রমজানের রোজার শেষে ঈদ আসে অসীম আনন্দের আভাস নিয়ে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে ঈদ উদযাপনের ধরন। বর্তমানে ঈদের আনন্দ অনেকটাই সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। ঈদের দিন নতুন জামা পরে প্রথম কাজই হলো পারফেক্ট একটি ছবি তোলা। ছবি মনের মতো না এলে ঈদের আনন্দই যেন মাটি হয়ে যায়। তারপর পছন্দের ছবিগুলোতে ফিল্টার দিয়ে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে আপলোড করা। এছাড়া এখন তো ঈদ নিয়ে ভ্লগ বানানোর রীতিমতো হিড়িক পড়ে গেছে চারপাশে। ঈদের পর অন্তত তিন-চার দিন পর্যন্ত চলে নতুন নতুন জামা পরে ছবি আপলোড দেওয়ার পালা। কার জামা কত ভালো হলো, কার ড্রেসের ডিজাইন কতটা ইউনিক—তা নিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় আর মেসেঞ্জার গ্রুপে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এখন মানুষের ঈদের আনন্দ অনেকাংশেই নির্ভর করে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক আর কমেন্টের ওপর। একটি সুন্দর ছবি আপলোড দেওয়ার পর যদি প্রত্যাশামতো লাইক বা রিঅ্যাক্ট না পড়ে, তবে ঈদের দিনটাই যেন মাটি হয়ে যায় কারও কারও। মানুষ আমাকে কীভাবে দেখছে, আমার পোশাকের প্রশংসা করছে কি না—এর ওপর ভিত্তি করেই যেন আজকালকার উৎসবগুলোতে নিজের আনন্দ খুঁজে নেওয়া হয়। ঈদের দিন বিকেলে আত্মীয়দের বাসায় যাওয়ার বদলে এখনকার ট্রেন্ড হলো বন্ধুদের সঙ্গে কোনো দামি বা নান্দনিক রেস্টুরেন্টে গিয়ে চেক-ইন দেওয়া।
অথচ আজ থেকে কয়েক বছর আগেও ঈদ উদযাপনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এত বেশি ছিল না। ‘নাইন্টিজ কিড’ বা যারা নব্বই দশকের শেষদিকে জন্মেছেন, তাদের সবার কাছেই সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক ঈদ উদযাপনের বাইরেও ঈদ পালনের একটি আলাদা স্মৃতি রয়েছে।
সেইসব হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনের দিকে চোখ ফেরানো যাক-
দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইলো না
এদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে ২০১০ সালের দিকে। বিশেষ করে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন আর সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট আসার পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এর পাশাপাশি পাল্টে গেছে উৎসব উদযাপনের সংজ্ঞাও। এখনকার ঈদ মানেই যেন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা। যাঁর উপস্থিতি যতবেশি গ্রহণযোগ্য (লাইক কমেন্ট যার যত বেশি), তাঁর চেষ্টা তত সফল।
কিন্তু একসময় ঈদ মানে ছিল পরিবার, আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া।
আশপাশের সবাই মিলে ঈদের চাঁদ দেখতে যাওয়া ছিল ঈদের আগেই ঈদের আনন্দ পাওয়ার মতো ঘটনা। তখন আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখতে পেলে তো কথাই নেই। সারা এলাকায় বয়ে যায় আনন্দের ঢেউ। স্কুলে পড়ার সময় মেসেঞ্জারে জিআইএফ বা স্টিকার পাঠিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ তখন ছিল না। বন্ধু-বান্ধবদের ঈদ মোবারক জানানোর প্রধান মাধ্যম ছিল রঙিন সব ঈদের কার্ড। টিফিনের টাকা জমিয়ে বইয়ের দোকান থেকে গ্লিটার দেওয়া সুন্দর সুন্দর কার্ড কিনে তার ভেতর ছড়া লিখে বন্ধুদের উপহার দেওয়ার মধ্যে যে নির্মল আনন্দ ছিল, তা আজকের ডিজিটাল যুগে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ঈদের আগের রাত বা চাঁদরাতে চাচাতো-ফুফাতো বা খালাতো বোনেরা মিলে একসঙ্গে গোল হয়ে বসে হাতে মেহেদি দেওয়ার সেই স্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে। তখন গুগল বা পিন্টারেস্ট ছিল না বলে মেহেদি দেওয়া হতো মেহেদির ডিজাইনের পাতলা বইগুলো দেখে দেখে। সেই বই দেখে দেখে কার হাতে কত সুন্দর নকশা তোলা যায়, তা নিয়ে চলত তুমুল প্রতিযোগিতা। হাতে মেহেদি দিয়ে হাত উঁচু করে ঘুমিয়ে পড়া এবং পরদিন সকালে উঠে কার মেহেদির রং কত গাঢ় হলো, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলত।
ঈদের দিন সকালটা শুরু হতো মায়ের হাতে রান্না করা লাচ্ছা সেমাই খেয়ে। তারপর নতুন জামাজুতো পরে আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া আর সালামি তোলা। তখনকার ঈদে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কোনো চল ছিল না। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে ঘুরে সেমাই, পায়েস খাওয়া আর সালামি পাওয়ার মধ্যেই ছিল উৎসবের আসল আনন্দ।
সোশ্যাল মিডিয়া জনপ্রিয় হওয়ার আগে ঈদের সময় বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল টেলিভিশন। ঈদের দিন থেকে শুরু করে টানা সাত দিন পর্যন্ত টিভি চ্যানেলগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হতো। কোন চ্যানেলের কোন ভালো নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বা সিনেমা দেখা হবে, সেগুলো ঈদের আগেই ঠিক করে রাখা হতো। বিশেষ করে ঈদের সিনেমা নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ কাজ করত। পরিবারের সবাই মিলে ড্রয়িংরুমে বসে রিমোট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন চ্যানেল দেখার সেই মুহূর্তগুলো সময়ের ঘষা লেগে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
বিশেষ করে, ঈদের মধুর স্মৃতির সঙ্গে দারুণভাবে জড়িয়ে আছে বিটিভির দুটি অনুষ্ঠানের নাম। একটি হলো হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’, অন্যটি হুমায়ূন আহমেদের নাটক। ঈদের রাতে যদি হুমায়ূন আহমেদের নাটক থাকত, তাহলে যে যেখানেই থাকুক না কেন, সময়ের আগে বাড়ি ফিরে টিভির সামনে বসতোই।
অতীতের ঈদ কেন এত ভালো লাগে
পুরোনো দিনের ঈদের কথা মনে পড়লে আমাদের মনে যে তীব্র স্মৃতিকাতরতা বা নস্টালজিয়া কাজ করে, মনোবিজ্ঞানে এর চমৎকার একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা এই বিষয়টিকে ‘রোজি রেট্রোস্পেকশন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মানুষের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই অতীতের নেতিবাচক বা কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলোকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলে এবং কেবল সুন্দর, আনন্দদায়ক স্মৃতিগুলোকে সযত্নে ধরে রাখে। ফলে অতীতকে সব সময় বর্তমানের চেয়ে বেশি রঙিন ও মধুর মনে হয়। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকাল কিংবা তারুণ্যের শুরুর দিকের স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। কারণ দায়িত্বের ভারমুক্ত জীবন সবসময়ই আনন্দের। আর ঈদ হলে তো কথাই নেই।
যতই দিন যাচ্ছে, উৎসব পালনের উপায় ও উপকরণ ততই বদলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো তাদের এই ডিজিটাল ঈদ উদযাপনই সবচেয়ে স্পেশাল। তাই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের রূপ কিছুটা পালটে গেলেও, খুশির ঈদকে বরণ করে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মাঝে এখনো বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে সবসময়।