
ভারতের মহারাষ্ট্রের ৪৭ বছর বয়সী রামাবাই রণবীর কখনো দৌড়ের প্রশিক্ষণ নেননি। ছিল না দৌড়ানোর জুতাও। তবু মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পুরস্কারের টাকা জেতার আশায় তিনি অংশ নেন ৩ কিলোমিটারের একটি দৌড় প্রতিযোগিতায়। শেষ পর্যন্ত খালি পায়ে দৌড়ে প্রথম হন তিনি।
গত আগস্টে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিযোগিতায় রামাবাইয়ের লক্ষ্য ছিল একটাই—প্রথম হয়ে ৩ হাজার রুপি পুরস্কারের টাকা জেতা। এই টাকা দিয়ে মেয়েদের বই ও পড়াশোনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে চেয়েছিলেন তিনি।
রামাবাইয়ের খালি পায়ে দৌড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, পড়াশোনার খরচ এবং সরকারি চাকরির জন্য তরুণদের দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন মন্তব্য করেন, এটি কি গৌরবের বিষয়, নাকি একটি সমাজ হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার?
রামাবাই জানান, তাঁর বড় মেয়ে একদিন সকালে এসে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা বলেছিল। মেয়ের কথা শুনে তিনি জানতে পারেন, প্রতিযোগিতায় জিতলে পুরস্কারের টাকা পাওয়া যাবে এবং তা পড়াশোনার কাজে লাগানো যাবে।
তাঁর ছোট মেয়ে আরতি নান্দেদ শহরে থেকে পড়াশোনা করছেন। বই কেনার মতো টাকাও অনেক সময় তাঁর হাতে থাকে না।
রামাবাই বলেন, আমি তাকে বই কেনার জন্য টাকা দিতে পারিনি। এ কারণে সে আট দিন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেনি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমাকে দৌড়ে জিততে হবে।
প্রতিযোগিতার সময় তাঁর পায়ের স্যান্ডেল বারবার খুলে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তিনি স্যান্ডেল খুলে ফেলেন, শাড়ি গুটিয়ে নেন এবং খালি পায়ে দৌড়াতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নারীদের ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিভাগে প্রথম হন।
রামাবাইয়ের বড় মেয়ে পূজাও তাঁর বয়সভিত্তিক বিভাগে দ্বিতীয় হয়ে পুরস্কার পান। তবে নিজের সাফল্যের চেয়ে মায়ের সাহসকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

২০১২ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন রামাবাই। জীবিকা চালাতে তিনি বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। অন্যের জমিতে সয়াবিন ও ছোলা তুলেছেন, হলুদ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেছেন।
বর্তমানে তিনি একটি কোচিং সেন্টারে রান্নার কাজ করেন। সেখানেই তাঁর এক মেয়ে পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রামাবাই নিজে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই নিজের মেয়েদের জন্য তিনি ভালো ভবিষ্যৎ চান।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন মেয়েদের ভালো শিক্ষা দেওয়ার জন্য যা করার দরকার, সবই করব।
ভারতের লাখ লাখ পরিবারের মতো রামাবাইয়ের পরিবারেও শিক্ষা একটি বড় স্বপ্ন। তবে পড়াশোনা শেষ করে একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার পথ অনেকের জন্যই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য তরুণদের বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিতে হয়। অনেকেই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন এবং বই ও অন্যান্য পড়াশোনার সামগ্রী কিনতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করেন।
এর মধ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর ওপর তরুণদের আস্থা কমেছে। শিক্ষা, চাকরি এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা থেকে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনও হয়েছে।
রামাবাইয়ের দৌড়ের ঘটনা শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদেরও নজরে আসে। এ মাসের শুরুতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্থানীয় কর্মকর্তাদের রামাবাইকে ৫০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সুখদেও থোরাট মনে করেন, রামাবাইয়ের ঘটনা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি সমস্যার দিক তুলে ধরে।
তিনি বলেন, একজন নারীকে যদি মেয়েদের পড়াশোনার জন্য এত কঠিন সংগ্রাম করতে হয়, তাহলে বোঝা যায় সরকারি শিক্ষা প্রকল্পগুলো মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প চালালেও সেগুলোর বাস্তবায়ন দুর্বল।
তবে এসব বিতর্ক রামাবাইয়ের কাছে বড় বিষয় নয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মেয়েদের ভবিষ্যৎ।
তিনি বলেন, আমি চাই না আমার মেয়েরা আমার মতো কষ্টের জীবন কাটাক। আমি চাই না তাদের কাদার মধ্যে দিয়ে চলতে হোক, প্রখর রোদ বা বৃষ্টির মধ্যে কষ্ট করতে হোক। আমি জীবনে যা সহ্য করেছি, আমার মেয়েদের যেন তা সহ্য করতে না হয়।
সূত্র: বিবিসি
.png)






