ad

৯০ বছর বয়সে কেন লংমার্চ করেছিলেন ভাসানী

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ১৪
মাওলানা ভাসানী ৯০ বছর বয়সে লংমার্চ শুরু করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত
মাওলানা ভাসানী ৯০ বছর বয়সে লংমার্চ শুরু করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবনের শেষ বছরটি ছিল বয়সের কাছে হার না মানার এক বিরল রাজনৈতিক অধ্যায়। শরীর ভেঙে পড়েছিল, দীর্ঘদিন ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। অথচ সেই মানুষটিই ১৯৭৬ সালের মে মাসে পা বাড়িয়েছিলেন ফারাক্কার দিকে। ৯০ পেরোনো এক বৃদ্ধ হাসপাতালের বিছানা ছেড়ে হাজারো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছিলেন ‘লংমার্চ।

ভাসানীর কাছে ফারাক্কা শুধু একটি স্থাপনা ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পানির অধিকার ও সার্বভৌম স্বার্থের প্রতীক। গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে গেলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ কীভাবে বিপন্ন হতে পারে সেই বার্তাই তিনি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন দেশ-বিদেশে। বয়স, অসুস্থতা কিংবা শারীরিক দুর্বলতা কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফারাক্কার প্রশ্নটিকেই তিনি পরিণত করেছিলেন তাঁর শেষ জীবনের বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ে। যে লড়াইয়ে তাঁর হাতে ছিল না কোনো ক্ষমতার অস্ত্র, ছিল কেবল মানুষের ঢল, একটি লাঠি এবং পানির ন্যায্য অধিকারের দাবিতে উচ্চারিত দৃঢ় কণ্ঠ।

এটি কি শুধুই বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন

ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চকে শুধু একটি বাঁধবিরোধী মিছিল হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা কঠিন। কারণ এর কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের পানি, নদী ও বেঁচে থাকার অধিকার। ভারত পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু করে ১৯৬১ সালে। এর উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার পানি ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে নিয়ে গিয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ধরে রাখা। ব্যারাজটি ১৯৭৫ সালে কার্যকর হয়। এতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের আশঙ্কা ছিল, উজানে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে কৃষি, মৎস্য, নৌযান, নদী ও পরিবেশে। ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নেমে আসে প্রায় ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে, যেখানে ফারাক্কা কার্যকর হওয়ার আগে স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। ভাসানীর কাছে এই ভাগাভাগির কূটনৈতিক বিরোধ পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল ভাসানীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা। ১৯৭৬ সালে তাঁর বয়স ৯০ বা এর বেশি ৯৫ বছর বলেও উল্লেখ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। বছরের শুরুতেই তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ছিলেন। এমনকি বাংলা নববর্ষের দিনও তিনি হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু ১৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরই ঘোষণা দেন, বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত না হলে তিনি ফারাক্কার দিকে লংমার্চ করবেন। এই ঘোষণা অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। যে বয়সে একজন মানুষের বিশ্রামে থাকার কথা, সেই বয়সে ভাসানী বেছে নিলেন রাস্তা এবং গণমানুষের দাবি প্রতিষ্ঠার কাজকে।

ফারাক্কা লংমার্চ শুরুর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ছবি: সংগৃহীত
ফারাক্কা লংমার্চ শুরুর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ছবি: সংগৃহীত

ভাসানীর আশঙ্কা ছিল, ফারাক্কায় একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে। নদীর পানি কমলে শুধু নদী শুকায় না কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনও বদলে যায়। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ফারাক্কা থেকে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের বিষয়টিকে মাওলানা ভাসানী উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে চিঠি বিনিময়ের সময় তিনি তাঁকে বাংলাদেশে এসে পানি প্রত্যাহারের প্রভাব সরেজমিনে দেখার আহ্বানও জানান।

কেন রাজশাহী থেকে ফারাক্কার দিকে

ভাসানী ঢাকায় বসে বিবৃতি দিয়ে থামেননি। তিনি আন্দোলনকে নিয়ে গেলেন সীমান্তের কাছাকাছি রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের দিকে। ২ মে গঠিত হয় ফারাক্কা লংমার্চ পরিচালনার জাতীয় কমিটি। এরপর ১৬ মে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক পদযাত্রা। দুই দিনে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আন্দোলনকারীরা কানসাটে পৌঁছান। এটি ছিল শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কয়েক লাখ পর্যন্ত বলা হয়। এখানেই ভাসানীর কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতেন, ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে ফেলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ফারাক্কার পানি নিয়ে দাবিকে আন্তর্জাতিক ও জনমতের প্রশ্নে পরিণত করা সম্ভব।

ভাসানীর লক্ষ্য ছিল ভারতকে শুধু প্রতিবাদ জানানো নয়, বরং বাংলাদেশের পানির দাবিকে দৃশ্যমান করা।

লংমার্চের সময় তিনি বারবার বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যার কথা বলেছেন। তাঁর আন্দোলন এমন এক সময়ে হয়, যখন বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবেও গঙ্গার পানি সমস্যাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলছিল। ১৯৭৬ সালের মে মাসেই ইসলামিক সম্মেলনের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর পরপরই ১৬ মে ভাসানীর লংমার্চ শুরু হয়। ফলে তাঁর পদযাত্রা শুধু দেশের ভেতরের রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়ে থাকেনি, এটি বাংলাদেশের পানি কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।

৯০ বছর বয়সেই কেন

ভাসানীর কাছে বয়স ছিল শরীরের হিসাব, আন্দোলনের নয়। তিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দেখাতে চেয়েছিলেন কোনো দেশের নদী ও পানি যখন তার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, তখন সেটি শুধু প্রকৌশল বা কূটনীতির বিষয় নয়, এটি মানুষের অধিকার। আর সেই কারণেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ৯০ পেরোনো ভাসানী রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি বলেছেন, ভাটির দেশের পানির অধিকার নিয়ে ভাটির মানুষকেই কথা বলতে হবে।

ফারাক্কা লংমার্চে ব্যারাজ ভাঙেনি, রাতারাতি পানির সংকটও কাটেনি। কিন্তু বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের পানি-অধিকার আন্দোলনের ভাষা। ভাসানী বাংলাদেশের পানি-অধিকার প্রশ্নকে এমন এক গণআন্দোলনে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা পরে দুই দেশের পানি কূটনীতির ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি এবং পরে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির পথ তৈরিতে ১৯৭৬ সালের আন্দোলনটি আন্তর্জাতিকীকরণের ভূমিকা রেখেছিলেন।

আজও গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত আলোচনায় ফারাক্কার আলোচনা ফিরে আসে। মিছিল শেষ হয়েছে, নেতাও চলে গেছেন, কিন্তু পাঁচ দশক পরও ফারাক্কার প্রশ্নটি এখনো নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত