leadT1ad

বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

আহমেদ স্বপন মাহমুদ
আহমেদ স্বপন মাহমুদ

বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্ট্রিম গ্রাফিক

১.

শুক্রবার আলো ফোটার আগেই, ভোরে অলোকলোকে চলে গেলেন বিখ্যাত বাউল ও লোকসংগীত শিল্পী সুনীল কর্মকার। তিনি শুধু একজন ব্যক্তিই ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তার অসংখ্য ভক্ত সাধক রয়েছেন, যাঁরা তার মৃত্যুতে হয়ে পড়েছেন অসহায় ও নিঃসঙ্গ।

সাধক সুনীল কর্মকার ছিলেন মহামতি জালাল উদ্দিন খাঁর একনিষ্ঠ ভাবশিষ্য। জালালগীতি তাঁর ভরাট কণ্ঠেই সঞ্চরণশীল নদীর মতো কলকল করে বেজে উঠত।

সুনীল কর্মকারের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় বাউল শিল্পী ছাত্তার পাগলার ওরস মাহফিলে, মোহনগঞ্জে ছাত্তার পাগলার গ্রামের বাড়িতে। অনেক লোক সমাগম হয়েছিল। সেদিন আদম-শয়তানের পালা হয়েছিল। যুক্তি-তর্কে বয়ানে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত সেই পালা শুনছিলাম। কেবল গান নয়, বেহালাতে তিনি ছিলেন ওস্তাদ। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রেও পারদর্শী।

গত বছরের অক্টোবরে সংগঠনের কাজে ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। নেত্রকোনা থেকে এসেছিলেন কবি সরোজ মোস্তফা। ময়মনসিংহ গেলে আমি শিল্পী ইমন তালুকদারকে ফোন করি। সেও এসে দেখা করে। ইমন জানায় যে তার নতুন একটা বসার জায়গা নিয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা গান শিখবে। একটা লাইব্রেরি করবে ইমন। সে জানাল, রাতে সুনীল দা আসবেন এবং আরও কিছু তরুণ শিল্পী-শিক্ষার্থী থাকবে। ইমন তো আছেই। আমরা কলিগদেরসহ ব্রহ্মপুত্রের পারে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সরোজও ছিল। ইমন ফোন করে জানায় যে সুনীল দা চলে আসছেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই একটা অটো নিয়ে চলে গেলাম সুনীল দার সঙ্গে দেখা করতে।

সুনীল কর্মকার ছিলেন একজন বিশুদ্ধ বাউলশিল্পী। নগরকেন্দ্রিক যে বাউলগান বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে—তার বিপরীতে তিনি বাউল গানকে রেখেছেন সাধনভজনের জায়গায়। বাউল গানই আত্মশুদ্ধির পথ মনে করেছেন, যাপন করেছেন এবং দর্শকশ্রোতাকে তিনি সহযাত্রী হিসেবে দেখেছেন।

সুনীল কর্মকার অর্ধশোয়া ভঙ্গিতে আছেন। বলা যায় প্রায় সারাটা সময় শুয়েই ছিলেন বলা যায়। কিছুটা অসুস্থও। খুব একটা নিয়মনীতি মানতে পারেন না। ডায়াবেটিস আছে। তো তরুণ শিল্পীরা গান করছে কয়েকজন। গানের পরপর সুনীল দা ওদের সবক দিচ্ছেন।

সুনীল দা বলছিলেন, তিনটা জিনিস মিলে গান হয়। দেশ, কাল, পাত্র । এইটা বুঝতে হয়; বুঝতে পারতে হয়। রেকর্ড শুনে গান গাইলে গান হয় না। এমন বেসুরো হয় বা গান হয় না। গানের কথার ভিতর ঢুকতে হয়, বুঝতে হয়। জানালেন, ঘুরে ঘুরে গান শিখতেন তিনি। ওস্তাদের কাছে গান শিখতেন। ইমনও শিক্ষার্থীদের সবক দিচ্ছেন। ইমন নিজেও গান গাইছেন।

সুনীল দা অনেক গল্প করেছিলেন। গ্রামের কথা, জালাল উদ্দিন খাঁ সাহেবের কথা, তার বেড়ে ওঠার কথা আর গান শেখার গল্প।

কথায় কথায় অনেক কথা সেই রাতে। সরোজও আগ্রহ নিয়ে নানা বিষয় জানতে চায়, আমারও আগ্রহ জানবার। তিনি বেশ কয়েকটি গান করেছিলেন সেদিন। এই গানটাও গাইছিলেন তিনি, ‘ন্যায়ে থাকো সত্য রাখো ধর্মরক্ষা তারে কয়।’

২.

সুনীল কর্মকার কেবল বাউল সাধকই নন, তিনি একজন ভাবুকও। ভাটিবাংলার সকল মহাজনই ভাবের ঘরে বসে গান করেন, যেখানে গানই জ্ঞান, গানই ধ্যান। সুনীল কর্মকারের ভাবজগৎ শব্দের চেয়ে অনুভবের কথা বলে। গভীর অন্তর্লোকের সন্ধান পাওয়া যায়। উচ্চবাচ্য নেই, নীরব অথচ গহীনের কথা বলে সেই জগৎ। তার মূল বিষয় ছিল মানুষে মানুষে মিলন, বিশ্বাস আর একতা। বিভাজনের বিপরীতে তিনি ঐক্যের কথা তুলে ধরেছেন। ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী একজন বাউল। বাউল শিল্পীরা গানে গানেই সেই মানবতার কথা মানুষের হৃদয়ের কথা আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিকতা তুলে ধরেন। মানুষের মধ্যে সুরের মূর্ছনায় মনকে ভিজিয়ে, কাঁদিয়ে সরেস করে তোলেন।

সুনীল কর্মকারের কথা ও গানে সব ধরনের অসততা-ভণ্ডামি-অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন। প্রেম, ভক্তি, দেহতত্ব ও আত্মজিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচে, সমাজে ঐক্য তৈরি হয়।

সমাজবিচ্ছিন্নতার কথা তিনি কখনোই ভাবতেন না। মানুষ যে একা সেটা কেবল নিঃসঙ্গতা নয়, তিনি এটাকে তার উপলব্ধির জায়গা থেকে ভাবতেন। এটা বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নিজেকে বারবার ফিরে দেখা, নিজের ভেতরে ডুব দেয়া। তিনি তা-ই করতেন। তিনি স্মৃতিকাতর ছিলেন। জীবনের দিকে কে না ফিরে চায়। তিনি ফিরে চাইতেন শৈশব-কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলোতে। বেদনার সঙ্গে কথোপকথন করে মানুষ একা একা। একজন শিল্পী তার আপন ভুবন নিয়ে অনেক সময়ই বেদনার্ত হয়ে পড়েন।

সুনীল কর্মকারের ভাবজগতে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতে সরলরৈখিক নয়, বরং একত্রে গলে গিয়ে যেন এক হয়ে ধরা দেয়। এই যে সময়কে একসুতায় গেঁথে ফেলার বোধ এটা একটা দার্শনিক মাত্রা দেয় তাঁকে।

সুনীল কর্মকারের ভাবনার ক্ষেত্রে মানুষই আসল। মানুষ ভজনাই সার। তিনি মনে করতেন, মানুষের মধ্যেই বিরাজ করেন ঈশ্বর। ধর্মে ধর্মে বিভেদের কথা তিনি ভাবতেন না। মানুষের প্রতি ছিল তার গভীর বিশ্বাস। প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ সম্পর্কে ছিলেন সচেতন। অনেক সময় প্রকৃতির নীরবতা মানুষের অন্তর্গত নীরবতার সঙ্গে মিশে গিয়ে অনুচ্চারণের ভাষাও তৈরি করে।

একটা বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হরে যে সুনীল কর্মকার ছিলেন একজন কিংবদন্তিতুল্য বাউল সাধক শিল্পী ও ভাবুক। বাংলার ভাবসাধনায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ এর মীমাংসা হয়তো বিভিন্ন জন বিভিন্ন মাত্রায় আলোচনা করবেন। তিনি আলাদা এই কারণে যে তিনি কেবল একজন শিল্পীই না, তিনি একজন মানবতাবাদী এবং প্রতিবাদী বাউল সাধক ও ভাবুক। তার ভাবকেন্দ্রে মানুষ ভজনাই মূল কথা। বিভেদের চেয়ে ঐক্যের, মানবধর্মের জয়গান করেছেন তিনি। এটি তাকে অনন্য এক মহিমা দেয়।

আরও আরও কারণে সুনীল কর্মকার গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাউলতত্ত্বকে কেবল গান পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তাকে তিনি আত্ম-অন্বেষণের উপায় হিসেবে দেখেছেন, জীবনের দর্শন হিসেবে বিবেচনা করেছেন। লোকসংগীতকে, লোক-ঐতিহ্যকে তিনি নিরেট বস্তু আকারে না দেখে সমসাময়িক জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। বাউলতত্ত্বে যে মানববাদ, তা তিনি গভীর প্রেমে মায়ায় সযতনে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।

ধর্ম, জাতপাত, পরিচয় বা ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে যে বাউলদর্শন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখায়, সেটি তাঁর গানে কেবল নয়, জীবনেও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এই বিভাজিত সময়ে এটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

সুনীল কর্মকার ছিলেন একজন বিশুদ্ধ বাউলশিল্পী। নগরকেন্দ্রিক যে বাউলগান বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে—তার বিপরীতে তিনি বাউল গানকে রেখেছেন সাধনভজনের জায়গায়। বাউল গানই আত্মশুদ্ধির পথ মনে করেছেন, যাপন করেছেন এবং দর্শকশ্রোতাকে তিনি সহযাত্রী হিসেবে দেখেছেন।

সুনীল কর্মকারের কথা ও গানে সব ধরনের অসততা-ভণ্ডামি-অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন। প্রেম, ভক্তি, দেহতত্ব ও আত্মজিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচে, সমাজে ঐক্য তৈরি হয়।

সাধক সুনীল কর্মকার ছিলেন মহামতি জালাল উদ্দিন খাঁর একনিষ্ঠ ভাবশিষ্য। জালালগীতি তাঁর ভরাট কণ্ঠেই সঞ্চরণশীল নদীর মতো কলকল করে বেজে উঠত।

নৈতিক দিক থেকেও তার শক্তিশালী অবস্থান ছিল। বাউলকে তিনি কেবল পোশাকের আবরণে দেখতে চাননি, গানের ভঙ্গি বা বাদ্যযন্ত্র নয়, একটি দায়বদ্ধ জীবনদৃষ্টি হিসেবে দেখেছেন। একটি ভোগবাদী পুঁজিবাদী সময়ে এটি বিরল।

আরও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। সুনীল কর্মকার ছিলেন মহামতি জালাল উদ্দিন খাঁর গানের ওস্তাদ। জালাল খাঁর গানকে তিনি ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গেছেন। তার তুলনা এই সময়ে আর কেউ নেই। জালালের গানে সুরে গানে ধ্যানে সুনীল ছিলেন অনন্য মহাপরাক্রমশালী একজন সাধক।

৩.

সুনীল দা সেদিন গান করছিলেন জালাল উদ্দিন খাঁর ‘পিরিতি জান্নাতেরই ফল ধরল না মোর বাগানে।’ লালন সাঁইজির গানও করছিলেন,

‘আশাসিন্ধু তীরে বসে আছি সদায়/ সাধুর যুগল চরণধুলো লাগবে কি এই পাপীর গায়।’

এই গানটা আমি মোবাইলে ভিডিও করেছিলাম। আজ তার প্রয়াত হওয়ার দিনে গানটা তাঁরই কন্ঠে আবার শুনলাম। সাঁইজির গানের বাণীতে আছে,

দিনের দিন ফুরায়ে এলো

মহাকালে ঘিরে নিলো

বলে মূঢ় লালন, হীন হয়েছি ভজন

না জানি মোর ভাগ্যে কী হয়।

দিনের দিন এমনিভাবে দ্রুত ফুরিয়ে যাবে তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন সেদিন। তাঁকে মহাকালই ঘিরে নিলো। অনন্ত আলোকলোকে শান্তিতে থাকুন প্রিয় সুনীল কর্মকার। আপনার পুণ্যস্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: কবি

Ad 300x250

সম্পর্কিত