জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ/রংবাহারি গ্রামীণ অভিজাত সমাজ: রায় সাহেব, খান্দান আর বেপারিদের সমাহার
মোহাম্মদ রশীদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের অনুবাদের একাংশ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো দশম কিস্তি।

(নবম পর্ব পড়ুন এখানে)
বাংলার রাজনীতিতে বিষয়টা নিয়ে একটা ঢাক ঢাক গুড় গুড় থাকলেও আসল বিষয়টা কারোই অজানা ছিল না। কংগ্রেস দল তাদের জনসমর্থন ও সম্পদের জন্য মূলত ঔপনিবেশিক বাংলার ঐতিহ্যবাহী অভিজাত শ্রেণি, অর্থাৎ ভূস্বামী তথা জমির মালিকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অথচ তারাই মূলত মুসলমানপ্রধান বিভিন্ন দল ও তাদের নেতাদের উদ্যোগে শুরু হওয়া ভূমি সংস্কারের বিরোধিতা করে।
অবশ্য সমগ্র বাংলার রাজনীতিতে তো বটেই, সেই সঙ্গে গ্রামীণ সমাজেও হিন্দু ও মুসলমান নেতাদের মধ্যেকার এই সংঘাতটির অনুরণন ঘটেছিল। নিশ্চিতভাবেই, নানাভাবে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণির পতন ঘটছিল। সরকার যখন ঋণ সালিশী বা নিষ্পত্তি আইন চালু করল, তখন স্থানীয় মহাজনরা ঋণদান ব্যবসা গুটিয়ে নিতে আরম্ভ করল। অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখোমুখি হয়ে ভূস্বামী মুসলমান ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির শিকার হলেন। আমি একটি ‘কুলীন’ পরিবারের কথা জানি। তারা আমার মায়ের দিককার আত্মীয়। টিকে থাকার জন্য তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুই-সুতার কারুকাজ করা কাপড় খুচরো দরে বিক্রি করত, অথবা পেশাদার দর্জিদের কাছে সেগুলো ফেরি করে বেড়াত। বিভিন্নভাবে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম অভিজাত শ্রেণির দ্রুত পতন ঘটছিল।
বাইরের কোনো অঞ্চলের সঙ্গে বংশগতভাবে সম্পর্কিত ছিল। দীর্ঘদিনের আত্মপোলব্ধি, স্থানীয় বিভিন্ন জনশ্রুতি ও কিছু ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রের ওপর ভিত্তি করে তিনি তাঁর এই ধারণায় উপনীত হয়েছিলেন। তবে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সময় আমি উপলব্ধি করি যে, বাবার দেওয়া সামাজিক বিবরণগুলো ছিল নেহাতই দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ ও তুচ্ছ চিন্তাভাবনার চাইতেও অতিরিক্ত কিছু। সেসবের মধ্যে গভীর সামাজিক পর্যালোচনার ছাপ ছিল, যা আধুনিক যুগে শিক্ষক-গবেষকরা অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার একজন শিক্ষক অধ্যাপক এ. কে. এন. নাজমুল করিম আমাদের সমাজবিজ্ঞানের একটি কোর্সে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অভিজাত শ্রেণি সম্পর্কে আলোচনা করতেন। তাঁর লেখা ‘চেঞ্জিং সোসাইটি ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’ (অক্সফোর্ড, ১৯৫৬) বইটি এই বিষয়ের লেখা অন্যতম ধ্রুপদি কাজ; অধুনা বাংলাদেশের মুসলমান সমাজব্যবস্থার ওপর একটি অসাধারণ গবেষণা ছিল সেটা।
সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল এই যে, বাংলাদেশের মুসলমান অভিজাত সমাজ আর তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এক অনন্য যোগসূত্রে বাঁধা। কোনো ব্যক্তি বাইরের সঙ্গে যৎকিঞ্চিৎ কোনো জন্মগত সম্পর্ক দাবি করলেই মুসলমান ‘খানদানি’ বা অভিজাত শ্রেণির স্তরবিন্যাসে তার একটি বিশেষ অবস্থান বা অধিকার তৈরি হতো।
বাঙালি মুসলমান অভিজাতশ্রেণির বংশানুক্রমিক ধারার নিদর্শন পূর্বদিকে নয়, বরং পশ্চিমের দিকেই ছিল বেশি। কারো পূর্বপুরুষ যদি ইরান, আফগানিস্তান, সমরকন্দ, বোখারা বা এমনকি দিল্লি, উত্তর প্রদেশ বা লাহোর থেকেও এসে থাকতেন, তবে তা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক, যদিও সেটাই যে মর্যাদার সর্বোচ্চ স্তর ছিল তা নয়। সত্যি বলতে কি, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা অভিবাসী মুসলমানরা ভারতের স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের নিচু চোখে দেখত। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম আত্মপরিচয়ের ধারণায় এই দৃষ্টিভঙ্গিটি ঠিক কখনোই পুরোপুরি উবে যায়নি।
কেউ নিজের বংশপরিচয়কে উল্লিখিত অঞ্চলগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে বাগদাদ, মদিনা বা মক্কার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে সেটাকেই ঐতিহ্যবাহী মুসলিম অভিজাত শ্রেণির পরাকাষ্ঠা বলে গণ্য করা হতো! প্রকৃত পক্ষে, শুধু এ ধরনের পরিবারগুলোই আসল ‘খানদান’-এর মর্যাদা দাবি করতে পারত। কিছু ব্যক্তিগত বর্ণনা থেকে আমি জানতে পেরেছি যে যশোরসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকটি জেলায় বেশ কয়েকটি ‘আসল’ সৈয়দ পরিবার ছিল। বাকিদের উচ্চ বংশমর্যাদার দাবিগুলোর সম্ভবত কোনো ভিত্তি ছিল না।
১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বিখ্যাত পরিবারকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর লেখা কিছু নৃতাত্ত্বিক প্রবন্ধ নেড়েচেড়ে দেখার একটা বিরল সুযোগ হয়েছিল আমার। ষাটের দশকের মাঝামাঝি অনেকটা আকস্মিকভাবেই স্নাতক স্তরের সেই গবেষণা প্রবন্ধগুলো পড়ার সুযোগ পাই আমি। কিন্তু সেসময় আমি সেসবের কোনো কিছু লিখে রাখিনি। তবে একথা আমার মনে আছে যে সেই প্রবন্ধগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল ঢাকা ও অন্যান্য জেলার খানদানি পরিবারগুলোকে নিয়ে লেখা।
অংশত, সেই স্নাতক পর্যায়ের গবেষণাপত্রগুলোর স্মৃতির ওপর ভিত্তি করেই মুসলমান অভিজাত শ্রেণি সম্পর্কে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ গড়ে উঠেছে, যদিও নির্দিষ্ট কোনো গবেষণাপত্র বা লেখকের নাম আমার মনে নেই। পরিণত বয়সে মাঝে মধ্যে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে যাঁরা দাবি করেছেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা আধুনিক ইরাক, ইয়েমেন, ইরান বা বোখারা থেকে এসেছিলেন। তবে, মক্কা বা মদিনা থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছেন এমন দাবি করা মানুষের দেখা আমি তেমন একটা পাইনি।
আমার বাবা একবার শহরের এক স্কুল পরিদর্শকের কথা বলেছিলেন যাঁর পরিবার মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকাল-পরবর্তী প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। এ ধরনের বংশপরিচয় দাবি করা মানুষেরা ভারতের (বিশেষ করে বাংলার) অন্য সব মুসলমানের তুলনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতেন। এমনকি বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র, এবং আমার বাবা যেসমস্ত ঘটনার কথা বলতেন, সেসব থেকেও জানা যায় যে মুঘল শাসকরাও তাঁদের রাজদরবারে পারস্য ও তুর্কি অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীদেরই অগ্রাধিকার দিতেন।
নিজেদের অভিজাত বলে দাবি করতেন যেসব মুসলমান, তাঁরা বাংলাদেশ বা ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশের এক বিশাল অংশজুড়ে পরিচিত বিভিন্ন পদবি ব্যবহার করতেন, যেমন সৈয়দ, মীর, খান, মিয়া, ভূঁইয়া, তালুকদার, চৌধুরী, কাজী, ইত্যাদি। কিন্তু এসব পদবি তাঁদের অভিজাত বংশপরিচয়ের প্রমাণ দিত না। তবে, ভূমিসংক্রান্ত কিছু দলিলপত্র এই বিষয়টি নিশ্চিত করে যে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় প্রাক-ব্রিটিশ আমলের সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল।
আমার গ্রাম ও আশেপাশের এলাকাগুলো সোনারগাঁওয়ের প্রাক-মুঘল মুসলমান শাসনাধীন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সোনারগাঁও একসময়ে ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার একটি বড় অংশের রাজধানী। একই সঙ্গে এটি ছিল বাণিজ্য, প্রশাসন, সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কার্যক্রম এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আশপাশের গ্রামগুলোর মুসলিম খানদানগুলো খুবসম্ভবত সেই সব সৈনিক, ইসলাম ধর্ম প্রচারক, সামন্ত প্রভু, বিচারক, কর আদায়কারী, ব্যবসায়ী এবং সুবিধাভোগী পরিবারের উত্তরসূরি ছিল, যারা প্রাক-ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিক বাংলায় ক্ষমতার বিভিন্ন পালাবদল ও শাসনব্যবস্থার ওলটপালটের কারণে লক্ষ্যহীনভাবে ভেসে গিয়েছিল। এদের মধ্যে গুটিকতেক ছিলেন বড় বড় জায়গিরদার (আজীবন ভোগদখলের জন্য প্রদান করা সামন্ততান্ত্রিক ভূ-সম্পত্তির অধিকারী) এবং তাঁদের প্রতিনিধি, যেমন চৌধুরী, তরফদার, চাকলাদার, মীর, তালুকদার ও পাটোয়ারি। ব্রিটিশরা যখন ঔপনিবেশিক জমিদারী প্রথা চালু করে, তখন এদের অনেকেই কেবল নামকাওয়াস্তে টিকে ছিল। বিভিন্ন মৌখিক বর্ণনা এবং কিছু প্রকাশিত নথিপত্রে এসব পর্যবেক্ষণের সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায়।
শুধু বংশগত পদবি বা এমনকি নবঅর্জিত সম্পদও যে মুসলমান সমাজে (খানদানি) মর্যাদার নিশ্চয়তা দিত, তা নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমার নানা বেশ সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর আগে তাঁর বাবা পাটের ব্যবসায় প্রচুর অর্থ-কড়ি উপার্জন করেছিলেন। সেই অর্থ তিনি জমি ও বাণিজ্যিক ভূসম্পত্তিতে বিনিয়োগ করেন। যদিও পরে সেই সম্পত্তি তাঁর নয় ভাইয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়।
আর, আমি বড় হতে হতে তাঁদের বেশিরভাগেরই আর্থিক অবস্থা সম্পন্ন মধ্যবিত্তের স্তর থেকে নিচে নেমে গিয়েছিল। আমার নানা তাঁর নামের শেষে কোনো পদবি ব্যবহার করতেন না, কিন্তু তাঁর কয়েকজন ভ্রাতুষ্পুত্র প্রচুর সম্পদ অর্জন করেছিলেন এবং তাঁরা তাঁদের নামের শেষে ‘চৌধুরী’ পদবি যোগ করেছিলেন। ধারণা করা হতো, সেসব পদবির গুটিকতেক, যেমন তালুকদার, চৌধুরী, মীর, ইত্যাদি ছিল সেই পদবিধারীদের অতীতের পেশার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া। তালুকদাররা মূলত রাজস্ব আদায়কারী বা মধ্যস্বত্বভোগী হলেও, তারা এমন সব স্থানীয় ক্ষমতা, বংশানুক্রমিক বিশেষ অধিকার ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ভোগ করত, যা ইউরোপীয় সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতার সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।
ছোটখাটো জমিদাররাও ‘তালুকদার’ পদবি ব্যবহার করতেন এবং চর্চাটা দীর্ঘদিন টিকে ছিল। আমার এক সহপাঠীর পিতামহ ও প্রপিতামহ নীল ও পাটের ব্যবসা করে ধনী হয়েছিলেন। শুধু পারিবারিক নামের শেষে ‘তালুকদার’ পদবি যোগ করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা তালুকদারি এস্টেটের একটি ছোট অংশ কিনেছিলেন। তাঁর পরিবার তখনো পাটের ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল এবং সেই তালুকদারি অংশ ছিল নেহাতই একটি অতি ক্ষুদ্র ভূ-সম্পত্তি, যেখান থেকে তাঁদের তেমন কোনো আয় রোজগার হতো না।
আর, ধরে নেওয়া হতো যে (হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই) ‘চৌধুরী’রা হচ্ছেন সুলতানি বা মুঘল আমলে বড় ভূ-স্বামী বা এস্টেট-মালিকদের হয়ে খাজনা বা কর আদায়কারী, যতটা আমি তাঁদের সম্পর্কে শুনেছি ও পড়েছি। পাশের গ্রামের চৌধুরী পদবিধারী একটি পরিবারের কথা আমার জানা আছে, যারা নিজেরা বাংলায় প্রাক-ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা বংশপরিচয় দাবি করত এবং তাদের সঙ্গে ঢাকার অভিজাত বা ‘খানদানি’ পরিবারগুলোর বেশ ভালো যোগাযোগ ছিল।
আমাদের এলাকায় খান, ভূঁইয়া, চৌধুরী ও খন্দকার পদবিধারীদের কিছুটা দেখা গেলেও, ছোটবেলায় দেখা দু-একজন ছাড়া সৈয়দদের কথা তেমন মনে পড়ে না। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন স্কুলের মৌলভি সাহেব, যিনি আমার বাবারও শিক্ষক ছিলেন। সোনারগাঁওয়ে বাড়ি ছিল তাঁর, এবং তিনি নিজের সৈয়দ বংশপরিচয় নিয়ে বেশ গর্ববোধ করতেন।
.png)






-40e58c.jpeg)


