leadT1ad

সুনীলে প্রাণ চমকে ওঠে!

মেহেদী উল্লাহ
মেহেদী উল্লাহ

বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার। ছবি: সংগৃহীত

দেখার ভুল না হয়ে থাকলে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন শিল্পী সুনীল কর্মকার। ছবিটি ভাইরাল হয়েছে। মৃত্যুর আগে আগে মেঝেতে যাঁর জায়গা হয়েছে, সেই তাঁরই স্থান হয়তো বাউল গানপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠ, সুর আর ভক্তিমগ্ন গানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবিতে কোনো মঞ্চ নেই, নেই আলো, নেই করতালির উচ্ছ্বাস—আছে শুধু এক শিল্পীর নিঃসঙ্গতা। যে মানুষটি একসময় দোতারা, বেহালা কিংবা কণ্ঠের আবেশে শ্রোতাদের মোহিত করতেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকেই দেখা গেল হাসপাতালের অনাড়ম্বর মেঝেতে শুয়ে থাকতে। এটাই বাউলের জীবন! এর বেশি স্পর্শ করলে সে জীবন কি আর বাউলের? যদিও এই দৃশ্য আমাদের নাগরিক সেবার নিশ্চয়তার পক্ষে এক নীরব প্রশ্ন। সেদিকে আর যেতে চাই না।

বাউলের দেহ থেমে যায়, কিন্তু গান থামে না। এদেশে বাউলের জীবনের প্রাপ্তির সাথে গানের প্রাপ্তির কোনো মিল নেই। বাউল গান কালে কালে গ্রাম থেকে শহরের জৌলুশে আপ্যায়িত হয়। সুনীল কর্মকার শিল্পী হিসেবে এখনো আন্ডাররেটেডই। জীবনে এবং শিল্পে।

সুনীলের ভাবসংগীত মানুষের অন্তর্গত আবেগ, ভাবনা, আধ্যাত্মিক অনুভূতি বা জীবনের গভীর উপলব্ধি প্রধান বিষয়। গানে প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, প্রকৃতি, জীবন-মৃত্যু, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, ঐহিক ভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয় উঠে আসে, যা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আদি-অনাদির সঙ্গে যুক্ত করে।

সুনীলের আবেগপ্রবণ ও ধ্যানমগ্ন সুর, ব্যক্তিগত বিরহের গভীর প্রকাশ, আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতিমূলক ভাবসংগীত শ্রোতার মনে ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলে।

সুনীলের বিচ্ছেদ গান শুনলে বোঝা যায়—এখানে ব্যক্তিগত দুঃখের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক বেদনা। প্রিয়জন যেন কখনো মানুষ, কখনো ঈশ্বর, কখনো নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তা। তাঁর কণ্ঠে এই দ্বৈত অনুভূতি এমনভাবে মিশে যায় যে শ্রোতা বুঝতে পারে না—সে বিচ্ছেদের ক্রন্দন শুনছে, নাকি ভক্তির আরাধনা।

বাংলার বাউলসাধনার ভেতর ‘বিচ্ছেদ’ সাধারণ দুঃখ নয়; এটি জীবাত্মা ও পরমের দূরত্বের আর্তি। সুনীল কর্মকারের কণ্ঠে এই বিচ্ছেদ যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে—কারণ তাঁর গান কেবল প্রেমহারা মানুষের নয়, পরমের সান্নিধ্যে ভাবাবেশ।

শৈশব থেকেই সংগীতকে জীবন করে নেওয়া এই সাধক বাউল বহু যন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন এবং প্রায় দুই শতাধিক গান রচনা করেছেন। তাঁর সুরে মানবতা, ভক্তি, প্রেম ও জীবনদর্শনের অনুসন্ধান একাকার। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি সংগীতচর্চা থামাননি—বরং অন্ধকারের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছিলেন অন্তরের আলোকময় পথ। সংগীতের বর। এই জীবনযাত্রার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট তাঁর বিচ্ছেদগানে।

যেমন—

‘কার লাগিয়া এই দুনিয়ায় আইছো,

না বুঝিয়া সাধের যৌবন অকালে খোয়াইছো’—

এই পঙ্ক্তিতে কেবল প্রেমের আক্ষেপ নয়, মানবজন্মের অপচয়ের বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক প্রশ্ন উচ্চারিত হয়। আবার তাঁর গাওয়া জালাল গীতিতে সময়, মৃত্যু ও অনন্তের অনুভব মিলেমিশে থাকে। যেখানে জীবনস্রোতের ওপারে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের শূন্যতাকে অনুভব করে। সুনীল কর্মকারের বিচ্ছেদগান তাই ব্যক্তিগত বেদনার সীমা ছাড়িয়ে যায়। সেখানে প্রিয়জন মানে কখনো মানুষ, কখনো গুরু, কখনো সৃষ্টিকর্তা। তাঁর কণ্ঠে বিচ্ছেদ মানে শেষ নয়—বরং মিলনের আকাঙ্ক্ষা, আত্মার ঘরে ফেরার পথ। এই কারণেই তাঁর গান শুনলে মনে হয়, দুঃখ যেন ধীরে ধীরে ধ্যান হয়ে উঠছে তাঁর ভরাট কণ্ঠে।

সুনীলে প্রাণ চমকে ওঠে! সুনীল কর্মকারের বিচ্ছেদ গান শুনলে মনে হয়—কোনো অদৃশ্য দরজা হঠাৎ খুলে যায় ভেতরের গভীর অন্ধকারে। তাঁর কণ্ঠে নিহিত এক ধরনের মরমি কম্পন, যা শ্রোতার হৃদয়কে নিঃশব্দে স্পর্শ করতে বাধ্য। শৈশব থেকেই সংগীতে নিবেদিত এই বাউল শিল্পী তাঁর আবেগময় কণ্ঠে যে কোনো আসরকে একাই আবিষ্ট করে রাখতে পারতেন। একবার শীতকালে ময়মনসিংহের তেমনই একটি আসরে আমি ছিলাম। জালালউদ্দিন খাঁর দর্শন ও গানের প্রভাবে গড়ে ওঠা তাঁর সংগীতজগৎ মানুষের ভেতরের আত্মচেতনা, প্রেম ও স্রষ্টার প্রতি আকুলতাকে একসঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিল আসরে।

সুনীলের বিচ্ছেদ গানগুলোতে আমরা দেখি অনুতাপ আর অস্তিত্বের প্রশ্ন। ‘কার লাগিয়া এই দুনিয়ায় আইছো’—এই ধরনের পঙ্ক্তিতে জীবনের অস্থিরতা আর অপূর্ণতার আর্তি ধ্বনিত হয়, যেন মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করছে নিজের যাত্রার অর্থ নিয়ে। তাঁর গানের সুরে একদিকে থাকে মানবিক বেদনা, অন্যদিকে থাকে স্রষ্টার প্রতি আকুল টান—যা বাউল দর্শনের মূল সুরকেই বহন করে।

জালাল উদ্দিন খাঁর সাধনা ও গানের ধারা থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অসংখ্য গান পরিবেশন ও সুরারোপ করেছেন এবং দুই শতাধিক গান রচনা করে লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সংগীত মানবতাবোধ, জীবনদর্শন ও স্রষ্টাপ্রেমের বার্তা বহন করে মানুষের অন্তর্গত জগৎকে নাড়া দেয়। তাই তাঁর বিচ্ছেদ গান শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়—তা সমগ্র মানুষের অস্তিত্বের এক সার্বজনীন কান্না। এই কারণেই সুনীল কর্মকারের বিচ্ছেদ গান শুনলে প্রাণ চমকে ওঠে। মনে হয়, কোনো অদৃশ্য বাউল অন্তরের একতারা ছুঁয়ে বলছে—সব হারিয়েও মানুষ এখনো ভালোবাসে, এখনো খোঁজে, এখনো ফিরে যেতে চায় সেই চিরন্তন মিলনের দিকে।

বাউলের দেহ থেমে যায়, কিন্তু গান থামে না। এদেশে বাউলের জীবনের প্রাপ্তির সাথে গানের প্রাপ্তির কোনো মিল নেই। বাউল গান কালে কালে গ্রাম থেকে শহরের জৌলুশে আপ্যায়িত হয়। সুনীল কর্মকার শিল্পী হিসেবে এখনো আন্ডাররেটেডই। জীবনে এবং শিল্পে।

সুনীল কর্মকারের বিচ্ছেদ গান শুনলে প্রথমেই যে অনুভূতিটি জাগে, তা হলো দরদি কণ্ঠে এক গভীর অন্তর্গত আর্তি—যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রিয় সত্তার উদ্দেশে নীরব আর্তনাদ। বাউল ধারায় ‘বিচ্ছেদ’ কেবল প্রেয়সী-প্রেমিকের দূরত্ব নয়; বরং আত্মা ও পরম সত্তার মধ্যেকার ব্যবধানের প্রতীক। বাংলার লোকসংগীতে বহুদিন ধরেই এই হারানো ‘মনের মানুষ’কে খুঁজে ফেরার বেদনা প্রধান সুর হয়ে আছে। এই গানে বারবার অনুরোধের ভঙ্গি—সখি বলিস তারে—আসলে এক অসহায়তার ভাষা। সরাসরি বলতে না পারার লজ্জা, দূরত্ব, কিংবা অদৃশ্য ব্যবধান—সব মিলিয়ে এখানে প্রেম রূপ নেয় প্রার্থনায়। ফলে বিচ্ছেদ কেবল দুঃখ নয়, একধরনের আত্মসমর্পণও।

এই ধরনের বিচ্ছেদগান শ্রোতার প্রাণ ‘চমকে’ দেয় মূলত তিনটি কারণে—সরল ভাষায় গভীর বেদনা—যা সহজেই হৃদয়ে পৌঁছে যায়। ধীরলয়ের সুর ও দীর্ঘ টান—যা অপেক্ষা ও অভাবের অনুভূতিকে বাড়িয়ে তোলে। আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত—যেখানে হারানো মানুষ আসলে পরম সত্যের প্রতিরূপ।

সুনীলের বিচ্ছেদ গান শুনলে বোঝা যায়—এখানে ব্যক্তিগত দুঃখের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক বেদনা। প্রিয়জন যেন কখনো মানুষ, কখনো ঈশ্বর, কখনো নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তা। তাঁর কণ্ঠে এই দ্বৈত অনুভূতি এমনভাবে মিশে যায় যে শ্রোতা বুঝতে পারে না—সে বিচ্ছেদের ক্রন্দন শুনছে, নাকি ভক্তির আরাধনা।

বাউল শিল্পীরা বিকশিত হয়—কঠিন যাত্রা, প্রত্যাখ্যান, আর অন্তর্লীন শিল্পী জীবন থেকে গুণগ্রাহীর হৃদয়ে পৌঁছনোর আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। প্রতিটি বাউল শিল্পী সেই কঠোর পথ পেরিয়েছেন, তেমনি সুনীল কর্মকারও বাউল সুরকে ধরে রেখে নতুন শ্রোতা ও দার্শনিক অনুভূতির দিকে খুঁজে বেড়ান।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত