জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

চাঁদরাতে মেহেদি উৎসব: ঐতিহ্য থেকে ট্রেন্ডে বদলে যাওয়ার গল্প

একসময় বাড়ির ছোট থেকে বড় সকল নারী সদস্যই পাতা মেহেদি চুল, নখ আর হাতের তালুতে দিতেন। সেইসব দিন বদলেছে। যুগে যুগে মেহেদি দেওয়ার ধরনে ও মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ঈদের সকালে মেহেদি রাঙানো হাত দেখার সেই চিরন্তন আবেগ আজও বদলায়নি।

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬, ১৩: ২৪
চাঁদরাতে মেহেদি উৎসব: ঐতিহ্য থেকে ট্রেন্ডে বদলে যাওয়ার গল্প। স্ট্রিম গ্রাফিক

পুবের আকাশে ঈদের চাঁদ উঠলেই শুরু হয়ে যায় চাঁদরাতের ব্যস্ততা। আর বাঙালি নারীদের কাছে এই রাত যেন মেহেদি ছাড়া অপূর্ণ। হাতের তালুতে লালচে বা খয়েরি রঙ না থাকলে ঈদের সকালটাও যেন ঠিক জমে না।

একসময় বাড়ির ছোট থেকে বড় সকল নারী সদস্যই পাতা মেহেদি চুল, নখ আর হাতের তালুতে দিতেন। সেইসব দিন বদলেছে। যুগে যুগে মেহেদি দেওয়ার ধরনে ও মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ঈদের সকালে মেহেদি রাঙানো হাত দেখার সেই চিরন্তন আবেগ আজও বদলায়নি।

পাটায় বাটা মেহেদি

একসময় চাঁদরাত মানেই ছিল বাড়ির উঠোনে বসে পাটায় মেহেদি পাতা বাটার ধুম। বাড়িতে মেহেদি গাছ থাকলে তো কথাই নেই। গাছ না থাকলে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে জোগাড় করা হতো। তারপর শিলপাটায় বেটে তৈরি হতো মেহেদি। বাটা মেহেদির গন্ধে ম ম করত গৃহস্থের বাড়ির চারপাশ। এই গন্ধই যেন বলে দিত আগামীকাল ঈদ।

তখনকার ডিজাইন ছিল খুবই সহজ। হাতের তালুর মাঝে বড় একটি গোল দাগ, চারপাশে ছোট ফোঁটা, কিংবা আঙুলের ডগায় টুপির মতো করে মেহেদি লাগানো—এটাই ছিল জনপ্রিয় স্টাইল। নখ লাল করার জন্য অনেকে চুন আর সাবানের মিশ্রণও ব্যবহার করতেন।

কিছুদিন আগেও বড় বোন বা কাছের কোনো আত্মীয়ের হাতে দলবেঁধে মেহেদি দেওয়াই ছিল চাঁদরাতের মূল আকর্ষণ। মেহেদির ডিজাইন যেমনই হোক, মেহেদিতে হাত রাঙানোর জন্য হাত পেতে অপেক্ষা করার মত মিষ্টি অনুভূতি কমই আছে।

সারা রাত হাতে মেহেদি মেখে, হাত পলিথিন বা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে ঘুমানো এবং সকালে উঠে লাল টুকটুকে হাত দেখার যে রোমাঞ্চ, তা আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই রূপকথার মতো।

টিউব মেহেদির যুগে

পাটায় পাতা বাটার সেই ঝক্কি কমিয়ে বাজারে আসে টিউব মেহেদি। বিশেষ করে ‘শাহজাদী’ মেহেদির কথা নব্বইয়ের দশকের বা তার পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় সব মেয়েরই মনে থাকার কথা। এই অ্যালুমিনিয়াম টিউব মেহেদির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, এর সাহায্যে খুব চিকন করে হাতভর্তি নকশা করা যেত।

পাতা মেহেদির সেই গোল চাঁদের জায়গা দখল করে নিল ফুল, লতাপাতা আর কলকার ডিজাইন। মেহেদির নামগুলোও ছিল শ্রুতিমধুর। এগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় ছিল এলিট মেহেদি, লিজান মেহেদি, মমতাজ মেহেদি, আইভি ব্রমেহেদি। কে কোন ব্র্যান্ডের মেহেদী কিনছে কিংবা কোন ব্র্যান্ডের মেহেদি ব্যবহার গাঢ় রঙ আসছে তা নিয়ে নারীদের মধ্যে চলত গবেষণা।

টিউব মেহেদির বক্সে সেসময় উপহার হিসেবে ছোট একটি মেহেদির ডিজাইন বুক দেওয়া হতো। সেই বইয়ের পাতা উল্টে উল্টে পছন্দের নকশাটি হাতে আঁকার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে বসে থাকতো।

পাঁচ মিনিটেই রঙ: ইনস্ট্যান্ট মেহেদির উন্মাদনা

টিউব মেহেদির পাশাপাশি একসময় বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইনস্ট্যান্ট বা ম্যাজিক মেহেদি। এই মেহেদি হাতে লাগানোর মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই গাঢ় খয়েরি, লাল বা কালচে রঙ চলে আসত। দ্রুত রঙ পাওয়ার জন্য অনেকেই আগ্রহ নিয়ে এটি ব্যবহার করতেন, যদিও এতে কেমিক্যালের ব্যবহার ছিল বেশি। তবে যত দ্রুত রঙ আসত, তত দ্রুতই সেই রঙ ফিকে হয়ে যেত।

কোণ মেহেদির প্রসার এবং অর্গানিক মেহেদির ট্রেন্ড

টিউব মেহেদি ও ইনস্ট্যান্ট মেহেদির পর গত কয়েক বছর ধরে নারীদের পছন্দের শীর্ষে আছে কোণ মেহেদি। কোণ মেহেদির ব্যবহার অতীতেও ছিল। তবে তা সাধারণের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে ঈদ, বিয়ে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে কোণ মেহেদি সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই কোণ মেহেদিগুলোর মাধ্যমে অতি সূক্ষ্ম নকশাও নিখুঁতভাবে আঁকা যায়। বাজারে প্রচলিত কোণ মেহেদিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো কাভেরি মেহেদি।

তবে বর্তমানে এই কোণ মেহেদির ধরণেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। কেমিক্যালযুক্ত ইনস্ট্যান্ট মেহেদির বদলে সবাই এখন ঝুঁকছেন ‘অর্গানিক কোণ মেহেদি’র দিকে।

শুধু মেহেদির ধরণে নয়, এর ডিজাইনের ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। সেই ছোট্ট ডিজাইন বুকের জায়গা এখন পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। মেহেদির নতুন নতুন ট্রেন্ডি ডিজাইনের জন্য মেয়েরা এখন চোখ রাখেন পিন্টারেস্ট বা গুগলে।

বর্তমানে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অসংখ্য অনলাইন পেজ সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত, হাতে তৈরি অর্গানিক মেহেদি কোণ বিক্রি করছে। খাঁটি মেহেদি গুঁড়োর সঙ্গে এসেনশিয়াল অয়েল (যেমন নীলগিরি, ল্যাভেন্ডার বা টি-ট্রি অয়েল), চিনি এবং লেবুর রস মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই মেহেদি। রঙ আসতে একটু সময় লাগলেও, গুণগত মান আর নিরাপত্তার কারণে এই অর্গানিক মেহেদিই এখন অনেকের প্রথম পছন্দ।

স্মার্টফোনের যুগে পিন্টারেস্ট ও গুগলের নকশা

শুধু মেহেদির ধরণে নয়, এর ডিজাইনের ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। সেই ছোট্ট ডিজাইন বুকের জায়গা এখন পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। মেহেদির নতুন নতুন ট্রেন্ডি ডিজাইনের জন্য মেয়েরা এখন চোখ রাখেন পিন্টারেস্ট বা গুগলে। সেখান থেকে পছন্দের ছবিটি সেভ করে নিজের হাতে আঁকেন অথবা মেহেদি আর্টিস্টকে দিয়ে করিয়ে নেন।

কিছুদিন আগেও বড় বোন বা কাছের কোনো আত্মীয়ের হাতে দলবেঁধে মেহেদি দেওয়াই ছিল চাঁদরাতের মূল আকর্ষণ। মেহেদির ডিজাইন যেমনই হোক, মেহেদিতে হাত রাঙানোর জন্য হাত পেতে অপেক্ষা করার মত মিষ্টি অনুভূতি কমই আছে।

আগে যেমন হাতভর্তি নকশা করার চল ছিল, এখনকার ট্রেন্ড কিছুটা ভিন্ন। এখন এরাবিক, গালফ, ম্যান্ডালা কিংবা ছিমছাম মিনিমালিস্ট ডিজাইনগুলোই বেশি চলছে। হাতের তালুর কিছুটা অংশ ফাঁকা রেখে সূক্ষ্ম ও জ্যামিতিক নকশা করতেই আজকাল মেয়েরা বেশি পছন্দ করছেন। এ ছাড়া ঈদের থিম অনুযায়ী চাঁদ-তারা বা লণ্ঠনের মোটিফও মেহেদির ডিজাইনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকে আবার মেহেদির নকশার ভেতর প্রিয়জনের নাম জুড়ে দিতে পছন্দ করেন।

মেহেদি দেওয়ার উপকরণ বা মাধ্যমে হয়তো পরিবর্তন এসেছে। পাতা বাটার বদলে জায়গা করে নিয়েছে রেডিমেড অর্গানিক কোণ, আর কাগজের বইয়ের জায়গা নিয়েছে পিন্টারেস্টের ডিজিটাল স্ক্রিন। কিন্তু চাঁদরাতের সেই উত্তেজনা এবং ঈদের সকালে হাতের তালুতে মেহেদির গাঢ় রঙ দেখার যে সুখ, তা একটুও বদলায়নি।

এবার ঈদেও নিশ্চয়ই আপনার হাতে উঠবে নতুন কোনো ট্রেন্ডি নকশা, আর সেই অর্গানিক মেহেদির নিখুঁত ডিজাইনে আর গাঢ় রঙে পুর্ণতা পাবে আপনার ঈদের আনন্দ। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক!

বিষয়:

সম্পর্কিত