সন্দেহপ্রবণ মনোভাব নাকি সরলতা, জীবনে কোনটি বেশি উপকারী

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ১৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত? আমরা কি সবাইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করব, নাকি সবার প্রতিই সন্দেহের দৃষ্টি রাখব? সমাজে সাধারণত দুই ধরনের মানুষ দেখা যায়—একদল মানুষ সবকিছুতেই ইতিবাচকতা খোঁজে, সবার প্রতি খুব সহজে আস্থা স্থাপন করে (যাদের আমরা প্রায়শই ‘সরল’ বা নাইভ বলে থাকি)। আরেক দল মানুষ স্বভাবগতভাবেই নেতিবাচক বা সন্দেহপ্রবণ। তারা মনে করে মানুষের স্বভাবই হলো স্বার্থপরতা, সুযোগ পেলেই মানুষ প্রতারণা করবে।

সমাজে একটি সাধারণ বিশ্বাস প্রচলিত আছে, যারা সবকিছুতে সন্দেহ করে, তারা বোধহয় অন্যদের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান। তারা সহজে কারও দ্বারা প্রতারিত হয় না। অন্যদিকে, যারা সবাইকে সহজে বিশ্বাস করে, তারা বোকা। এর ফলে এই মানুষগুলো সহজেই ঠকে যায়।

কিন্তু বিজ্ঞান কী বলছে? সত্যিই কি সন্দেহপ্রবণ হওয়া সরল হওয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক?

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে প্রকাশিত ইজ ইট বেটার টু বি নাইভ অর সিনিক্যাল? শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে এমন কিছু চমকপ্রদ তথ্য, যা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

‘সিনিক্যাল জিনিয়াস’ বা সন্দেহপ্রবণদের বুদ্ধিমান ভাবার ভ্রান্তি

আমরা প্রায়ই মনে করি, যারা কথায় কথায় অন্যের খুঁত ধরে বা মানুষের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তারা চারপাশের জগৎ সম্পর্কে বেশি সচেতন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সিনিক্যাল জিনিয়াস ইলিউশন’। এর বাংলা হচ্ছে, সন্দেহপ্রবণদের বুদ্ধিমান ভাবার ভ্রান্তি।

আমাদের সমাজে সিনিক্যাল বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের একটু আলাদা কদর রয়েছে। ভাবা হয়, তারা আগেভাগেই বিপদ আঁচ করতে পারে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন অন্য কথা। জার্মান গবেষক ওলগা স্তাভ্রোভা এবং তাঁর দল এ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণার বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ পরীক্ষায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ মানুষদের জ্ঞানীয় দক্ষতা বা বুদ্ধিমত্তা মোটেও বেশি নয়। বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বুদ্ধিমত্তা কম থাকে।

শুধু তা-ই নয়, মানুষের প্রতারণা শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও সন্দেহপ্রবণরা খুব একটা পারদর্শী নয়। কারণ, তারা সবকিছুর মধ্যেই মন্দ কিছু খোঁজার চেষ্টা করে, ফলে কোনটি সত্যিকারের বিপদ আর কোনটি নয়—তার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে।

মিথ্যা ধরতে পারদর্শী কারা

অনেকে ভাবেন, সিনিক বা সন্দেহপ্রবণ মানুষেরা খুব সহজেই অন্যের মিথ্যা ধরে ফেলতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সন্দেহপ্রবণ মানুষেরা মিথ্যা ধরতে সবচেয়ে বেশি ভুল করে। এর কারণ খুব সহজ। তারা ধরে নেয় যে, সবাই মিথ্যা বলছে। তাই তারা কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যা বলছে—তার পার্থক্য করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিমশিম খায়।

যখন একজন মানুষ ধরে নেয়, সবাই স্বার্থপর ও প্রতারক, তখন সে অবচেতনভাবেই অন্যদের সঙ্গে রুক্ষ বা প্রতিরক্ষামূলক আচরণ করতে শুরু করে। এই ধরনের আচরণ চারপাশের মানুষদের দূরে ঠেলে দেয়। যারা সত্যিকার অর্থেই ভালো বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারত, তারা এই নেতিবাচক আচরণের কারণে দূরে সরে যায়। ফলে সন্দেহপ্রবণ মানুষটি ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, তারা যখন সবসময় প্রতারিত হওয়ার ভয়ে থাকে, তখন তারা এমন সব পরিস্থিতি বা মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে সত্যিই তাদের ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সেলফ ফুলফিলিং প্রফেসি’ বা স্বয়ংক্রিয় ভবিষ্যদ্বাণী। অর্থাৎ, আপনি জগৎকে যেমন ভাববেন, আপনার সাথে তেমনই ঘটতে থাকবে।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখার যত সুবিধা

গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত সরলতা বা অন্ধ বিশ্বাস আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক থাকার চেয়ে ইতিবাচক থাকা মানুষের জন্য বেশি লাভজনক।

যারা মানুষের প্রতি সহজে আস্থা স্থাপন করে, তারা সমাজে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাদের চারপাশে একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। বিপদের সময় খুব সহজেই তারা অন্যের সাহায্য পেয়ে থাকে। এমনকি তারা যদি কখনো প্রতারিতও হয়, তবু তাদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা অনেক বেশি থাকে। কারণ, তারা একটি খারাপ অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো পৃথিবীকে বিচার করে না। তারা দ্রুত সেই কষ্ট কাটিয়ে উঠে আবারও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জীবন শুরু করতে পারে।

স্বাস্থ্য ও সফলতার ওপর প্রভাব

বিবিসির মতে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ, তাদের শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা সবসময় বেশি থাকে। এর ফলে তাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা এবং এমনকি ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

অন্যদিকে, যারা মানুষের ওপর আস্থা রাখে, তাদের মানসিক প্রশান্তি বেশি থাকে। তারা কর্মক্ষেত্রেও বেশি সফল হয়। কারণ, যে মানুষটি তার সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে পারে না, সে কখনোই একজন ভালো টিম লিডার বা কর্মী হতে পারে না।

ঠকে যাওয়া এড়ানোর সেরা উপায়: ‘স্মার্ট ট্রাস্ট’

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাহলে সবাইকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করব এবং ঠকে যাব? বিজ্ঞানের মাঝামাঝি রাস্তার কথা বলেছে, যাকে বলা হয় ‘স্মার্ট ট্রাস্ট’ বা বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্বাস।

এর মানে হলো, আপনি মানুষের প্রতি ইতিবাচক থাকবেন এবং ডিফল্ট বা প্রাথমিক অবস্থায় মানুষকে বিশ্বাস করবেন; কিন্তু সেই সঙ্গে আপনার চোখ-কান খোলা রাখবেন। অন্ধভাবে কাউকে বিশ্বাস করার আগে বা কোনো বড় ঝুঁকি নেওয়ার আগে তার অতীত রেকর্ড বা প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করে নেবেন। কিন্তু বিনা কারণে বা প্রমাণের অভাবে আগে থেকেই কাউকে সন্দেহ করবেন না।

অর্থাৎ, আপনার মনমানসিকতা হবে এমন—‘আমি ধরে নিচ্ছি আপনি একজন ভালো মানুষ, যতক্ষণ না আপনি এর উল্টোটা প্রমাণ করছেন।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি আপনাকে প্রতারকদের হাত থেকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনি ভালো মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সাহায্য করবে।

পৃথিবীতে প্রতারক আছে, এটা যেমন সত্য; তেমনি চারপাশে অসংখ্য ভালো ও সৎ মানুষও রয়েছে—এটাও সত্য। তাই, জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে হলে মানুষের প্রতি আস্থাশীল হতে হবে। একজন হতাশাবাদী সিনিক হওয়ার চেয়ে, কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করে একজন ইতিবাচক ও বিশ্বাসী মানুষ হওয়া সব দিক থেকেই আমাদের জন্য বেশি মঙ্গলজনক।

সম্পর্কিত