীর সংখ্যা বাড়ছিল। নারীরা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁদের হাতে তৈরি হচ্ছিল দেশের সম্পদ। অথচ সেই নারীদেরই ভোটাধিকার ছিল না।
যুদ্ধের আগের শেষ বছরগুলোতে জিনিসপত্রের দাম এত বেড়ে গিয়েছিল যে, সবচাইতে শান্ত স্বভাবের গৃহিণীও রাজনীতির খোঁজখবর নিতে আর বুর্জোয়াদের এই লুটপাটের অর্থনীতির বিরুদ্ধে সরব হতে বাধ্য হচ্ছিলেন। অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর জার্মানিতে জায়গায় জায়গায় ‘গৃহিণীদের বিদ্রোহ’ দানা বেঁধে উঠছিল।
শ্রমজীবী নারীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্রেফ বাজারের দোকান ভাঙচুর করা কিংবা দু-একজন ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁরা বুঝেছিলেন যে এমন বিচ্ছিন্ন কাজে জীবনযাত্রার খরচ কমে না। এর জন্য দরকার সরকারের নীতি পরিবর্তন করা। আর তা অর্জন করতে হলে শ্রমিক শ্রেণিকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভোটাধিকারের পরিধি আরও বাড়ে।
শ্রমজীবী নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের লড়াইয়ের একটি কৌশল হিসেবেই প্রতিটি দেশে ‘নারী দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই দিনটি ছিল অভিন্ন লক্ষ্যের লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের এবং সমাজতন্ত্রের পতাকাতলে শ্রমজীবী নারীদের সংগঠিত শক্তির জানান দেওয়ার দিন।
প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস
সমাজতন্ত্রী নারীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্ত কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯১১ সালের ১৯শে মার্চে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের দিন ধার্য করা হয়।
এই তারিখটি হুট করে বেছে নেওয়া হয়নি। আমাদের জার্মান কমরেডরা তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন জার্মান সর্বহারাদের কাছে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় এই ১৯শে মার্চেই প্রুশিয়ার রাজা প্রথমবারের মতো সশস্ত্র জনগণের শক্তির কাছে মাথা নত করে এক সর্বহারা অভ্যুত্থানের মুখে পিছু হটেছিলেন। তিনি তখন অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
১১ই জানুয়ারির পর থেকে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় নারী দিবসের প্রস্তুতি শুরু হয়। পত্রপত্রিকায় আর মুখে মুখে এই বিক্ষোভ সমাবেশের কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নারী দিবসের আগের সপ্তাহে দুটি সাময়িকী প্রকাশিত হয়—জার্মানিতে ‘নারীদের ভোটাধিকার’ এবং অস্ট্রিয়ায় ‘নারী দিবস’। এই সংখ্যাগুলোতে ‘নারী ও সংসদ’, ‘শ্রমজীবী নারী ও পৌরসভা’, ‘রাজনীতির সাথে গৃহিণীর কী সম্পর্ক?’—এমন সব শিরোনামে নারীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমঅধিকার নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি লেখারই মূল কথা ছিল একটিই, নারীদের ভোটাধিকার দিয়ে সংসদকে আরও গণতান্ত্রিক করা এখন সময়ের দাবি।
১৯১১ সালের সেই প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেদিন জার্মানি আর অস্ট্রিয়া যেন নারীদের এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। ছোট শহর, এমনকি গ্রামগুলোতেও সভা-সমাবেশ আয়োজিত হয়েছিল। হলগুলোতে এমন ভিড় হয়েছিল যে পুরুষ সহযোদ্ধাদের নারীদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করতে হয়েছিল।
এটি ছিল শ্রমজীবী নারীদের প্রথম এক লড়াকু বহিঃপ্রকাশ। সেদিন এক অভূতপূর্ব বদল ঘটেছিল। পুরুষরা ঘরে থেকে বাচ্চাদের সামলেছেন। আর চিরাচরিত বন্দি গৃহিণী তাদের স্ত্রীরা দলে দলে সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন। ৩০ হাজার মানুষের এক বিশাল মিছিলে পুলিশ যখন বিক্ষোভকারীদের ব্যানার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন নারী শ্রমিকরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই ধস্তাধস্তিতে রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছিল কেবল পার্লামেন্টের সমাজতন্ত্রী প্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে।
১৯১৩ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে ৮ই মার্চে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই থেকে আজ অবধি এই দিনটি শ্রমজীবী নারীদের এক লড়াকু সংগ্রামের দিন হিসেবে অমর হয়ে আছে।
নারী দিবস কি আসলেই প্রয়োজন?
আমেরিকা আর ইউরোপে নারী দিবসের ফলাফল ছিল এক কথায় অভাবনীয়। সে সময় কোনো বুর্জোয়া পার্লামেন্টই শ্রমিকদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া বা তাদের প্রতি সদয় হওয়ার কথা ভাবেনি। কারণ, তখন পর্যন্ত পুঁজিপতিরা কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের হুমকিতে পড়েনি।
কিন্তু নারী দিবস বড় একটি অর্জন নিশ্চিত করেছিল। আমাদের যে সব সর্বহারা বোনেরা রাজনীতি নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতেন না, তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলার এক চমৎকার উপায় হয়ে দাঁড়াল এই দিনটি। নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভা, মিছিল, পোস্টার আর প্রচারপত্রগুলোর দিকে নজর না দিয়ে তাঁদের উপায় ছিল না। এমনকি রাজনীতির ধারেকাছে না থাকা নারী শ্রমিকটিও মনে মনে ভাবতেন—‘আজ আমাদের দিন, মেহনতি মেয়েদের উৎসব’। এই টানেই তাঁরা ছুটে যেতেন মিছিল আর সমাবেশে। আর প্রতিটি শ্রমজীবী নারী দিবসের পর সমাজতান্ত্রিক দলগুলোতে নারী সদস্যের সংখ্যা বাড়ত, মজবুত হতো ট্রেড ইউনিয়নগুলো। সংগঠনের ভিত শক্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতাও বাড়ত।
নারী দিবস আরও একটি বড় কাজ করেছিল। দিবসটি বিশ্বের সব প্রান্তের শ্রমিকদের মধ্যে এক আন্তর্জাতিক সংহতি তৈরি করেছিল। এই উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ একে অপরের সাথে বক্তা বিনিময় করত। জার্মান কমরেডরা যেতেন ইংল্যান্ডে। আবার ব্রিটিশ কমরেডরা যেতেন হল্যান্ডে। শ্রমিক শ্রেণির বিশ্বজনীন মেলবন্ধন আরও দৃঢ় ও অটুট হয়েছিল। এর অর্থ সামগ্রিকভাবে মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের শক্তি অনেক গুণ বেড়ে যাওয়া।
শ্রমজীবী নারীদের এই লড়াকু সংগ্রামের দিনটির ফলাফল হলো ঠিক এটাই। এই দিনটি সর্বহারা নারীদের চেতনা আর সংগঠন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর এর অর্থ হলো, শ্রমিক শ্রেণির এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন যাঁরা দেখেন তাঁদের সাফল্যে এই দিনটির অবদান অপরিহার্য।