ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিতে মার্কিন শ্রমবাজারে উদ্বেগ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

সংগৃহীত ছবি

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষণমতায় আসার পর থেকেই অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই নীতির প্রভাবে দেশটির শ্রমবাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্পখাতের সংগঠন।

খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিত্তিতে বৈধভাবে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়া বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর সুরক্ষা স্কিম বাতিলের উদ্যোগ দেশটির শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাসের (টিপিএস) মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুহারা প্রায় ১৩ লাখ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ ও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তবে রিপাবলিকান সরকার এখন সেই সুযোগ বাতিলের পথে হাঁটছে। গত জুনে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মার্কিন সরকার দেশজুড়ে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে। এতে করে বিদ্যমান শ্রমিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ও সেবার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পখাতে দক্ষ ও সাধারণ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এদিকে টিপিএস কর্মসূচির আওতায় থাকা বেশিরভাগ অভিবাসীই নির্মাণ, বয়স্কদের সেবা, উৎপাদন, কৃষিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করেন। সুতরাং সুরক্ষা ব্যবস্থাটি উঠে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিপুলসংখ্যক অভিবাসী বৈধ শ্রমিকদের হারাবে যুক্তরাষ্ট্র, যা উল্লিখিত খাতগুলোয় শ্রমিক সংকট আরও বাড়াবে।

শিল্পখাত সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা এ বিষয়টি নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউস এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর (যেমন স্বরাষ্ট্র, শ্রম, কৃষি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাও করছেন।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছে নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্টরা। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোম বিল্ডার্সের (এনএএইচবি) প্রেসিডেন্ট জিম টবিনের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতে বর্তমানে দুই থেকে চার লাখ নির্মাণ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির নির্মাণ শ্রমিকদের এক-চতুর্থাংশের বেশি ছিলেন বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। এই খাতের কিছু বিশেষায়িত পেশায় এই হার আরও বেশি। ড্রাইওয়াল ও সিলিং ইনস্টলার, প্লাস্টার, ছাদ নির্মাণ, রং ও ফ্লোরিংয়ের মতো কাজে অভিবাসী শ্রমিকদের হিস্যা অর্ধেকের বেশি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত কমে গেলে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ধীর হয়ে যাবে এবং শ্রমিক ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাড়ি নির্মাণের মোট ব্যয়ে। টবিনের ভাষায়, শ্রমিকের ওপর চাপ যত বাড়বে, বাড়ির দামও তত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আবাসন খাতে সরবরাহ বাড়িয়ে বাড়ির দাম কমানোর কথা বলছে। অথচ তাদের নীতির কারণে তৈরি হওয়া শ্রমিক সংকটই সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন করে তুলতে পারে।

অ্যাসোসিয়েটেড বিল্ডার্স অ্যান্ড কন্ট্রাক্টরসের প্রধান নির্বাহী মাইকেল বেলাম্যান বিদ্যমান পরিস্থিতিকে গোলমেলে হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করা অভিজ্ঞ শ্রমিকদের হঠাৎ হারিয়ে ফেললে তাদের জায়গা পূরণের মতো দক্ষ শ্রমিক মার্কিন নাগরিকদের মধ্য থেকে সহজে পাওয়া যাবে না।

ডেটা সেন্টার নির্মাণের মতো দ্রুত সম্প্রসারণশীল খাতগুলোয় শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। এমন এক সময়ে সরকারের এই ধরনের সিদ্ধান্তকে রীতিমতো আত্মঘাতী মনে করছেন বেলাম্যান।

কৃষি খাতেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের একটি বড় অংশ মৌসুমি ও অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টিরই কয়েকজন আইনপ্রণেতা সম্প্রতি সরকারের কাছে এইচ-টুএ কৃষি শ্রমিক কর্মসূচির প্রক্রিয়া গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত সংখ্যক বৈধ বিদেশি শ্রমিকের ব্যবস্থা না করে উল্টো কঠোর অভিবাসন অভিযান চালালে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

দুগ্ধশিল্পের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে বৈধ অভিবাসী শ্রমিকের ঘাটতি হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান অনড়—যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে ইচ্ছুক বিদেশিদের অবশ্যই সঠিক প্রক্রিয়ায় বৈধ পথে প্রবেশ করতে হবে। সরকার বলছে, অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের ওপর নির্ভরতা কখনই কোনো খাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। হোয়াইট হাউসও বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় বৈধ শ্রমশক্তির সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

অভিবাসন কঠোর করার পক্ষে থাকা রক্ষণশীল মহলও অবশ্য শ্রমবাজারে সংকটের আশঙ্কা করছেন। তারা সমাধান হিসেবে কর্মক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ জোরদারের পাশাপাশি বৈধ শ্রমিক কর্মসূচি সংস্কারের কথা বলছেন। এ অবস্থায় অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী শ্রমশক্তি নিশ্চিত করা ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাব শুধু শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে। কারণ, শ্রমিক সংকটের কারণে শিল্পখাতগুলোয় উৎপাদন ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গেলে সেই বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই টানতে হয়।

সূত্র: সিএনএন

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত