গৌরব চট্টোপাধ্যায় গাবুর সাক্ষাৎকার

গৌতম চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দার্শনিক, ছিলেন মায়েস্ত্রো

আজ গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। তিনি ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র দলনেতা, যিনি ‘মণিদা’ নামে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। তাঁকে নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন গৌতম-পুত্র ‘লক্ষীছাড়া’ ব্যান্ডের গৌরব চট্টোপাধ্যায় গাবু।

স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: আমরা গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে দেখি ইতিহাসের জায়গা থেকে। কিন্তু সন্তান হিসেবে আপনি তাঁকে দেখেছেন ঘরের মানুষ হিসেবে। সেই গৌতম চট্টোপাধ্যায় কেমন?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: বাবার চরিত্রে দুটি প্রধান দিক ছিল। প্রথমত, তিনি ছিলেন ভীষণ ডিসিপ্লিনড। কাজের ক্ষেত্রে এই নিয়মনিষ্ঠা তাঁর বড় পরিচয়। যখন তিনি কাজ করতেন, একদম কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতেন।

দ্বিতীয়ত, বাবা হিসেবে আমি তাঁকে যেমন পেয়েছি, তাতে দুই ধরনের রূপই দেখেছি। আমার পড়াশোনার ব্যাপারে যেমন তিনি কঠোর ছিলেন, আবার সিনেমা দেখাতেও নিয়ে যেতেন। বাবার সান্নিধ্যে আমি গানবাজনা, ছবি, সাহিত্য—সহ জীবনের নানা দিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।

এ ছাড়া যেকোনো গ্যাদারিং-এ বাবা ছিলেন ‘সেন্টার অফ অ্যাট্রাকশন’। সেই ক্ষমতাটা তাঁর ছিল। মানুষ হিসেবে সবাই ভীষণ ভালোবাসত তাঁকে। খুব বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন।

স্ট্রিম: গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গানের ভাষা, সুর-কম্পোজিশন, দর্শন—কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানে?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: আমি বরাবরই বলে এসেছি, বাবার গানগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিনি যে কথাগুলো লিখে গেছেন, তা সেই সময়ে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও তার চেয়ে কম নয়। যেমন ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’, ‘এই মুহূর্তে’ গানগুলো শুনলে মনে হয় বাণীর মতো। এখন এগুলোই ঘটছে পৃথিবীকে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে লেখা অনেক গানই যেন ভবিষ্যতের কথা বলছিল। তখনকার বোকাবাক্সগুলো এখন হাতের ছোট বোকাবাক্স হয়ে গেছে।

‘নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে ঘুন ধরে বিশ্বাসে এই মুহূর্তে,

খোলা বাজারের হাওয়া চুপিসারে করে ধাওয়া এই মুহূর্তে,

হাওয়ায় অসুখ হয় ভিতরে ভিতরে ক্ষয় এই মুহূর্তে,

তবুও মানুষ হাসে গান গায় ভালো বাসে এই মুহূর্তে’

যেমন ‘হাওয়ায় অসুখ হয়, ভিতরে ভিতরে ক্ষয়’—গানের এই লাইনগুলোর সঙ্গে কোভিড পিরিয়ডের বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা ভাবলে আজও অবাক লাগে। ইটস ক্রেজি।

বাবাকে আমার ভীষণ দার্শনিক মনে হয়। তাঁর গানের কথা তো বটেই, সুরের ক্ষেত্রেও তিনি কত এলিমেন্ট ব্যবহার করতেন, তা বিস্ময়কর। কত গভীর উপলব্ধি আর ভাবনা। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি নিশ্চিতভাবেই একজন মায়েস্ত্রো। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর গানের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে শিখেছি। সব মিলিয়ে আমার কাছে তিনি একজন সত্যিকারের মাস্টার।

স্ট্রিম: গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গানের কথায় শহর, রাজনীতি, প্রেম, একাকিত্ব, সাধারণ মানুষের জীবন—সবকিছু এসেছে। বাংলা গানের বিষয়বস্তুর পরিসরে এই যে বদল, বৈচিত্র্য আনা, এই ব্যাপারগুলোকে কীভাবে দেখেন?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: বাবা তাঁর জীবনটাকে পুরো এক্সপেরিয়েন্স করেছেন। জীবনের দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি যাই বলি না কেন, একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি যে বিশাল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁর গানে তারই প্রতিফলন দেখা যায়। বাবা ভার্সেটাইল মানুষ ছিলেন। এই বহুমুখী অভিজ্ঞতার প্রতিফলন তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে বিদ্যমান।

বাবা জীবনকে অনেক বড় পরিসরে দেখেছেন। প্রচুর বই পড়া, সিনেমা দেখা, মানুষের সঙ্গে মেশা, চারিদিকে ঘুরে বেড়ানো—এই সবকিছু থেকেই তিনি সমৃদ্ধ হয়েছেন। নিজের জীবনকে যেভাবে এক্সপেরিয়েন্স করেছেন, ঠিক সেভাবেই তা গানের কথায় তুলে ধরেছেন। সেই কারণেই তাঁর গান আজও এত প্রাসঙ্গিক।

স্ট্রিম: সত্তরের দশকে যখন মহীনের ঘোড়াগুলি তৈরি হলো, তখন খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছিল। এটা কি তৎকালীন মেইনস্ট্রিম গানের তুলনায় নতুন ধারার সাউন্ড বা কথার কারণেই ছিল?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: তখনকার মেইনস্ট্রিম বাংলা গানের পাশাপাশি মহীনের ঘোড়াগুলিকে রাখলে বোঝা যায়, ইটস সামথিং এলস অল টুগেদার। গানের বিষয়বস্তু, কম্পোজিশন বা অ্যারেঞ্জমেন্টের সবক্ষেত্রেই মহীন ছিল অরিজিনাল সাউন্ডিং ব্যান্ড। মানে যেখানে ওয়েস্টার্ন এলিমেন্টের সঙ্গে আমাদের নিজেদের এলিমেন্ট এত সুন্দর ভাবে মিশছে যে, সেখানে মনেও হচ্ছে না যে, কী মিশেছে!

তখন মানুষ যেমন গানে অভ্যস্ত ছিল, মহীনের ঘোড়াগুলি তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু নিয়ে এসেছিল। যারা এই ধারার গানকে ভালোবেসেছিলেন, তাঁরা ছিলেন একদম হার্ডকোর ফলোয়ার। নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে টিকিট বিক্রি করতেন, ব্যান্ডের প্রতিটি শোতে থাকতেন।

একটা সময় (সত্তরের দশকের শেষে) মহীনের ঘোড়াগুলি ভেঙে গেলেও, গানগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। ঠিক বাউল বা লোকগানের মতোই গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরত। অনেকে হয়তো জানত না গানগুলো কার! কিন্তু কলেজের ক্যান্টিন, ইউনিভার্সিটির আড্ডা কিংবা বন্ধুদের আলোচনায় গানগুলো ঠিকই রয়ে গিয়েছিল। অনেকেই না জেনেই এই গানগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

স্ট্রিম: নব্বইয়ের দশকে গৌতম চট্টোপাধ্যায় যখন মহীনের ঘোড়াগুলির ‘সম্পাদিত’ অ্যালবাম নিয়ে ফিরলেন, সেই সময়ের প্রেক্ষাপট আপনার স্মৃতিতে কেমন?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: মহীনের ঘোড়াগুলি ভেঙে গেলেও বাবার ক্ষেত্রে মিউজিকটা কখনোই থামেনি। আমাদের বাড়িতে গান-বাজনা সবসময়ই চলত। গান-বাজনা বাবার কাছে অক্সিজেনের মতো ছিল, আর আমার ক্ষেত্রেও তা ন্যাচারালি অক্সিজেনের মতোই। তো, নতুন কিছু তৈরি হওয়ার প্রসেসটা খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। এটা এমন নয় যে হঠাৎ করে কোনো ড্রামাটিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফিরেছিল।

মূলত, বাবার ইচ্ছে ছিল অল্টারনেটিভ বাংলা গানের ওপর কিছু মিউজিক ভিডিও তৈরি করার। সেসময় কলকাতা দূরদর্শনে তিন এপিসোডের মিনি সিরিজের কাজ হয়, যেখানে ইন্ডি মিউজিক ভিডিওগুলোর দেখানো হতো। সেই মিউজিক ভিডিও তৈরির জন্যই মূলত গানগুলো রেকর্ড করা হয়েছিল।

কিছু গান ছিল বাবার পোস্ট-মহীন সময়ের লেখা, যেমন ‘পড়াশোনায় জলাঞ্জলি’, ‘কথা দিয়া বন্ধু’ বা ‘পৃথিবী’। পৃথিবী গানটা তখন সবে লেখা হয়েছে। পাশাপাশি বাবার খুব প্রিয় ছিলেন অরুণ দা (অরুনেন্দু দাস)। তাঁর গানগুলো তখনও কোথাও পাবলিশ হয়নি, বাড়িতে-আড্ডায় গাইতেন। বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সেগুলো ছড়িয়েছিল। সঙ্গে সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের (ভূমি) গান, দেবজ্যোতি মিশ্রসহ আরো অনেকের গান। সব মিলিয়েই মিউজিক ভিডিওর কাজটা করেছিলেন।

এভাবে মিউজিক ভিডিওর জন্য যখন কাজগুলো হলো, তারপরই বাবা মনে করলেন, এগুলো তো একটা অ্যালবাম হতে পারে! মানে, ইনিশিয়ালি অ্যালবাম করার কোনো প্ল্যানই ছিল না তাঁর। রেকর্ডিংগুলো শোনার পরই মনে করলেন, এটা তো মহীনের ঘোড়াগুলির অ্যালবাম হিসেবে দারুণ জমে যাবে। এভাবেই পুরো প্রসেসটা হয়েছিল।

এরপর বইমেলায় যখন অ্যালবামটি এল, সেটা ছিল অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। তখন কলকাতা ময়দানে বইমেলা হতো, অনেক স্পেস ছিল। স্টলের সামনে সবাই গোল হয়ে বসে গান করছিলাম। লোকে ভিড় করছে, যারা আগে এই গান শোনেনি তাঁরা জিজ্ঞেস করছে, ‘এটা কী গান? এসব তো শুনিনি!’ তখন তাঁদের বলা হচ্ছিল, ‘এই যে স্টলের ভেতরেই তো পাওয়া যাচ্ছে।’

এভাবেই ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ অ্যালবামের পর মহীনের ঘোড়াগুলি আর বাবার একটা ভিকট্রি হলো। অ্যালবামটা বেরোনোর পর লোকে এগুলো খোঁজা শুরু করল, কিন্তু খুঁজে না পেয়ে আবার বইমেলাতে এসে বলত, ‘আমাদের ওই গানগুলোই চাই!’ এভাবে ‘ঝরা সময়ের গান’, ‘ক্ষ্যাপার গান’, ‘মায়া’ অ্যালবামও প্রকাশ হলো। আসলে অল্টারনেটিভ বাংলা মিউজিক ভিডিও করার ইচ্ছা থেকেই পুরো প্রসেসটা আবার চালু হয়েছিল। আর ‘মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত’—এই নামটাও একদম হঠাৎ করেই বাবার মাথায় এসেছিল। ব্যাপারটা পুরোটাই ছিল একটা ন্যাচারাল ফ্লো।

স্ট্রিম: গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বাংলাদেশেও তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। এখনও অনেকের কণ্ঠে তাঁর গান শোনা যায়, অনেক ব্যান্ড তাঁকে অনুসরণ করে। সব মিলিয়ে তাঁর এই প্রভাবের জায়গাটা বা বাংলা গানে নতুন পথ খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: বাবার সরাসরি ইনফ্লুয়েন্স তো আমার ওপর ছিলই, কিন্তু তিনি আসলে আরও অনেকের জন্যই নতুন দরজা খুলে দিয়েছিলেন। যারা তাঁর কাজ দ্বারা প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তাঁরা শুধু মিউজিকেই নয়, জীবনের পথেও একটা নতুন দিশা পেয়েছেন। বাবার কাছ থেকে আমি তো ইন্সপায়রেশন সব দিক দিয়েই পেয়েছি, যা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সত্তরের দশকে মহীনের ঘোড়াগুলি ছিল অরিজিনাল সাউন্ডিং ব্যান্ড। এটা এমন ছিল না যে কোনো ওয়েস্টার্ন সুরের ওপর শুধু বাংলা লিরিক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর সাউন্ড ছিল একদম আলাদা, যা আগে কেউ শোনেনি। এককথায়, এটি ছিল কলকাতার নিজস্ব আরবান সাউন্ড।

বাবার কাজ করার পদ্ধতি ছিল অন্যরকম। নব্বইয়ের দশকে যখন ‘সম্পাদিত’ বা পরবর্তী কাজগুলো হচ্ছে, তখনও তিনি এমন সব মানুষকে সঙ্গে নিয়েছিলেন, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা। তিনি যেমন ‘বেস্ট অফ দ্য বেস্ট’দের নিয়ে কাজ করতেন, আবার অনেক সময় যাদের কেউ এক্সপেক্টও করে নি, তাঁদেরকে নিয়েও গান করাতেন। তাঁর মধ্যে এই দুটি দিকই ছিল।

স্ট্রিম: ধন্যবাদ আপনাকে।

গৌরব চট্টোপাধ্যায়: আপনাকে এবং স্ট্রিমকে ধন্যবাদ

সম্পর্কিত