ডিএনসিসি

সামনে নেতা, নেপথ্যেও, ১১ হাটই বিএনপি নেতাদের কবজায়

কয়েকটি হাটে সরকারি দরের চেয়ে মাত্র কয়েক হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব হাটে দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সংখ্যাও কম। গত বছরের তুলনায় এবার অন্তত চার কোটি টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে ডিএনসিসি।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ডিএনসিসির একমাত্র স্থায়ী গাবতলী পশুর হাট মাত্র ১১ হাজার ৬১০ টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পেয়েছেন বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ। ছবি: ফোকাস বাংলা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ঈদুল আজহার পশুর হাটের ইজারা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের একচেটিয়া আধিপত্য দেখা গেছে। অস্থায়ী ১০ ও একটি স্থায়ী হাটের আটটিই পেয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। বাকি তিনটির ইজারা ব্যবসায়ীদের নামে থাকলেও, নেপথ্যে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারাই।

কয়েকটি হাটে সরকারি দরের চেয়ে মাত্র কয়েক হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব হাটে দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সংখ্যাও কম। সে কারণে গত বছরের তুলনায় এবার অন্তত চার কোটি টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে ডিএনসিসি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দরের কাছাকাছি দামে ইজারা পাওয়ার বিষয়টি ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘সমঝোতার’ ইঙ্গিত দেয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান স্ট্রিমকে বলেছেন, সবকিছুর দাম যেখানে বাড়ছে, সেখানে সিটি করপোরেশনের হাট ইজারার আয় কমে যাওয়া প্রশ্নের উদ্রেক করে।

তিনি বলেন, যেহেতু সরকারদলীয় লোকেরা ইজারা পেয়েছেন এবং দরপত্রে অংশ নেওয়ার সংখ্যাও কম, সেহেতু এখানে কোনো সমঝোতা হয়ে থাকতে বা সরকারদলীয়দের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কোথায় কত টাকায় ইজারা

ডিএনসিসির বেশির ভাগ হাটেই হাতেগোনা কয়েকটি দরপত্র জমা পড়ায় সরকারি দরের চেয়ে কিছু টাকা বেশি দিয়ে ইজারা বাগিয়ে নিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। অনেকটা ‘প্রতিযোগিতাহীন’ এই ‘সমঝোতার’ দরপত্রের কারণে গত বছরের তুলনায় সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমেছে।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, এবার কোরবানির হাট থেকে সব মিলে আদায় হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে অস্থায়ী হাট থেকে এসেছে ৩০ কোটি ৩২ লাখ ২৪ হাজার এবং স্থায়ী (গাবতলী) হাট থেকে এসেছে ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৪৮ লাখ ৫১ হাজার ৩০ টাকা।

ডিএনসিসি থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, এবার একটি হাটে কোনো প্রতিযোগীই ছিল না। বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে মাত্র একটি। ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পান স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।

বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন রাজধানীর গাবতলী হাটে কোরবানি পশু আনছেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন রাজধানীর গাবতলী হাটে কোরবানি পশু আনছেন। ছবি: ফোকাস বাংলা

একইভাবে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি হয় এবং তিনটিই জমা পড়ে। ১৫ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ২৭ লাখ টাকায় ইজারা পান উত্তরখান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম সরকার।

বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গায় হাটের ২১টি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে তিনটি। ১ কোটি টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ৫ কোটি ৭ লাখ টাকায় ইজারা পান ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান।

বাড্ডা স্বদেশ প্রপার্টি এলাকার হাটে ১৯টি সিডিউল বিক্রি ও চারটি জমা পড়ে। সেখানে ৫০ লাখ টাকার সরকারি দরের বিপরীতে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ইজারা পান উত্তর বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিনুর ইসলাম।

৩০০ ফিট ডুমনি হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রির বিপরীতে সমানসংখ্যক জমা পড়ে। ৬০ লাখ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পান উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তার হোসেন।

উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর হাটে ১৯টি সিডিউল বিক্রি হয়, জমা পড়ে চারটি। ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা পান ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন হাটে ১৭টি শিডিউল বিক্রি ও তিনটি জমা পড়ে। ১ কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ইজারা পান মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম।

পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদ্রাসা-সংলগ্ন হাটে ৯টি শিডিউল বিক্রি ও তিনটি জমা পড়ে। ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় ইজারা পান জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও রামপুরা থানা বিএনপির সদস্য এম আসলাম।

ব্যবসায়ীদের আড়ালেও বিএনপি

খাতা-কলমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নামে ইজারা নেওয়া হলেও, নেপথ্যে বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাকি তিনটি হাট। মিরপুর সেকশন-৬ (ইস্টার্ন হাউজিং) হাটে পাঁচটি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে তিনটি। ১ কোটি ৭৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ইজারা পান সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাটটি পরিচালনার নেপথ্যে আছেন উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম ও রূপনগর থানা বিএনপির সদস্য এম আশরাফুল ইসলাম।

মিরপুর কালশী বালুর মাঠ হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি ও দুটি জমা পড়ে। ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পান ব্যবসায়ী রেদোয়ান রহমান। এই হাট পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছেন পল্লবী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন।

এছাড়া ডিএনসিসির একমাত্র স্থায়ী গাবতলী পশুর হাটে ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার ৬১০ টাকা বেশি দিয়ে (১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা) ইজারা পেয়েছেন মো. হানিফ, যিনি বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী এবং হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামে পরিবহন কোম্পানির মালিক।

এ ব্যাপারে জানতে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানকে মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

তবে একই বিষয়ে আগে শফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দলীয় বিবেচনায় হাটের ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেছিলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সর্বোচ্চ দরদাতা ও শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিকেই মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত