এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ৫ মে ২০২৩ দিগন্ত টেলিভিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। টেলিভিশনটি ওই দিন ঘটনার লাইভ সম্প্রচার করছিল। সেই রাতেই দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে রাতে তিনি অফিসেই ছিলেন। কী ঘটেছিল সেদিন, টেলিভিশন দুটি কীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল, আজও কেন চালু হচ্ছে না—এসব বিষয়ে ভিডিও সাক্ষাৎকার কথা বলেছেন স্ট্রিমের সঙ্গে। পুরো সাক্ষাৎকার ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি হয়েছে।
সালেহ ফুয়াদ

বর্তমানে আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। তবে ২০১৩ সালের ৫ই মে-এর ঐতিহাসিক ঘটনার সময় আমি একজন মিডিয়াকর্মী হিসেবে কাজ করছিলাম। ওইদিন মতিঝিল শাপলা চত্বরে সারা দেশের আলেম-ওলামাদের সংগঠন 'হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ'-এর মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে একটি নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। সে সময় আমি 'দিগন্ত টেলিভিশন'-এর উপ-নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলাম।
৫ই মে দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ৬ই মে গভীর রাতে, প্রায় আড়াইটার দিকে হঠাৎ করে আমাদের টেলিভিশনটি শাটডাউন করে দেওয়া হয়। অনেকটা অস্ত্রের মুখে কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়াই সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আমি ৫ই মে-এর পুরো ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। এই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার যে ঘটনা ঘটে, তারও আমি চাক্ষুষ সাক্ষী। পরবর্তীতে এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে মামলা হয়েছে, আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মামলার সাক্ষ্য প্রদান করেছি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ই মে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা সবাই জানি, এর আগে শাহবাগে একটি আন্দোলন হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতের তৎকালীন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার দিন জামায়াতের পক্ষ থেকে মতিঝিল থেকে পল্টন পর্যন্ত প্রায় দশ-পনেরো হাজার লোকের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এই রায় প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ শাস্তির এবং আইন সংশোধনের দাবিতে পরের দিন থেকে শাহবাগ চত্বরে 'গণজাগরণ মঞ্চ'-এর ব্যানারে সমাবেশ শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের এই সমাবেশটি মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হলেও, একপর্যায়ে তা আর শুধু এই দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এর ডালপালা অন্যান্য দিকেও বিস্তৃত হতে থাকে। প্রথমদিকে প্রচুর মানুষের সমাগম এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি মুখ্য থাকলেও, পরে এই সমাবেশটি একটি স্থায়ী রূপ নেয়। এর ফলে পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়' (পিজি হাসপাতাল)-এর চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে এবং বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই মঞ্চের কয়েকজন সংগঠকের ফেসবুক পোস্ট এবং কার্যক্রমে ধর্ম অবমাননামূলক নানা বিষয় উঠে আসতে শুরু করে।
পাশাপাশি তাদের মধ্যে একধরনের ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রকাশও দেখা যায়। তারা তালিকা প্রকাশ করে নির্দেশ দিতে থাকে কী কী বন্ধ করতে হবে বা কোথায় কোথায় হামলা করতে হবে। এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন জায়গায় মোমবাতি প্রজ্বলন ও পতাকা উত্তোলনের মতো নানা কর্মসূচি শুরু হয়। এমতাবস্থায় বেশ কয়েকজন ব্লগারের ধর্ম অবমাননামূলক লেখালেখি বিভিন্ন পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে, আলেম-ওলামাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে 'হেফাজতে ইসলাম' নামের প্ল্যাটফর্মটি শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা আন্দোলন গড়ে তোলে।
তাদের মূলত ১৩ দফা দাবি ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং ব্লাসফেমি আইন কার্যকর করা। বিশেষ করে ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে শাহবাগের পাল্টা আন্দোলন হিসেবে সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা এতে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে থাকে। এই প্রতিবাদকে জনসমক্ষে তুলে ধরার ক্ষেত্রে 'দৈনিক আমার দেশ' পত্রিকার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এর ফলে আমরা দেখতে পাই, হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে আলেম-ওলামারা বিশাল সব সমাবেশ করেন। এসব সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এবং তারা সরকারের প্রতি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও আল্টিমেটাম পেশ করেন।
এদিকে শাহবাগের সমাবেশটিও ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে, কারণ সাধারণ মানুষ এসব কর্মকাণ্ডে কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া আদালতে বিচার চলাকালীন আইন সংশোধন করার বিষয়টিও অনেক আইনজ্ঞ ইতিবাচকভাবে নেননি। শাহবাগের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৬ই এপ্রিল শাপলা চত্বরে একটি মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
দিগন্ত টেলিভিশনের পক্ষ থেকে আমরা ওই সমাবেশটি সরাসরি সম্প্রচার করেছিলাম। সে সময় এর চেয়ে বড় সমাবেশ আর দেখা যায়নি। বাস, ট্রেন ও নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ আলেম-ওলামা পায়ে হেঁটে ঢাকায় এসে ৬ই এপ্রিলের ওই সমাবেশে যোগ দেন। এই বিপুল জনসমাগম মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে এবং একটি অভূতপূর্ব ঐক্যের সৃষ্টি করে।
বলা যায়, তখন দেশে দুটি মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। একদিকে শাহবাগকে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একধরনের আল্ট্রা-সেক্যুলার (উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ) মেরুকরণ, অন্যদিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলো হেফাজতের অধীনে একটি বড় জোটবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। তারা তাদের ১৩ দফা দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। ওই একই সময়ে ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও আন্দোলন চলছিল।
৫ই মে আমরা দেখলাম, ঢাকার ৬টি প্রবেশপথে হেফাজতের অভাবনীয় জনসমাগম। কিন্তু একপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ওপর পয়েন্টে পয়েন্টে হামলা ও আক্রমণ চালানো শুরু হয়। আমার এখনো মনে পড়ে, ওইদিন রাতে আমাকে টেলিভিশনের কার্যালয়েই অবস্থান করতে হয়েছিল। কারণ, সারা দেশ থেকে সংঘর্ষ ও গণ্ডগোলের খবর এবং ফুটেজ আসছিল। ঢাকা শহরের পরিস্থিতিও ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, ফলে বাইরে যাতায়াত করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সারা দেশ থেকে সংঘর্ষ, হামলা এবং কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও আমাদের কাছে আসছিল। সকাল থেকেই ঢাকার ৬টি স্পটে আমাদের ক্যামেরাম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও লাইভ বা 'অ্যাজ লাইভ' সংবাদ প্রচার করছিল। সংঘর্ষ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করল, তখন হেফাজতে ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা ৬টি স্পট থেকে মার্চ করে শাপলা চত্বরে এসে জড়ো হবে। কথা ছিল, হেফাজতের তৎকালীন আমির মাওলানা আহমদ শফী শাপলা চত্বরে এসে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন এবং ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে স্থায়ী অবস্থান নেবেন।
আমরা দেখলাম, বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ মতিঝিল শাপলা চত্বরের দিকে ছুটে আসছেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালানো হলো। সারাদিন জুড়েই ব্যাপক সংঘর্ষ চলল। বিভিন্ন স্থানে আলেম-ওলামাদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ অত্যন্ত নৃশংসভাবে হামলা ও আক্রমণ চালাল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশ দিয়ে যত মিছিল আসার চেষ্টা করেছে, সবগুলোর ওপর তারা আক্রমণ করে। এর মধ্যেই ৬-৭ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ মানুষ শাপলা চত্বরে এসে অবস্থান নেন এবং বিকেল থেকে তাদের সমাবেশ শুরু হয়। যেহেতু এটি একটি অনেক বড় ঘটনা ছিল, তাই সব মিডিয়াই সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের চেষ্টা করছিল। দিগন্ত টেলিভিশনের কার্যালয় মতিঝিলের খুব কাছে হওয়ায়, সরাসরি সম্প্রচারের জন্য আমরা সেখানে একটি লাইভ ইউনিট পাঠাই।
কিন্তু মানুষের প্রচণ্ড চাপ, পুলিশের ব্যাপক টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং চতুর্দিক থেকে আসা মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজের মধ্যে আমরা কেবল সন্ধ্যা ৭টার সংবাদ পর্যন্তই লাইভ সম্প্রচার করতে পেরেছিলাম। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ আমাদের লাইভ সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর নিয়ে যায়। ফলে আমরা আর সরাসরি সম্প্রচার করতে পারিনি; বিকল্প হিসেবে মোটরসাইকেলে করে ক্যাসেট পাঠিয়ে 'অ্যাজ লাইভ' সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যমে খবর কাভার করার চেষ্টা করছিলাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে লালবাগ মাদ্রাসা থেকে মাওলানা আহমদ শফীর সমাবেশে আসার কথা থাকলেও, পুলিশ তাকে সেখানেই আটকে দেয়। এদিকে পুলিশের অ্যাকশনও তীব্র হতে থাকে। রাত আনুমানিক ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে আমরা খবর পাই যে, সমাবেশ ভণ্ডুল করে সেখানে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর জন্য চতুর্দিক থেকে পুলিশ লাইনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ জড়ো করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে গুলশান থেকে বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রেস কনফারেন্স করলেন। আলেম-ওলামাদের ওপর এই নৃশংস হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সবাইকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসার আহ্বান জানালেন।
এমতাবস্থায় সারা দেশে তখন একধরনের টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাত সম্ভবত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে (সময়টা আমার স্মৃতিতে কিছুটা অস্পষ্ট হতে পারে) আমরা খবর পেতে লাগলাম যে, পুলিশ চারপাশ থেকে আলেম-ওলামাদের ঘেরাও করে ফেলেছে। সম্ভবত 'অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট' অথবা 'ফ্রি শাপলা' নামে এই উচ্ছেদ অভিযানের নামকরণ করা হয়েছিল। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি নিউজ কাভার করার জন্য। সময় টিভি-সহ আরও কয়েকটি টেলিভিশন তখন সরাসরি সম্প্রচার করছিল। এরপর আমরা দেখলাম, বিশেষ করে নটরডেম কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে শত শত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি অর্থাৎ যৌথ বাহিনী একত্রে অপারেশন ও অ্যাটাক শুরু করেছে।
বলা যায়, আমার জীবনে এর আগে কখনো এত মুহুর্মুহু গোলাগুলি এবং বিকট শব্দ শুনিনি। অবিরাম গুলির আওয়াজ এবং সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল, ওখানে রীতিমতো কোনো মহাযুদ্ধ চলছে, চারপাশ যেন একেবারে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের রিপোর্টাররা নিরাপদ দূরত্বে থেকে যেসব ফুটেজ সংগ্রহ করে আনছিলেন, আমরা সেগুলোই সম্প্রচার করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, রাত আনুমানিক ১০টা বা ১১টার দিকে আমাদের কাছে নির্দেশ এল যে, এই ধরনের ফুটেজ বা সংবাদ আর প্রচার করা যাবে না।
যাই হোক, কড়া সেন্সরশিপের মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো সংবাদ প্রচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরপর নতুন ফুটেজ আসছিল এবং আমরা তা দেখাচ্ছিলাম, যদিও তখন আমরা লাইভে ছিলাম না। আমার মনে হয়, তখন মাত্র একটি বা দুটি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করছিল। সময় টেলিভিশনের লাইভটি ছিল পুলিশের সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ পুলিশ যেভাবে মুভ করছিল, তারাও সেভাবেই মুভ করছিল। এছাড়া বাকি সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ছিল, দূর থেকে আড়ালে-আবডালে যতটুকু সংবাদ সংগ্রহ করা যায়, ততটুকুই করছিল।
আগেই বলেছি, মঞ্চের সামনে আমাদের একটি ইউনিট ছিল, তবে আমরা লাইভ ব্রডকাস্ট করতে পারিনি। আসলে অনেকে মনে করেছিলেন আমরা সরাসরি সম্প্রচার করছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার পর থেকেই আমরা লাইভ কানেকশন হারিয়ে ফেলি। এরপর থেকে আমরা 'অ্যাজ লাইভ' সম্প্রচার করেছি। অর্থাৎ, ফুটেজগুলো নিয়ে এসে অনেক ক্ষেত্রে কোনো এডিটিং ছাড়াই প্রচার করেছি। স্ক্রিনে 'অ্যাজ লাইভ' লেখা থাকলেও, সাধারণ দর্শক টেকনিক্যাল টার্ম না বোঝার কারণে হয়তো ভেবেছিলেন ওটাই সরাসরি সম্প্রচার।
রাত ১১টা-১২টার দিকে আমাদের কাছে খবর এল যে, মূল মঞ্চের আশেপাশে এবং কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংকের সামনে বেশ কিছু লাশ পড়ে আছে। আমাদের টিম সেখানে গিয়ে প্রায় ১০-১২টি মৃতদেহ দেখতে পায়। আমরা সেগুলোর দৃশ্য ধারণ করে এনে সংবাদে প্রচার করি। এর মধ্যেই আরও কিছু লোমহর্ষক খবর আসতে শুরু করল। একটি খবর এল যে, কিছু মৃতদেহ গাড়িতে তুলে জুরাইন গোরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা সেখানেও আমাদের ক্যামেরা ইউনিট পাঠাই। সেখানে এ ধরনের কিছু আলামত পাওয়া গেলেও, পুলিশের কড়া বাধা এবং চারপাশের চরম গোপনীয়তার কারণে আমরা খুব একটা তথ্য বা ফুটেজ সংগ্রহ করতে পারিনি।
বলা যায়, প্রায় পুরো রাত জুড়েই পুলিশের এই অ্যাকশন চলেছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলেম-ওলামাদের ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা বা তাড়িয়ে দেওয়া। টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে এই অপারেশন চলে। চারদিকে ধোঁয়া ও টিয়ারশেলের কারণে আমাদের সংবাদকর্মীরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। টিয়ারশেলের ঝাঁঝে আমরা অফিসেও ঠিকমতো বসতে পারছিলাম না, কাগজের আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিলাম। আমাদের দুই শিফটের কর্মী অফিসে আটকা পড়েছিলেন, কেউ আর বের হতে পারেননি।
রাত আনুমানিক দেড়টা বা দুইটার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, বলতে গেলে একদম থমথমে হয়ে আসে। বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসলেও আমাদের আর বাইরে মুভ করার কোনো সুযোগ ছিল না। তখন হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে একটি ফোন আসে। জানানো হয় যে, তিনি আহত অবস্থায় এক জায়গায় আটকা পড়ে আছেন। আমরা চিন্তা করলাম, কীভাবে তাঁকে উদ্ধার করা যায় বা অন্তত নিউজটা কাভার করা যায়। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করার পর দেখা গেল, পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে।
এরকম এক শ্বাসরুদ্ধকর ও ক্লান্তিকর পরিস্থিতিতে রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে আমি আমার অফিসে বসা। হঠাৎ ইসলামিক টেলিভিশন থেকে আমার কাছে একটি ফোন এল। আমি আগে সেখানে কাজ করায় সেখানকার সিইও আমাকে ফোন করে বললেন, ‘ভাই, পুলিশ আমাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করে স্টেশনে অ্যাটাক করেছে এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে।" আমি অবাক হয়ে বললাম—তাই নাকি? তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ, যন্ত্রপাতি ভেঙেচুরে তারা আমাদের চ্যানেল শাটডাউন করে দিচ্ছে।’
এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের নিউজরুমে ফোন করে ইসলামিক টিভিতে হামলার বিষয়টি ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করতে বললাম। একই সাথে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় এল। আমি সিকিউরিটি গার্ডদের নির্দেশ দিলাম মেইন গেটসহ সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে। এরপর জরুরি আলোচনার জন্য সব বিভাগের প্রধানদের উপরের ফ্লোরে ডাকলাম।
মিটিং শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই নিচে শাটারে প্রচণ্ড শব্দে বাড়ি দেওয়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম কেউ হয়তো আমাদের অফিসেও হামলা করতে এসেছে। আমরা সবাইকে অ্যালার্ট করে ভেতরের দরজাগুলো লক করে দিলাম। পরে সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখলাম, প্রায় ১০০-১৫০ জন র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্য আমাদের অফিস পুরোপুরি ঘেরাও করে ফেলেছে। তারা যেকোনো মুহূর্তে গেট ভেঙে ফেলতে পারে—এমন পরিস্থিতি বুঝে আমরা বাধ্য হয়ে গেট খুলে দিই।
ভেতরে ঢুকেই তারা প্রথমে সব সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। আমাদের অফিস ছিল ভবনের ৮, ৯ ও ১০ তলায়। তারা প্রথমে ৮ ও ৯ তলার নিউজরুমে ঢোকে। পুরো দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মোল্লা নজরুল নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওই সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ এবং আইজিপি ছিলেন সম্ভবত শহীদুল হক। আমরা খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। ইসলামিক টিভি খুব বেশি ইকুইপড না হলেও, দিগন্ত টেলিভিশন ছিল অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত। তারা যদি আমাদের যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে, তবে আমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হব।
আমরা দেখলাম, তারা অস্ত্র তাক করে সরাসরি নির্দেশ দিল, ‘এক্ষুনি আপনাদের টেলিভিশন শাটডাউন করুন।’ আমাদের হেড অব নিউজ এবং হেড অব ব্রডকাস্ট জানতে চাইলেন, ‘কিসের ভিত্তিতে আপনারা আমাদের শাটডাউন করতে বলছেন?’ তারা জবাব দিল, ‘বিটিআরসি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের অর্ডার আপনারা পেয়ে যাবেন।’
এরপর অনেকটা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেই তারা আমাদের হেড অব নিউজ এবং হেড অব ব্রডকাস্টকে উপরের সার্ভার রুমে নিয়ে গেল। সেখানে আমাদের ট্রান্সপন্ডার ও অন্যান্য সম্প্রচার যন্ত্রপাতি ছিল। তাদের সাথে বিটিআরসির কয়েকজন টেকনিক্যাল এক্সপার্টও এসেছিলেন। তখন আমাদের নিউজ চলছিল। আপনারা ইউটিউবে খুঁজলে এখনো দিগন্ত টেলিভিশন বন্ধ হওয়ার সেই মুহূর্তের ভিডিওটি পাবেন। তারা অনেকটা জোরপূর্বক সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে সার্ভার রুমে তালা মেরে সিলগালা করে দেয়। চাবিটা নিজেদের কাছে রেখে তারা আমাদের বলল, ‘আমরা এখন এটা শাটডাউন করে দিয়ে গেলাম, সকালের মধ্যে আপনারা আনুষ্ঠানিক অর্ডার পেয়ে যাবেন।’ তারা আরও হুমকি দিল যে, অনেক যন্ত্রপাতি তারা সিজ করে নিয়ে যাবে।
আমরা তাদের কাছ থেকে এর কোনো ব্যাখ্যাই পেলাম না। অনেকটা দস্যুতার মতো, বিনা নোটিশে অস্ত্রের মুখে তারা আমাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দিল। তখন আমাদের প্রায় কয়েকশো মিডিয়াকর্মী অফিসের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। মানসিকভাবে আমরা সবাই খুব বিধ্বস্ত ছিলাম। আমরা চারদিকে এই খবরটি জানিয়ে দিলাম। পরদিন সকালে, যতদূর মনে পড়ে সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টার দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে একটি চিঠি আসে, যেখানে লেখা ছিল— 'দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।'
আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, কেন আমাদের টেলিভিশন বন্ধ করা হলো, তার কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এমনকি, সম্প্রচারিত কোনো সংবাদ বা ফুটেজ আপত্তিকর মনে হলে, অনেক সময় সেগুলো জব্দ করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছুই করা হয়নি। কেবল একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে স্টেশনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়; মূলত তারা আমাদের স্টেশনটিকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিয়েছিল।
৫ই মে’র ঘটনার পর এবং দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার পর আলেম-ওলামাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের সংবাদ আর কোনো গণমাধ্যম প্রচার করেনি। উল্টো তারা প্রচার করেছে যে, হুজুররা এসে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে, গাছ কেটেছে এবং সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক দখলের চেষ্টা করেছে। পুরো রাজনৈতিক বয়ানটাই আলেমদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়। এটি কেবল গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ছিল না; আমার মতে, ৫ই মে থেকেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের মূল যাত্রা শুরু হয়েছিল। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপর দেশে আর কোনো আন্দোলন বা সংগ্রাম দানা বাঁধতে পারেনি। সব টেলিভিশন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং সরকারের সেই বীভৎসতার কারণে যেকোনো সমালোচনামুখর কণ্ঠ পুরোপুরি চাপা পড়ে যায়।
সেই ভয়ানক দিনের কথা ভাবলে এখনো আমরা শিউরে উঠি। দীর্ঘ সময় ধরে আমাকেও অত্যন্ত অস্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হয়েছে, পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। কারণ, সবসময় গ্রেফতারের একটা আতঙ্ক ছিল। জেলা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে নানা স্তরে আমাদের প্রায় ৫০০ কর্মী ছিলেন। সবারই এক মানবেতর জীবন শুরু হয়। চরম মানসিক আঘাতে (শকড হয়ে) আমাদের বেশ কয়েকজন কর্মী মারাও গেছেন। এরপর অনেকেই পেশা বদলাতে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আমাদের টেলিভিশনের ৮-১০ জন রিপোর্টার ও কর্মী বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক যোগ্য কর্মী কেবল দিগন্তে কাজ করার কারণে অন্য কোথাও চাকরি পাননি। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে; এমনকি অনেক আপন বন্ধুও কটাক্ষ করে বলেছে যে, আমরা নাকি খুব বিপ্লবী ভূমিকায় ছিলাম!
অথচ বাস্তবে আমরা কেবল সংবাদ প্রচারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। এত বড় জুলুম, অন্যায় ও নৃশংসতার খবর প্রচারের ক্ষেত্রে আমরা কেবল কিছুটা সাহস দেখিয়েছিলাম। আমরা তো নিজেরা কিছু তৈরি করিনি বা বানিয়ে বলিনি। বাস্তবে যা ঘটেছে, তার হয়তো ২০-২৫ ভাগ আমরা দেখাতে পেরেছি, বাকিটা তো দেখাতেও পারিনি। আমরা সেসময় এমনই এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিলাম। আমাদের পুরো ব্যবস্থাপনা, আর্কাইভ এবং অন্যান্য সব যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘকাল বন্ধ থাকতে থাকতে এসব দামি সরঞ্জাম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পরও সরকার দাবি করল যে, সেখানে কোনো নিহতের ঘটনাই ঘটেনি। সরকারের তৎকালীন সামরিক উপদেষ্টাও একই কথা বললেন। আর তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বললেন, হুজুররা নাকি রং মেখে শুয়ে ছিল! সেখানে যা রক্তপাত দেখা গেছে, তা নাকি রক্ত নয়, বরং কৃত্রিম রং! অন্যদিকে, বাকি গণমাধ্যমগুলো ভয়ে হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক—এভাবেই প্রচার চালাল যে, আলেম-ওলামারা নাকি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
সেসময় আমরা দেখেছি, দেশে এমন এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল যে, যারা সন্তান হারিয়েছিলেন বা যাদের সন্তান নিখোঁজ ছিল, তারা সন্তান খোঁজারও সাহস পাননি। আমি এমন একটি মাদ্রাসার কথা জানি, যেখানকার পাঁচটি ছেলে নিখোঁজ ছিল। কিন্তু মাদ্রাসায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় যে, তাদের কোনো ছাত্র ৫ই মে’র সমাবেশে যায়ইনি। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, তাহলে তথ্যের গরমিলটা কোথায়? পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, পুলিশ গিয়ে তাদের হুমকি দিয়ে এসেছে—যদি কোনোভাবে প্রমাণ হয় যে, তাদের কেউ ঢাকায় ৫ই মে’র ঘটনায় যুক্ত ছিল, তবে মাদ্রাসাই বন্ধ করে দেওয়া হবে। একাধিক মামলার ভয় দেখিয়ে এভাবে এক চরম ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
অথচ আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত বলছে, সেদিন কেবল শাপলা চত্বরেই ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এটি হলো তদন্তে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট নামের তালিকা। এর বাইরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ‘অধিকার’ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সারা দেশে প্রায় ৬০-৭০ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ‘অধিকার’-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা অনেকটা গুম করে দেওয়ার মতোই অবস্থা ছিল।
সার্বিক পরিস্থিতিতে আমরা দেখেছি, আমাদের দেশের আলেম সমাজ সবসময় একধরনের অবহেলার শিকার ছিলেন। তারা কখনো মূলধারার রাজনীতিতে ছিলেন না, এসব নিয়ে তাদের খুব বেশি মাথাঘামানোও ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতা কোথায় যাচ্ছে, দেশ কীভাবে চলছে বা অর্থনীতির কী অবস্থা—এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু প্রথমে শাহবাগের আন্দোলন এবং পরে সেখানে যে ফ্যাসিবাদী ও নৈরাজ্যকর তৎপরতা শুরু হয়, তার একটি অ্যান্টি-থিসিস হিসেবে শাপলা চত্বরে আলেমদের এই অভ্যুত্থান ঘটে। এর মাধ্যমে একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে এমন একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষের জমায়েত ঘটাতে পারে। এই শক্তির উত্থান প্রমাণ করেছে যে, তারা আত্মত্যাগ করতে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে জানে।
এখন প্রশ্ন হলো, এতে আমাদের দেশের লাভ হয়েছে নাকি ক্ষতি? আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এদেশের জন্য একটি বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। শাপলা চত্বরের এই মর্মন্তুদ ঘটনা সারাদেশের আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। হেফাজতে ইসলামের বলয়ের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সেই ঐক্যটি এখনো টিকে আছে। এখন দেশে যদি ইসলামিক শক্তির উত্থান ঘটে থাকে বা তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে, আর কেউ যদি সেটিকে ‘হুমকি’ মনে করে অপপ্রচার চালায়, তবে বলতে হবে যে আওয়ামী লীগই এই প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের কারণেই এই দগদগে ঘা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, শাপলা চত্বরে গণহত্যার এই দায় আওয়ামী লীগকে ঐতিহাসিকভাবেই বহন করতে হবে।
বাংলাদেশের আলেম সমাজ নানা ফেরকা ও চিন্তাধারায় বিভক্ত ছিল। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা তাদের মাঝে যে ঐক্যের বীজ বপন করেছে, তা একটি সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের আবারও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা এবং ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে একটি ব্যাপকভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এই ঐক্য একটি স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে।
একজন গণমাধ্যম সংগঠক হিসেবে আমি বলতে চাই, সেদিন কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই, বিনা তদন্তে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনকে যেভাবে অন্যায়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির আর আছে কি না, আমার জানা নেই। আমি মনে করি, এর জন্য সরকারের উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কারণ এই সিদ্ধান্তের ফলে টেলিভিশন দুটির কর্মী, কলাকুশলী, অংশীদার এবং মালিকপক্ষ আর্থিকভাবে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাষ্ট্র একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আমরা যখন এসব বিষয়ে সোচ্চার হবো, ইতিহাস হয়তো একদিন এই বাস্তবতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসবে। আমি মনে করি, ৫ই মে’র এই আত্মত্যাগ ও রক্তদান ইতিহাস সবসময় মনে রাখবে এবং দিন যত গড়াবে, আলেমদের এই বৃহত্তর ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। অসহায় ছাত্রদের যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কেউ আর এমন ভুল না করে বা এমন নৃশংসতা দেখাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, শাহবাগে দিনের পর দিন রাস্তা অবরোধ করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু তাদের কেউ তুলে দেয়নি। উল্টো সরকার তাদের সহায়তা করেছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে বিরিয়ানি সরবরাহ করেছে, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা প্রচুর অর্থায়ন করেছে; ফলে সেটি একধরনের চাঁদাবাজির উৎসবে পরিণত হয়েছিল। সেখানে এমন এক ভীতিকর ও ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যে, শাহবাগে না গেলে যেন আপনার নাগরিকত্বই থাকবে না, আপনি যেন রাজাকার-আলবদর হয়ে যাবেন! তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের কোনো তৎপরতাই ছিল না। অথচ মাত্র এক দিনের জন্য, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আলেম-ওলামারা হেফাজতের নামে যেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের উচ্ছেদ করতে আমার মনে হয় কয়েক লাখ বুলেট এবং অন্তত ২০-৩০ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল।
আমি মনে করি, ইতিহাসে এর বিচার অবশ্যম্ভাবী। এর পেছনে যারা কলকাঠি নেড়েছেন এবং তৎকালীন সরকারে যারা ছিলেন—যাদের নাম ইতোমধ্যে তদন্তে উঠে এসেছে—একদিন না একদিন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ ধরনের গণহত্যা ও অপকর্মের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নস্যাৎ করতে না পারে। ইনশাআল্লাহ, আমরা এ লক্ষ্যে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।
অনেকে বলেন, দিগন্ত টেলিভিশন যথেষ্ট কৌশলী ছিল না বলেই তাদের ওপর খড়গ নেমে এসেছে। তবে আমি তা মনে করি না। সেদিন দিগন্ত টেলিভিশন যা দেখিয়েছে, অন্যান্য সব টেলিভিশনও তা-ই দেখিয়েছে। আমরা যখন লাইভ সম্প্রচার করছিলাম, তখন অনেকেই আমাদের লাইভ স্ট্রিম নিয়ে তাদের চ্যানেলে প্রচার করেছে। রাতে যখন আমাদের সম্প্রচার বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো, তখনও কিন্তু সময় টেলিভিশন শেষ পর্যন্ত লাইভে ছিল। অথচ কেউ বলছে না যে, সময় টেলিভিশন লাইভে ছিল বলে তারা অপরাধ করেছে। আসলে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা হলো ভিন্ন কিছু।
আমার মনে হয়েছে, ৫ মে’র পর আলেম-ওলামাদের ওপর চলা নৃশংসতার খবর যেন আর সামনে আসতে না পারে, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কারা মারা গেছেন, কে কোথায় হারিয়ে গেছেন, কাকে পাওয়া যাচ্ছে না, আর কারাই বা সেদিন সমাবেশে এসেছিলেন—এসব প্রকৃত ঘটনার পরবর্তী সংবাদ (ফলোআপ কাভারেজ) যেন কেউ প্রচার করতে না পারে, সে কারণেই দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মূলত অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে একটি আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপর ওই ঘটনার আর কোনো ফলোআপ রিপোর্ট হয়নি। তখন সব টেলিভিশন কেবল একতরফা কথা বলছিল। তাদের বয়ান ছিল এমন—আলেম-ওলামারা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছেন, গাছ কেটেছেন; এমনকি গাছের ক্ষতি নিয়েও রিপোর্ট হয়েছে! কী ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, কারা এতে অর্থায়ন করেছে, কারা এসেছিল এবং কী করতে চেয়েছিল—সবকিছু নিয়েই কেবল একমুখী রিপোর্ট প্রচার করা হয়েছে।
আমি মনে করি না, দিগন্ত টেলিভিশন এমন কোনো আক্রমণাত্মক রিপোর্ট করেছিল যার কারণে তাদের বন্ধ করতে হবে। বরং ঘটনার পর পুলিশের তাণ্ডবের বিষয়টি যেন পুরোপুরি আড়াল (ব্ল্যাকআউট) করে ফেলা যায়, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা বলি। আমরা যখন চ্যানেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করি, তখন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের মালিক সালমান এফ রহমান আমাদের সাথে যুক্ত হন। টেলিভিশন মালিকদের একটি অ্যাসোসিয়েশন আছে। সেই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেই স্বাভাবিকভাবে বলা হলো, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভিকে তো অন্যায়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, তাই সরকারের কাছে এটি পুনরায় চালুর দাবি জানাতে হবে। আমাদের সাংবাদিকদের একটি দল তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে দেখা করল।
অন্যদিকে, দিগন্ত টেলিভিশনের একজন ট্রেইনার ছিলেন হায়দার রিজভী। তাঁর ভাই গওহর রিজভী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। হায়দার রিজভী তাঁর ভাইকে বললেন, "তুমি তো প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আমি দিগন্তের এই কর্মীদের চিনি। দিগন্তের তো কোনো অপরাধ নেই, তারা তো বাস্তবে যা ঘটেছে তা-ই প্রচার করেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা তো ঠিকমতো লাইভও করতে পারেনি।" এরপর একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হলো, যেখানে গওহর রিজভী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সালমান এফ রহমান ছিলেন।
তাঁরা তিনজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বললেন, "দিগন্ত টেলিভিশনকে তো সাময়িকভাবে স্থগিত (টেম্পোরারি সাসপেন্ড) করা হয়েছে, এখন এর একটা ফয়সালা হওয়া উচিত। কী করা যায়?" আমাদের একটি লিখিত আবেদনও সেখানে দেওয়া হয়েছিল। তখন শেখ হাসিনা গওহর রিজভীকে প্রশ্ন করলেন, "আপনি এই বিষয়ের মধ্যে কেন জড়ালেন?" গওহর রিজভী জানালেন যে, তাঁর ভাই হায়দার রিজভী সেখানে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করতেন, সেই সূত্রেই তিনি কথা বলছেন। সালমান এফ রহমানও তাঁর অবস্থান থেকে কথা বললেন।
চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনা তখন হাসানুল হক ইনুকে বললেন, ‘টেলিভিশন তো বন্ধ করেছেন আপনি! আপনার কৌশলে, আপনার চাপেই তো এটা বন্ধ করা হয়েছে। এখন আপনিই আবার এটা খোলার জন্য এসেছেন কেন?’ এরপর তিনি আরও বললেন, ‘আমি তদন্ত করে দেখব, এখানে আপনার কোনো আর্থিক স্বার্থ জড়িত আছে কি না।’ এই কথা বলে শেখ হাসিনা ফাইলটি রেখে দিলেন।
এই ভেতরের খবরগুলো অনেকেই জানেন না। তবে আমি অনেকটাই নিশ্চিত যে, চ্যানেলটি বন্ধ করার পেছনে সরকারের একটি বড় ভয় কাজ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, ৫ই মে’র ঘটনার পর অন্য কোনো চ্যানেল হয়তো ফলোআপ রিপোর্ট করার সাহস করবে না, কিন্তু দিগন্ত টেলিভিশন ঠিকই তা করবে। আর ঠিক এ কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো যে, আমরা নাকি অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করেছি, লাইভ সম্প্রচার করেছি! কিন্তু ভেবে দেখুন, টেলিভিশনের কাজই তো লাইভ করা, সংবাদ প্রচার করা। আমরা যদি সত্যিই অতিরঞ্জিত কিছু করে থাকতাম বা কোনো ধরনের উসকানি দিতাম, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? আমাদের কোনো শাস্তি দেওয়া হলো না কেন? আমাদের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হলো না? আমাদের কোন রিপোর্টের কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য কেন আমাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হলো না? আওয়ামী লীগ সরকার তো ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল, তবুও তারা এসবের কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।
সুতরাং, আমি মনে করি, মিডিয়া জগতে কেবল একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতেই তারা এই কাজটি করেছিল। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে, এটি কেবল একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ এবং কিছুদিন পর তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কিন্তু তারা আর সেই কথা রাখেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও লেখা নেই যে, কোনো টেলিভিশনের 'সাময়িক স্থগিতাদেশ' এক যুগের বেশি সময় ধরে চলতে পারে!
আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই, আমি বর্তমান টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছিলাম যেন তারা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা করেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তারা সেটি করেননি। আজ স্রেফ আর্থিক সংকটের কারণে টেলিভিশনটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সরকারের উচিত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে এই দুটি টেলিভিশন চ্যানেলকে পূর্ণোদ্যমে চালুর ব্যবস্থা করে দেওয়া।
পরিশেষে বলব, কেউ যদি বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের ইতিহাস লিখতে চান, তবে ৫ই মে’র ইতিহাস এবং এই দুটি টেলিভিশনকে অন্যায়ভাবে বন্ধ করার ইতিহাস অবশ্যই তুলে ধরতে হবে। এর পাশাপাশি, ‘আমার দেশ’ পত্রিকা এবং পরবর্তীতে একুশে টেলিভিশনসহ আরও যেসব গণমাধ্যম অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল—এই সব অপকর্মের অবশ্যই সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।
মজিবুর রহমান মঞ্জু: আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান, দিগন্ত টেলিভিশনের সাবেক উপ-নির্বাহী পরিচালক।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ৫ মে ২০২৩ দিগন্ত টেলিভিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। টেলিভিশনটি ওই দিন ঘটনার লাইভ সম্প্রচার করছিল। সেই রাতেই দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে রাতে তিনি অফিসেই ছিলেন। কী ঘটেছিল সেদিন, টেলিভিশন দুটি কীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল, আজও কেন চালু হচ্ছে না—এসব বিষয়ে ভিডিও সাক্ষাৎকার কথা বলেছেন স্ট্রিমের সঙ্গে। পুরো সাক্ষাৎকার ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। তবে ২০১৩ সালের ৫ই মে-এর ঐতিহাসিক ঘটনার সময় আমি একজন মিডিয়াকর্মী হিসেবে কাজ করছিলাম। ওইদিন মতিঝিল শাপলা চত্বরে সারা দেশের আলেম-ওলামাদের সংগঠন 'হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ'-এর মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে একটি নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। সে সময় আমি 'দিগন্ত টেলিভিশন'-এর উপ-নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলাম।
৫ই মে দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ৬ই মে গভীর রাতে, প্রায় আড়াইটার দিকে হঠাৎ করে আমাদের টেলিভিশনটি শাটডাউন করে দেওয়া হয়। অনেকটা অস্ত্রের মুখে কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়াই সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আমি ৫ই মে-এর পুরো ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। এই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার যে ঘটনা ঘটে, তারও আমি চাক্ষুষ সাক্ষী। পরবর্তীতে এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে মামলা হয়েছে, আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মামলার সাক্ষ্য প্রদান করেছি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ই মে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা সবাই জানি, এর আগে শাহবাগে একটি আন্দোলন হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতের তৎকালীন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার দিন জামায়াতের পক্ষ থেকে মতিঝিল থেকে পল্টন পর্যন্ত প্রায় দশ-পনেরো হাজার লোকের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এই রায় প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ শাস্তির এবং আইন সংশোধনের দাবিতে পরের দিন থেকে শাহবাগ চত্বরে 'গণজাগরণ মঞ্চ'-এর ব্যানারে সমাবেশ শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের এই সমাবেশটি মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হলেও, একপর্যায়ে তা আর শুধু এই দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এর ডালপালা অন্যান্য দিকেও বিস্তৃত হতে থাকে। প্রথমদিকে প্রচুর মানুষের সমাগম এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি মুখ্য থাকলেও, পরে এই সমাবেশটি একটি স্থায়ী রূপ নেয়। এর ফলে পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়' (পিজি হাসপাতাল)-এর চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে এবং বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই মঞ্চের কয়েকজন সংগঠকের ফেসবুক পোস্ট এবং কার্যক্রমে ধর্ম অবমাননামূলক নানা বিষয় উঠে আসতে শুরু করে।
পাশাপাশি তাদের মধ্যে একধরনের ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রকাশও দেখা যায়। তারা তালিকা প্রকাশ করে নির্দেশ দিতে থাকে কী কী বন্ধ করতে হবে বা কোথায় কোথায় হামলা করতে হবে। এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন জায়গায় মোমবাতি প্রজ্বলন ও পতাকা উত্তোলনের মতো নানা কর্মসূচি শুরু হয়। এমতাবস্থায় বেশ কয়েকজন ব্লগারের ধর্ম অবমাননামূলক লেখালেখি বিভিন্ন পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে, আলেম-ওলামাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে 'হেফাজতে ইসলাম' নামের প্ল্যাটফর্মটি শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা আন্দোলন গড়ে তোলে।
তাদের মূলত ১৩ দফা দাবি ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং ব্লাসফেমি আইন কার্যকর করা। বিশেষ করে ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে শাহবাগের পাল্টা আন্দোলন হিসেবে সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা এতে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে থাকে। এই প্রতিবাদকে জনসমক্ষে তুলে ধরার ক্ষেত্রে 'দৈনিক আমার দেশ' পত্রিকার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এর ফলে আমরা দেখতে পাই, হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে আলেম-ওলামারা বিশাল সব সমাবেশ করেন। এসব সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এবং তারা সরকারের প্রতি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও আল্টিমেটাম পেশ করেন।
এদিকে শাহবাগের সমাবেশটিও ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে, কারণ সাধারণ মানুষ এসব কর্মকাণ্ডে কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া আদালতে বিচার চলাকালীন আইন সংশোধন করার বিষয়টিও অনেক আইনজ্ঞ ইতিবাচকভাবে নেননি। শাহবাগের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৬ই এপ্রিল শাপলা চত্বরে একটি মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
দিগন্ত টেলিভিশনের পক্ষ থেকে আমরা ওই সমাবেশটি সরাসরি সম্প্রচার করেছিলাম। সে সময় এর চেয়ে বড় সমাবেশ আর দেখা যায়নি। বাস, ট্রেন ও নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ আলেম-ওলামা পায়ে হেঁটে ঢাকায় এসে ৬ই এপ্রিলের ওই সমাবেশে যোগ দেন। এই বিপুল জনসমাগম মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে এবং একটি অভূতপূর্ব ঐক্যের সৃষ্টি করে।
বলা যায়, তখন দেশে দুটি মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। একদিকে শাহবাগকে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একধরনের আল্ট্রা-সেক্যুলার (উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ) মেরুকরণ, অন্যদিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলো হেফাজতের অধীনে একটি বড় জোটবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। তারা তাদের ১৩ দফা দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। ওই একই সময়ে ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও আন্দোলন চলছিল।
৫ই মে আমরা দেখলাম, ঢাকার ৬টি প্রবেশপথে হেফাজতের অভাবনীয় জনসমাগম। কিন্তু একপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ওপর পয়েন্টে পয়েন্টে হামলা ও আক্রমণ চালানো শুরু হয়। আমার এখনো মনে পড়ে, ওইদিন রাতে আমাকে টেলিভিশনের কার্যালয়েই অবস্থান করতে হয়েছিল। কারণ, সারা দেশ থেকে সংঘর্ষ ও গণ্ডগোলের খবর এবং ফুটেজ আসছিল। ঢাকা শহরের পরিস্থিতিও ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, ফলে বাইরে যাতায়াত করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সারা দেশ থেকে সংঘর্ষ, হামলা এবং কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও আমাদের কাছে আসছিল। সকাল থেকেই ঢাকার ৬টি স্পটে আমাদের ক্যামেরাম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও লাইভ বা 'অ্যাজ লাইভ' সংবাদ প্রচার করছিল। সংঘর্ষ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করল, তখন হেফাজতে ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা ৬টি স্পট থেকে মার্চ করে শাপলা চত্বরে এসে জড়ো হবে। কথা ছিল, হেফাজতের তৎকালীন আমির মাওলানা আহমদ শফী শাপলা চত্বরে এসে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন এবং ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে স্থায়ী অবস্থান নেবেন।
আমরা দেখলাম, বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ মতিঝিল শাপলা চত্বরের দিকে ছুটে আসছেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালানো হলো। সারাদিন জুড়েই ব্যাপক সংঘর্ষ চলল। বিভিন্ন স্থানে আলেম-ওলামাদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ অত্যন্ত নৃশংসভাবে হামলা ও আক্রমণ চালাল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশ দিয়ে যত মিছিল আসার চেষ্টা করেছে, সবগুলোর ওপর তারা আক্রমণ করে। এর মধ্যেই ৬-৭ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ মানুষ শাপলা চত্বরে এসে অবস্থান নেন এবং বিকেল থেকে তাদের সমাবেশ শুরু হয়। যেহেতু এটি একটি অনেক বড় ঘটনা ছিল, তাই সব মিডিয়াই সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের চেষ্টা করছিল। দিগন্ত টেলিভিশনের কার্যালয় মতিঝিলের খুব কাছে হওয়ায়, সরাসরি সম্প্রচারের জন্য আমরা সেখানে একটি লাইভ ইউনিট পাঠাই।
কিন্তু মানুষের প্রচণ্ড চাপ, পুলিশের ব্যাপক টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং চতুর্দিক থেকে আসা মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজের মধ্যে আমরা কেবল সন্ধ্যা ৭টার সংবাদ পর্যন্তই লাইভ সম্প্রচার করতে পেরেছিলাম। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ আমাদের লাইভ সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর নিয়ে যায়। ফলে আমরা আর সরাসরি সম্প্রচার করতে পারিনি; বিকল্প হিসেবে মোটরসাইকেলে করে ক্যাসেট পাঠিয়ে 'অ্যাজ লাইভ' সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যমে খবর কাভার করার চেষ্টা করছিলাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে লালবাগ মাদ্রাসা থেকে মাওলানা আহমদ শফীর সমাবেশে আসার কথা থাকলেও, পুলিশ তাকে সেখানেই আটকে দেয়। এদিকে পুলিশের অ্যাকশনও তীব্র হতে থাকে। রাত আনুমানিক ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে আমরা খবর পাই যে, সমাবেশ ভণ্ডুল করে সেখানে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর জন্য চতুর্দিক থেকে পুলিশ লাইনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ জড়ো করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে গুলশান থেকে বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রেস কনফারেন্স করলেন। আলেম-ওলামাদের ওপর এই নৃশংস হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সবাইকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসার আহ্বান জানালেন।
এমতাবস্থায় সারা দেশে তখন একধরনের টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাত সম্ভবত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে (সময়টা আমার স্মৃতিতে কিছুটা অস্পষ্ট হতে পারে) আমরা খবর পেতে লাগলাম যে, পুলিশ চারপাশ থেকে আলেম-ওলামাদের ঘেরাও করে ফেলেছে। সম্ভবত 'অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট' অথবা 'ফ্রি শাপলা' নামে এই উচ্ছেদ অভিযানের নামকরণ করা হয়েছিল। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি নিউজ কাভার করার জন্য। সময় টিভি-সহ আরও কয়েকটি টেলিভিশন তখন সরাসরি সম্প্রচার করছিল। এরপর আমরা দেখলাম, বিশেষ করে নটরডেম কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে শত শত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি অর্থাৎ যৌথ বাহিনী একত্রে অপারেশন ও অ্যাটাক শুরু করেছে।
বলা যায়, আমার জীবনে এর আগে কখনো এত মুহুর্মুহু গোলাগুলি এবং বিকট শব্দ শুনিনি। অবিরাম গুলির আওয়াজ এবং সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল, ওখানে রীতিমতো কোনো মহাযুদ্ধ চলছে, চারপাশ যেন একেবারে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের রিপোর্টাররা নিরাপদ দূরত্বে থেকে যেসব ফুটেজ সংগ্রহ করে আনছিলেন, আমরা সেগুলোই সম্প্রচার করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, রাত আনুমানিক ১০টা বা ১১টার দিকে আমাদের কাছে নির্দেশ এল যে, এই ধরনের ফুটেজ বা সংবাদ আর প্রচার করা যাবে না।
যাই হোক, কড়া সেন্সরশিপের মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো সংবাদ প্রচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরপর নতুন ফুটেজ আসছিল এবং আমরা তা দেখাচ্ছিলাম, যদিও তখন আমরা লাইভে ছিলাম না। আমার মনে হয়, তখন মাত্র একটি বা দুটি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করছিল। সময় টেলিভিশনের লাইভটি ছিল পুলিশের সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ পুলিশ যেভাবে মুভ করছিল, তারাও সেভাবেই মুভ করছিল। এছাড়া বাকি সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ছিল, দূর থেকে আড়ালে-আবডালে যতটুকু সংবাদ সংগ্রহ করা যায়, ততটুকুই করছিল।
আগেই বলেছি, মঞ্চের সামনে আমাদের একটি ইউনিট ছিল, তবে আমরা লাইভ ব্রডকাস্ট করতে পারিনি। আসলে অনেকে মনে করেছিলেন আমরা সরাসরি সম্প্রচার করছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার পর থেকেই আমরা লাইভ কানেকশন হারিয়ে ফেলি। এরপর থেকে আমরা 'অ্যাজ লাইভ' সম্প্রচার করেছি। অর্থাৎ, ফুটেজগুলো নিয়ে এসে অনেক ক্ষেত্রে কোনো এডিটিং ছাড়াই প্রচার করেছি। স্ক্রিনে 'অ্যাজ লাইভ' লেখা থাকলেও, সাধারণ দর্শক টেকনিক্যাল টার্ম না বোঝার কারণে হয়তো ভেবেছিলেন ওটাই সরাসরি সম্প্রচার।
রাত ১১টা-১২টার দিকে আমাদের কাছে খবর এল যে, মূল মঞ্চের আশেপাশে এবং কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংকের সামনে বেশ কিছু লাশ পড়ে আছে। আমাদের টিম সেখানে গিয়ে প্রায় ১০-১২টি মৃতদেহ দেখতে পায়। আমরা সেগুলোর দৃশ্য ধারণ করে এনে সংবাদে প্রচার করি। এর মধ্যেই আরও কিছু লোমহর্ষক খবর আসতে শুরু করল। একটি খবর এল যে, কিছু মৃতদেহ গাড়িতে তুলে জুরাইন গোরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা সেখানেও আমাদের ক্যামেরা ইউনিট পাঠাই। সেখানে এ ধরনের কিছু আলামত পাওয়া গেলেও, পুলিশের কড়া বাধা এবং চারপাশের চরম গোপনীয়তার কারণে আমরা খুব একটা তথ্য বা ফুটেজ সংগ্রহ করতে পারিনি।
বলা যায়, প্রায় পুরো রাত জুড়েই পুলিশের এই অ্যাকশন চলেছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলেম-ওলামাদের ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা বা তাড়িয়ে দেওয়া। টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে এই অপারেশন চলে। চারদিকে ধোঁয়া ও টিয়ারশেলের কারণে আমাদের সংবাদকর্মীরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। টিয়ারশেলের ঝাঁঝে আমরা অফিসেও ঠিকমতো বসতে পারছিলাম না, কাগজের আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিলাম। আমাদের দুই শিফটের কর্মী অফিসে আটকা পড়েছিলেন, কেউ আর বের হতে পারেননি।
রাত আনুমানিক দেড়টা বা দুইটার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, বলতে গেলে একদম থমথমে হয়ে আসে। বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসলেও আমাদের আর বাইরে মুভ করার কোনো সুযোগ ছিল না। তখন হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে একটি ফোন আসে। জানানো হয় যে, তিনি আহত অবস্থায় এক জায়গায় আটকা পড়ে আছেন। আমরা চিন্তা করলাম, কীভাবে তাঁকে উদ্ধার করা যায় বা অন্তত নিউজটা কাভার করা যায়। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করার পর দেখা গেল, পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে।
এরকম এক শ্বাসরুদ্ধকর ও ক্লান্তিকর পরিস্থিতিতে রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে আমি আমার অফিসে বসা। হঠাৎ ইসলামিক টেলিভিশন থেকে আমার কাছে একটি ফোন এল। আমি আগে সেখানে কাজ করায় সেখানকার সিইও আমাকে ফোন করে বললেন, ‘ভাই, পুলিশ আমাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করে স্টেশনে অ্যাটাক করেছে এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে।" আমি অবাক হয়ে বললাম—তাই নাকি? তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ, যন্ত্রপাতি ভেঙেচুরে তারা আমাদের চ্যানেল শাটডাউন করে দিচ্ছে।’
এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের নিউজরুমে ফোন করে ইসলামিক টিভিতে হামলার বিষয়টি ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করতে বললাম। একই সাথে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় এল। আমি সিকিউরিটি গার্ডদের নির্দেশ দিলাম মেইন গেটসহ সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে। এরপর জরুরি আলোচনার জন্য সব বিভাগের প্রধানদের উপরের ফ্লোরে ডাকলাম।
মিটিং শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই নিচে শাটারে প্রচণ্ড শব্দে বাড়ি দেওয়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম কেউ হয়তো আমাদের অফিসেও হামলা করতে এসেছে। আমরা সবাইকে অ্যালার্ট করে ভেতরের দরজাগুলো লক করে দিলাম। পরে সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখলাম, প্রায় ১০০-১৫০ জন র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্য আমাদের অফিস পুরোপুরি ঘেরাও করে ফেলেছে। তারা যেকোনো মুহূর্তে গেট ভেঙে ফেলতে পারে—এমন পরিস্থিতি বুঝে আমরা বাধ্য হয়ে গেট খুলে দিই।
ভেতরে ঢুকেই তারা প্রথমে সব সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। আমাদের অফিস ছিল ভবনের ৮, ৯ ও ১০ তলায়। তারা প্রথমে ৮ ও ৯ তলার নিউজরুমে ঢোকে। পুরো দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মোল্লা নজরুল নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওই সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ এবং আইজিপি ছিলেন সম্ভবত শহীদুল হক। আমরা খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। ইসলামিক টিভি খুব বেশি ইকুইপড না হলেও, দিগন্ত টেলিভিশন ছিল অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত। তারা যদি আমাদের যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে, তবে আমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হব।
আমরা দেখলাম, তারা অস্ত্র তাক করে সরাসরি নির্দেশ দিল, ‘এক্ষুনি আপনাদের টেলিভিশন শাটডাউন করুন।’ আমাদের হেড অব নিউজ এবং হেড অব ব্রডকাস্ট জানতে চাইলেন, ‘কিসের ভিত্তিতে আপনারা আমাদের শাটডাউন করতে বলছেন?’ তারা জবাব দিল, ‘বিটিআরসি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের অর্ডার আপনারা পেয়ে যাবেন।’
এরপর অনেকটা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেই তারা আমাদের হেড অব নিউজ এবং হেড অব ব্রডকাস্টকে উপরের সার্ভার রুমে নিয়ে গেল। সেখানে আমাদের ট্রান্সপন্ডার ও অন্যান্য সম্প্রচার যন্ত্রপাতি ছিল। তাদের সাথে বিটিআরসির কয়েকজন টেকনিক্যাল এক্সপার্টও এসেছিলেন। তখন আমাদের নিউজ চলছিল। আপনারা ইউটিউবে খুঁজলে এখনো দিগন্ত টেলিভিশন বন্ধ হওয়ার সেই মুহূর্তের ভিডিওটি পাবেন। তারা অনেকটা জোরপূর্বক সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে সার্ভার রুমে তালা মেরে সিলগালা করে দেয়। চাবিটা নিজেদের কাছে রেখে তারা আমাদের বলল, ‘আমরা এখন এটা শাটডাউন করে দিয়ে গেলাম, সকালের মধ্যে আপনারা আনুষ্ঠানিক অর্ডার পেয়ে যাবেন।’ তারা আরও হুমকি দিল যে, অনেক যন্ত্রপাতি তারা সিজ করে নিয়ে যাবে।
আমরা তাদের কাছ থেকে এর কোনো ব্যাখ্যাই পেলাম না। অনেকটা দস্যুতার মতো, বিনা নোটিশে অস্ত্রের মুখে তারা আমাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দিল। তখন আমাদের প্রায় কয়েকশো মিডিয়াকর্মী অফিসের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। মানসিকভাবে আমরা সবাই খুব বিধ্বস্ত ছিলাম। আমরা চারদিকে এই খবরটি জানিয়ে দিলাম। পরদিন সকালে, যতদূর মনে পড়ে সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টার দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে একটি চিঠি আসে, যেখানে লেখা ছিল— 'দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।'
আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, কেন আমাদের টেলিভিশন বন্ধ করা হলো, তার কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এমনকি, সম্প্রচারিত কোনো সংবাদ বা ফুটেজ আপত্তিকর মনে হলে, অনেক সময় সেগুলো জব্দ করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছুই করা হয়নি। কেবল একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে স্টেশনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়; মূলত তারা আমাদের স্টেশনটিকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিয়েছিল।
৫ই মে’র ঘটনার পর এবং দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার পর আলেম-ওলামাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের সংবাদ আর কোনো গণমাধ্যম প্রচার করেনি। উল্টো তারা প্রচার করেছে যে, হুজুররা এসে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে, গাছ কেটেছে এবং সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক দখলের চেষ্টা করেছে। পুরো রাজনৈতিক বয়ানটাই আলেমদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়। এটি কেবল গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ছিল না; আমার মতে, ৫ই মে থেকেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের মূল যাত্রা শুরু হয়েছিল। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপর দেশে আর কোনো আন্দোলন বা সংগ্রাম দানা বাঁধতে পারেনি। সব টেলিভিশন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং সরকারের সেই বীভৎসতার কারণে যেকোনো সমালোচনামুখর কণ্ঠ পুরোপুরি চাপা পড়ে যায়।
সেই ভয়ানক দিনের কথা ভাবলে এখনো আমরা শিউরে উঠি। দীর্ঘ সময় ধরে আমাকেও অত্যন্ত অস্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হয়েছে, পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। কারণ, সবসময় গ্রেফতারের একটা আতঙ্ক ছিল। জেলা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে নানা স্তরে আমাদের প্রায় ৫০০ কর্মী ছিলেন। সবারই এক মানবেতর জীবন শুরু হয়। চরম মানসিক আঘাতে (শকড হয়ে) আমাদের বেশ কয়েকজন কর্মী মারাও গেছেন। এরপর অনেকেই পেশা বদলাতে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আমাদের টেলিভিশনের ৮-১০ জন রিপোর্টার ও কর্মী বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক যোগ্য কর্মী কেবল দিগন্তে কাজ করার কারণে অন্য কোথাও চাকরি পাননি। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে; এমনকি অনেক আপন বন্ধুও কটাক্ষ করে বলেছে যে, আমরা নাকি খুব বিপ্লবী ভূমিকায় ছিলাম!
অথচ বাস্তবে আমরা কেবল সংবাদ প্রচারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। এত বড় জুলুম, অন্যায় ও নৃশংসতার খবর প্রচারের ক্ষেত্রে আমরা কেবল কিছুটা সাহস দেখিয়েছিলাম। আমরা তো নিজেরা কিছু তৈরি করিনি বা বানিয়ে বলিনি। বাস্তবে যা ঘটেছে, তার হয়তো ২০-২৫ ভাগ আমরা দেখাতে পেরেছি, বাকিটা তো দেখাতেও পারিনি। আমরা সেসময় এমনই এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিলাম। আমাদের পুরো ব্যবস্থাপনা, আর্কাইভ এবং অন্যান্য সব যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘকাল বন্ধ থাকতে থাকতে এসব দামি সরঞ্জাম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পরও সরকার দাবি করল যে, সেখানে কোনো নিহতের ঘটনাই ঘটেনি। সরকারের তৎকালীন সামরিক উপদেষ্টাও একই কথা বললেন। আর তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বললেন, হুজুররা নাকি রং মেখে শুয়ে ছিল! সেখানে যা রক্তপাত দেখা গেছে, তা নাকি রক্ত নয়, বরং কৃত্রিম রং! অন্যদিকে, বাকি গণমাধ্যমগুলো ভয়ে হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক—এভাবেই প্রচার চালাল যে, আলেম-ওলামারা নাকি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
সেসময় আমরা দেখেছি, দেশে এমন এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল যে, যারা সন্তান হারিয়েছিলেন বা যাদের সন্তান নিখোঁজ ছিল, তারা সন্তান খোঁজারও সাহস পাননি। আমি এমন একটি মাদ্রাসার কথা জানি, যেখানকার পাঁচটি ছেলে নিখোঁজ ছিল। কিন্তু মাদ্রাসায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় যে, তাদের কোনো ছাত্র ৫ই মে’র সমাবেশে যায়ইনি। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, তাহলে তথ্যের গরমিলটা কোথায়? পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, পুলিশ গিয়ে তাদের হুমকি দিয়ে এসেছে—যদি কোনোভাবে প্রমাণ হয় যে, তাদের কেউ ঢাকায় ৫ই মে’র ঘটনায় যুক্ত ছিল, তবে মাদ্রাসাই বন্ধ করে দেওয়া হবে। একাধিক মামলার ভয় দেখিয়ে এভাবে এক চরম ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
অথচ আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত বলছে, সেদিন কেবল শাপলা চত্বরেই ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এটি হলো তদন্তে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট নামের তালিকা। এর বাইরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ‘অধিকার’ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সারা দেশে প্রায় ৬০-৭০ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ‘অধিকার’-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা অনেকটা গুম করে দেওয়ার মতোই অবস্থা ছিল।
সার্বিক পরিস্থিতিতে আমরা দেখেছি, আমাদের দেশের আলেম সমাজ সবসময় একধরনের অবহেলার শিকার ছিলেন। তারা কখনো মূলধারার রাজনীতিতে ছিলেন না, এসব নিয়ে তাদের খুব বেশি মাথাঘামানোও ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতা কোথায় যাচ্ছে, দেশ কীভাবে চলছে বা অর্থনীতির কী অবস্থা—এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু প্রথমে শাহবাগের আন্দোলন এবং পরে সেখানে যে ফ্যাসিবাদী ও নৈরাজ্যকর তৎপরতা শুরু হয়, তার একটি অ্যান্টি-থিসিস হিসেবে শাপলা চত্বরে আলেমদের এই অভ্যুত্থান ঘটে। এর মাধ্যমে একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে এমন একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষের জমায়েত ঘটাতে পারে। এই শক্তির উত্থান প্রমাণ করেছে যে, তারা আত্মত্যাগ করতে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে জানে।
এখন প্রশ্ন হলো, এতে আমাদের দেশের লাভ হয়েছে নাকি ক্ষতি? আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এদেশের জন্য একটি বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। শাপলা চত্বরের এই মর্মন্তুদ ঘটনা সারাদেশের আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। হেফাজতে ইসলামের বলয়ের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সেই ঐক্যটি এখনো টিকে আছে। এখন দেশে যদি ইসলামিক শক্তির উত্থান ঘটে থাকে বা তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে, আর কেউ যদি সেটিকে ‘হুমকি’ মনে করে অপপ্রচার চালায়, তবে বলতে হবে যে আওয়ামী লীগই এই প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের কারণেই এই দগদগে ঘা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, শাপলা চত্বরে গণহত্যার এই দায় আওয়ামী লীগকে ঐতিহাসিকভাবেই বহন করতে হবে।
বাংলাদেশের আলেম সমাজ নানা ফেরকা ও চিন্তাধারায় বিভক্ত ছিল। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা তাদের মাঝে যে ঐক্যের বীজ বপন করেছে, তা একটি সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের আবারও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা এবং ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে একটি ব্যাপকভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এই ঐক্য একটি স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে।
একজন গণমাধ্যম সংগঠক হিসেবে আমি বলতে চাই, সেদিন কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই, বিনা তদন্তে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনকে যেভাবে অন্যায়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির আর আছে কি না, আমার জানা নেই। আমি মনে করি, এর জন্য সরকারের উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কারণ এই সিদ্ধান্তের ফলে টেলিভিশন দুটির কর্মী, কলাকুশলী, অংশীদার এবং মালিকপক্ষ আর্থিকভাবে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাষ্ট্র একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আমরা যখন এসব বিষয়ে সোচ্চার হবো, ইতিহাস হয়তো একদিন এই বাস্তবতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসবে। আমি মনে করি, ৫ই মে’র এই আত্মত্যাগ ও রক্তদান ইতিহাস সবসময় মনে রাখবে এবং দিন যত গড়াবে, আলেমদের এই বৃহত্তর ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। অসহায় ছাত্রদের যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কেউ আর এমন ভুল না করে বা এমন নৃশংসতা দেখাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, শাহবাগে দিনের পর দিন রাস্তা অবরোধ করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু তাদের কেউ তুলে দেয়নি। উল্টো সরকার তাদের সহায়তা করেছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে বিরিয়ানি সরবরাহ করেছে, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা প্রচুর অর্থায়ন করেছে; ফলে সেটি একধরনের চাঁদাবাজির উৎসবে পরিণত হয়েছিল। সেখানে এমন এক ভীতিকর ও ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যে, শাহবাগে না গেলে যেন আপনার নাগরিকত্বই থাকবে না, আপনি যেন রাজাকার-আলবদর হয়ে যাবেন! তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের কোনো তৎপরতাই ছিল না। অথচ মাত্র এক দিনের জন্য, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আলেম-ওলামারা হেফাজতের নামে যেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের উচ্ছেদ করতে আমার মনে হয় কয়েক লাখ বুলেট এবং অন্তত ২০-৩০ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল।
আমি মনে করি, ইতিহাসে এর বিচার অবশ্যম্ভাবী। এর পেছনে যারা কলকাঠি নেড়েছেন এবং তৎকালীন সরকারে যারা ছিলেন—যাদের নাম ইতোমধ্যে তদন্তে উঠে এসেছে—একদিন না একদিন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ ধরনের গণহত্যা ও অপকর্মের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নস্যাৎ করতে না পারে। ইনশাআল্লাহ, আমরা এ লক্ষ্যে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।
অনেকে বলেন, দিগন্ত টেলিভিশন যথেষ্ট কৌশলী ছিল না বলেই তাদের ওপর খড়গ নেমে এসেছে। তবে আমি তা মনে করি না। সেদিন দিগন্ত টেলিভিশন যা দেখিয়েছে, অন্যান্য সব টেলিভিশনও তা-ই দেখিয়েছে। আমরা যখন লাইভ সম্প্রচার করছিলাম, তখন অনেকেই আমাদের লাইভ স্ট্রিম নিয়ে তাদের চ্যানেলে প্রচার করেছে। রাতে যখন আমাদের সম্প্রচার বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো, তখনও কিন্তু সময় টেলিভিশন শেষ পর্যন্ত লাইভে ছিল। অথচ কেউ বলছে না যে, সময় টেলিভিশন লাইভে ছিল বলে তারা অপরাধ করেছে। আসলে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা হলো ভিন্ন কিছু।
আমার মনে হয়েছে, ৫ মে’র পর আলেম-ওলামাদের ওপর চলা নৃশংসতার খবর যেন আর সামনে আসতে না পারে, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কারা মারা গেছেন, কে কোথায় হারিয়ে গেছেন, কাকে পাওয়া যাচ্ছে না, আর কারাই বা সেদিন সমাবেশে এসেছিলেন—এসব প্রকৃত ঘটনার পরবর্তী সংবাদ (ফলোআপ কাভারেজ) যেন কেউ প্রচার করতে না পারে, সে কারণেই দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মূলত অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে একটি আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপর ওই ঘটনার আর কোনো ফলোআপ রিপোর্ট হয়নি। তখন সব টেলিভিশন কেবল একতরফা কথা বলছিল। তাদের বয়ান ছিল এমন—আলেম-ওলামারা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছেন, গাছ কেটেছেন; এমনকি গাছের ক্ষতি নিয়েও রিপোর্ট হয়েছে! কী ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, কারা এতে অর্থায়ন করেছে, কারা এসেছিল এবং কী করতে চেয়েছিল—সবকিছু নিয়েই কেবল একমুখী রিপোর্ট প্রচার করা হয়েছে।
আমি মনে করি না, দিগন্ত টেলিভিশন এমন কোনো আক্রমণাত্মক রিপোর্ট করেছিল যার কারণে তাদের বন্ধ করতে হবে। বরং ঘটনার পর পুলিশের তাণ্ডবের বিষয়টি যেন পুরোপুরি আড়াল (ব্ল্যাকআউট) করে ফেলা যায়, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা বলি। আমরা যখন চ্যানেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করি, তখন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের মালিক সালমান এফ রহমান আমাদের সাথে যুক্ত হন। টেলিভিশন মালিকদের একটি অ্যাসোসিয়েশন আছে। সেই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেই স্বাভাবিকভাবে বলা হলো, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভিকে তো অন্যায়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, তাই সরকারের কাছে এটি পুনরায় চালুর দাবি জানাতে হবে। আমাদের সাংবাদিকদের একটি দল তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে দেখা করল।
অন্যদিকে, দিগন্ত টেলিভিশনের একজন ট্রেইনার ছিলেন হায়দার রিজভী। তাঁর ভাই গওহর রিজভী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। হায়দার রিজভী তাঁর ভাইকে বললেন, "তুমি তো প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আমি দিগন্তের এই কর্মীদের চিনি। দিগন্তের তো কোনো অপরাধ নেই, তারা তো বাস্তবে যা ঘটেছে তা-ই প্রচার করেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা তো ঠিকমতো লাইভও করতে পারেনি।" এরপর একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হলো, যেখানে গওহর রিজভী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সালমান এফ রহমান ছিলেন।
তাঁরা তিনজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বললেন, "দিগন্ত টেলিভিশনকে তো সাময়িকভাবে স্থগিত (টেম্পোরারি সাসপেন্ড) করা হয়েছে, এখন এর একটা ফয়সালা হওয়া উচিত। কী করা যায়?" আমাদের একটি লিখিত আবেদনও সেখানে দেওয়া হয়েছিল। তখন শেখ হাসিনা গওহর রিজভীকে প্রশ্ন করলেন, "আপনি এই বিষয়ের মধ্যে কেন জড়ালেন?" গওহর রিজভী জানালেন যে, তাঁর ভাই হায়দার রিজভী সেখানে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করতেন, সেই সূত্রেই তিনি কথা বলছেন। সালমান এফ রহমানও তাঁর অবস্থান থেকে কথা বললেন।
চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনা তখন হাসানুল হক ইনুকে বললেন, ‘টেলিভিশন তো বন্ধ করেছেন আপনি! আপনার কৌশলে, আপনার চাপেই তো এটা বন্ধ করা হয়েছে। এখন আপনিই আবার এটা খোলার জন্য এসেছেন কেন?’ এরপর তিনি আরও বললেন, ‘আমি তদন্ত করে দেখব, এখানে আপনার কোনো আর্থিক স্বার্থ জড়িত আছে কি না।’ এই কথা বলে শেখ হাসিনা ফাইলটি রেখে দিলেন।
এই ভেতরের খবরগুলো অনেকেই জানেন না। তবে আমি অনেকটাই নিশ্চিত যে, চ্যানেলটি বন্ধ করার পেছনে সরকারের একটি বড় ভয় কাজ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, ৫ই মে’র ঘটনার পর অন্য কোনো চ্যানেল হয়তো ফলোআপ রিপোর্ট করার সাহস করবে না, কিন্তু দিগন্ত টেলিভিশন ঠিকই তা করবে। আর ঠিক এ কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো যে, আমরা নাকি অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করেছি, লাইভ সম্প্রচার করেছি! কিন্তু ভেবে দেখুন, টেলিভিশনের কাজই তো লাইভ করা, সংবাদ প্রচার করা। আমরা যদি সত্যিই অতিরঞ্জিত কিছু করে থাকতাম বা কোনো ধরনের উসকানি দিতাম, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? আমাদের কোনো শাস্তি দেওয়া হলো না কেন? আমাদের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হলো না? আমাদের কোন রিপোর্টের কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য কেন আমাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হলো না? আওয়ামী লীগ সরকার তো ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল, তবুও তারা এসবের কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।
সুতরাং, আমি মনে করি, মিডিয়া জগতে কেবল একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতেই তারা এই কাজটি করেছিল। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে, এটি কেবল একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ এবং কিছুদিন পর তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কিন্তু তারা আর সেই কথা রাখেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও লেখা নেই যে, কোনো টেলিভিশনের 'সাময়িক স্থগিতাদেশ' এক যুগের বেশি সময় ধরে চলতে পারে!
আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই, আমি বর্তমান টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছিলাম যেন তারা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা করেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তারা সেটি করেননি। আজ স্রেফ আর্থিক সংকটের কারণে টেলিভিশনটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সরকারের উচিত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে এই দুটি টেলিভিশন চ্যানেলকে পূর্ণোদ্যমে চালুর ব্যবস্থা করে দেওয়া।
পরিশেষে বলব, কেউ যদি বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের ইতিহাস লিখতে চান, তবে ৫ই মে’র ইতিহাস এবং এই দুটি টেলিভিশনকে অন্যায়ভাবে বন্ধ করার ইতিহাস অবশ্যই তুলে ধরতে হবে। এর পাশাপাশি, ‘আমার দেশ’ পত্রিকা এবং পরবর্তীতে একুশে টেলিভিশনসহ আরও যেসব গণমাধ্যম অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল—এই সব অপকর্মের অবশ্যই সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।
মজিবুর রহমান মঞ্জু: আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান, দিগন্ত টেলিভিশনের সাবেক উপ-নির্বাহী পরিচালক।

গণজাগরণ মঞ্চ নামটা মূলত আন্দোলনের পরের দিকে এসেছে। শাহবাগের এই আন্দোলনের পেছনে একটি দীর্ঘ পটভূমি রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ একে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে রিলেট করেন। তবে ২০১৩-এর সেই জেনারেশনের প্রস্তুতির পটভূমিটি নতুন করে শুরু হয়েছিল মূলত ২০০১ সালে।
৫ মিনিট আগে
এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের যে ফলাফল সামনে এলো, তা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পালাবদলের ইঙ্গিত। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— বাংলার মহিলারা কি এবার একজোট হয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করলেন? ভোটের অঙ্ক অন্তত সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
৭ ঘণ্টা আগে
লেখকদের দুই পয়সা দাম দেয় না যে সমাজ, যে সমাজের মানুষ হরদম হাসাহাসি করে লেখকদের নিয়ে এবং বলে—‘কী হয় লিখে?’ তাদের জন্য এক ‘চপেটাঘাতের মতো উদাহরণ’ হয়ে আছেন কার্ল মার্ক্স। মার্ক্সই সম্ভবত সেই এক এবং অদ্বিতীয় লেখক ও চিন্তক, যাঁর লেখালেখি ও চিন্তা ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করেছে।
৯ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে গতকাল (সোমবার) হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তিটি নিয়ে আগে থেকেই নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা চলছিল।
১০ ঘণ্টা আগে