ধর্ষণের বিচার: রায়ের উল্লাস আর কার্যকরের দীর্ঘশ্বাস

ইসরাত জাহান চৈতী
ইসরাত জাহান চৈতী

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ১২: ৪৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত সাত দিনের সংবাদপত্রের পাতা উল্টে দেখুন। এমন একটি দিনও কি গেছে, যেদিন শিশু বা নারী ধর্ষণের খবর আপনার চোখে পড়েনি? উত্তরটা অবধারিতভাবেই ‘না’। দেশে যখন ধর্ষণের এক ভয়াবহ মহামারি চলছে, তখন মেহেরপুরের একটি খবর আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাত্র ২৯ দিনের মধ্যে এক ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন মেহেরপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। জনমনে যখন নিয়মিত অপরাধের খবর দেখে বিষণ্নতা জেঁকে বসেছে, তখন এমন দ্রুত বিচার নিশ্চয়ই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল রায় ঘোষণাই কি আমাদের চূড়ান্ত স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে সেই স্বস্তি নিমেষেই ফিকে হয়ে আসে। আমরা কি মাগুরার সেই ছোট্ট শিশু আছিয়ার কথা ভুলে গেছি? ২০২৫ সালের মার্চে (উৎস অনুযায়ী) বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাশবিকতার শিকার হয়েছিল সে। দ্রুততম সময়ে সেই মামলার বিচার শেষ হয়েছিল। ঘটনার দুই মাস ১২ দিনের মাথায় রায় হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেই রায় ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের শুনানির জট খোলেনি। অর্থাৎ, মাঠ পর্যায়ের আদালত দ্রুত রায় দিলেও উচ্চ আদালতের আইনি মারপ্যাঁচে আটকে আছে বিচার।

একই চিত্র দেখা যায় ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি বা টাঙ্গাইলের রুপার ক্ষেত্রে। ২০১৯ সালে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ৬১ কার্যদিবসের মধ্যে। আজ কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার রুপা হত্যা মামলায় চারজনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে তিনজনের সাজা কমে গেছে। এমনকি কুমিল্লার তনু হত্যাকাণ্ড বা সীতাকুণ্ডের শিশু ইরার খুনিদের বিচার পেতেও পোহাতে হচ্ছে অন্তহীন অপেক্ষা।

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে এক চরম হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। দ্রুত রায় হলেও তা কার্যকর না হওয়ার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে ফাঁসির রায় হলে তা কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন বা ‘ডেথ রেফারেন্স’ প্রয়োজন হয়। সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান বলছে, একটি ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত হতেই গড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় লেগে যায়। এরপর আপিল বিভাগ তো আছেই। এই দীর্ঘ সময়ে জনরোষ থিতিয়ে আসে, সাক্ষীরা মনোবল হারান। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আমূল সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে দণ্ড কার্যকর করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু। এই পরিসংখ্যান আমাদের সামাজিক ও আইনি কাঠামোর ব্যর্থতার দলিল।

যখন একজন বাবা বা নিকটাত্মীয়ের কাছেও শিশু নিরাপদ থাকে না, তখন বুঝতে হবে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর এই অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যদি দৃশ্যমান না হয়, তবে অপরাধ প্রবণতা কমানো অসম্ভব।

সমাজের সচেতন মহল দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল যে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর জন্য উচ্চ আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হোক। প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি এমন বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু বেঞ্চ গঠন করলেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনোভাবেই এই মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আমূল সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে দণ্ড কার্যকর করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

আমরা আর কোনো ‘তনু’ বা ‘আছিয়া’র লাশের মিছিল দেখতে চাই না। মেহেরপুরের দ্রুততম সময়ের রায় যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে অপরাধীর গলায় যখন ফাঁসির দড়ি পড়বে, কেবল তখনই সমাজ থেকে এই ধর্ষণের মহামারি নির্মূলের পথ প্রশস্ত হবে। বিচার পাওয়ার আশায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন আর দীর্ঘতর না হয়, রাষ্ট্রকে সেই নিশ্চয়তা দিতেই হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সম্পর্কিত