ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিবেদন/কলকাতায় এলে মার্কুইস স্ট্রিটের হোটেলেই কেন ওঠেন বাংলাদেশিরা

Multiple Authors
তনভিয়া বড়ুয়া ও সঙ্গীতা ঘড়োই

ছবি: ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া
ছবি: ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া

‘আসলে আগে থেকেই তো আসার অভ্যাস। এখানে আসার মূলত কারণ, মার্কেট কাছে। তারপরে টাকা এক্সচেঞ্জের দোকানগুলো কাছে, খাওয়া-দাওয়ার সুবিধা। তারপরে বাংলাদেশের বাসগুলোও এখানে এসে থামে। তো এইখানে আইসা মূলত এরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।’

কলকাতার মার্কুইস স্ট্রিটের কথা বলতে গিয়ে এমনটাই জানালেন স্থানীয় ব্যবসায়ী বিপ্লব সাহা। তাঁর কথায়, এই এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের আসা নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং কয়েক দশক ধরে কলকাতায় আসা বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশের সঙ্গে মার্কুইস স্ট্রিটের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ চিকিৎসার জন্য আসেন, কেউ কেনাকাটা করতে, কেউ আবার ঘুরতে। কিন্তু থাকার জায়গা হিসেবে কেন বারবার বেছে নেন এই এলাকাটিকেই?

১৯ অগাস্ট কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। রাত আড়াইটা নাগাদ আগুন লাগার ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে ছিলেন ঝাড়খণ্ডের এক হোটেলকর্মী এবং শিলিগুড়ির বাসিন্দা ৬৮ বছরের যোগনারায়ণ আগরওয়াল। তবে মৃতদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানা যায়। তাঁদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন।

মৃতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী, আড়াই বছরের শিশু এবং শ্বশুর। ছিলেন ঢাকার কাছে সাভারের এক বাসিন্দাও।

এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনে কলকাতায় আসা মানুষজন কেন এই নির্দিষ্ট এলাকাতেই এত বেশি হোটেলে ওঠেন? অগ্নিকাণ্ডের পর সেই অভ্যাসে কি কোনো বদল এসেছে? হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কী সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা? আর কেনই বা মার্কুইস স্ট্রিটকে অনেকেই ‘মিনি বাংলাদেশ’ বা ‘মিনি ঢাকা’ বলে মনে করেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই মারকুইস স্ট্রিটে কথা বলল ইনস্ক্রিপ্ট।

সেখানেরই মানি এক্সচেঞ্জ ও টিকিটের দোকানদার বিপ্লব সাহার কথায়, এই এলাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা, একসঙ্গে অনেক প্রয়োজন মিটে যায়। নিউমার্কেট কাছে। বাজার আছে। মানি এক্সচেঞ্জ রয়েছে। খাবারের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশের বাসও এই এলাকায় আসে।

‘নিউমার্কেটটা কাছে, নিউমার্কেটে কেনাকাটা করে’—কেনাকাটার পাশাপাশি খাবারের বিষয়টিও বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানালেন তিনি। ‘খাবারের হোটেলে সস্তায় খাবার পায়। যেমন বাংলাদেশ থেকে বেশি মানুষ এসে বিফটা খোঁজে। বিফটা এ এলাকায় পাওয়া যায়।’

চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা একজন বাংলাদেশি পর্যটকের কাছে হাসপাতাল যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই প্রয়োজন খাবার, টাকা বদলানোর ব্যবস্থা, যাতায়াত এবং দৈনন্দিন কেনাকাটার সুবিধা। মার্কুইস স্ট্রিটে এই সবকিছু তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি পাওয়া যায় বলেই এই এলাকার প্রতি দীর্ঘদিন ধরে একটা নির্ভরতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য। বিপ্লব সাহার নিজের ব্যবসাও সেই নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর এই এলাকার ব্যবসা কতটা নির্ভরশীল, প্রশ্ন করা হলে তাঁর উত্তর আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিরা না এলে, যদি অন্য সাইডে চলে যায়—শিয়ালদহ চলে যায় বা মুকুন্দপুর চলে যায়, এই সাইডটা পুরোপুরি মাইর খেয়ে যাবে।’

তাহলে এই নির্ভরতা কি সাম্প্রতিক? না কি বহু পুরনো? বিপ্লব সাহার কথায়, এই সম্পর্ক নতুন নয়। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষজন এই এলাকায় আসছেন। তাঁর কথায়,

‘তাও তো ৩০-৩৫ বছর ধরে তো আসা-যাওয়া এখানেই চলছে। বাংলাদেশ থেকে এখানে আসত, যখন বাস ছিল না তখন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে বনগাঁ চলে আসত... বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ চলে আসত, তারপর এখানে চলে আসত কাছাকাছি নিউমার্কেট।’

বাংলাদেশের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগের পুরনো পথগুলোর সঙ্গেও এই এলাকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। শিয়ালদহে ট্রেন থেকে নামলেও কেন মানুষ সেখানেই থাকতেন না? কেন চলে আসতেন মার্কুইস স্ট্রিটে?

বিপ্লব সাহার উত্তর, কারণটা শুধু যাতায়াত নয়, সামাজিক যোগাযোগও। ‘মারকুইস স্ট্রিট থেকে নিউমার্কেট কাছে, খাবারের হোটেল কাছে। তারপরে বন্ধু-বান্ধবরা আসে, সবাই এখানে থাকে। ওদের সঙ্গে দেখা হয়, এই আরকি।’

দীর্ঘদিন ধরে যারা এই এলাকায় আসছেন, তাঁদের পরিচিত মানুষজনও এখানেই থাকেন। ফলে নতুন করে কলকাতায় আসা কোনো বাংলাদেশির কাছেও জায়গাটা অচেনা থাকে না। কোথায় থাকা যায়, কোথায় খাওয়া যায়, কোথায় টাকা বদলানো যায়—এই তথ্যগুলোও পরিচিতদের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু সম্প্রতি সেই চেনা ব্যবস্থাতেই ধাক্কা এসেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর একাধিক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকেই সমস্যায় পড়েছেন বলে জানালেন মার্কুইস স্ট্রিটে থাকা এক পর্যটক। তাঁর অভিযোগ, হোটেল খুঁজতে গিয়ে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখানে যখন এসছি, যেমন আজকে আমি এখানে আসলাম, তো এখন হোটেল খুঁজে... খুঁজে পাচ্ছি না। যেখানেই যাচ্ছি, খুব এক্সপেনসিভ।’

তাঁর বক্তব্য, বিপদের পর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুযোগে হোটেলের ভাড়া বেড়ে যাওয়া চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ‘এই জিনিসটা করা উচিত হয়নি কারণ বিপদ তো বলে আসে না। তাই বলে বিপদের সদ্ব্যবহারের জন্য উনারা বেশি চার্জ করতে পারেন না।’

কেন বিষয়টি তাঁদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ কলকাতায় আসা অনেক বাংলাদেশি পর্যটকের মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসা। চিকিৎসার খরচের সঙ্গে হোটেল ভাড়া, খাবার এবং যাতায়াতের খরচ যোগ হলে তাঁদের ওপর চাপ আরও বাড়ে।

‘আমরা আসি ট্রিটমেন্টের উদ্দেশ্যে। এখন ট্রিটমেন্টই করাব, নাকি এখানে খাব, নাকি হোটেল ভাড়া দেব?’ তাঁর আবেদন, হোটেলের ভাড়া যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে। ‘এর জন্য হোটেল প্রাইজগুলো যদি একটু রিজনেবল করে দেয়, তাহলে আমাদের জন্য খুবই ভালো হয়।’

এই মুহূর্তে মার্কুইস স্ট্রিটে হোটেলের ভাড়া কত? তাঁর কথায়, ১২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০, ২০০০, ২৫০০ এমনকি ৩০০০ টাকা পর্যন্ত ঘর রয়েছে। কিন্তু সমস্যা শুধু ভাড়ার নয়। অগ্নিকাণ্ডের পর কমদামি হোটেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

‘কমদামি ওখানেও আমি যাইনি। যেগুলো গিয়েছি ওগুলো অ্যাকচুয়ালি ওঠার মতো না। ওখানে যে অগ্নিকাণ্ড ঘটল, হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ বের হওয়ার কোনো স্কোপ নেই।’ এই পর্যটকের কথায় তাই অগ্নিকাণ্ডের পর মূল উদ্বেগ শুধু হোটেল পাওয়া নয়। হোটেলটি কতটা নিরাপদ, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার রাস্তা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

‘ওদের ওই জিনিসটা মেইনটেইন করেই হোটেলগুলো... রুমগুলো তৈরি করা উচিত। যেন যে কেউ ইজিভাবে মুভ করতে পারে’—বলছিলেন বাংলাদেশের সিলেন থেকে আসা পর্যটক তারিকুর রহমান তাহমিদ। কলকাতায় এত জায়গা থাকতে কেন এই এলাকাতেই থাকা—এই প্রশ্নের উত্তরেও উঠে এল নিউমার্কেট এবং সস্তায় ভালো জিনিস পাওয়ার কথা। তাহমিদ বলেন, ‘মারকুইস স্ট্রিট এরিয়ায় থাকার কারণ হচ্ছে গিয়া যে নিউমার্কেট। নিউমার্কেটে অনেক ভালো জিনিস পাওয়া যায় কম দামে, সস্তা জিনিস। আর ভালো উন্নতমানের জিনিস পাওয়া যায়।’

তবে তাঁর বক্তব্যে আরও একটি বিষয় উঠে এল। তাঁর চোখে মার্কুইস স্ট্রিট শুধু বাজার বা হোটেলের জায়গা নয়। বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে এই এলাকার একটা সাংস্কৃতিক পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। ‘বিশেষ করে বাঙালিরা, আমি দেখছি মার্কুইস স্ট্রিট এরিয়ায়, মুসলমান এরিয়াতে আইসা থাকে।’

কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি বদলেছে। অনেক হোটেল বন্ধ। ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষজন থাকার জায়গা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে অনেক বাঙালি জানে, সাতজন বাঙালি মারা গেছে একটা দুর্ঘটনার কারণে। এই দুর্ঘটনার পর দেখা যাইতেছে যে অনেক হোটেল বন্ধ, অনেক বাঙালি আইসা হেনস্তা... হয়রানিতে পড়তেছে, হোটেল পাইতেছে না।’

শুধু হোটেল না পাওয়াই সমস্যা নয়। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ভাড়াও আগের তুলনায় বেশি বলে তাঁর অভিযোগ। ‘আগে যে হোটেল কম দামে পাওয়া গেছে এই হোটেলটা এখন দ্বিগুণ দামে নিতে হইতেছে।’

তবু কেন তাঁরা আবারও এই এলাকাতেই থাকছেন? তারিকুর রহমান তাহমিদের উত্তর, নিউমার্কেট এবং আশপাশের জায়গাগুলোর সুবিধার কারণেই। ‘মারকুইস স্ট্রিটেই থাকতে হইছে কারণ ওই যে ওইখান থেকে নিউমার্কেট পাশে আর এদিকে ভালো ভালো স্পট আছে। ওইটার জন্য।’

তিনি অবশ্য চিকিৎসার জন্য নয়, ঘুরতে কলকাতায় এসেছেন। ভিক্টোরিয়া, ইকো পার্ক এবং নিউমার্কেট ঘুরেছেন। ১৫ থেকে ২০ দিন কলকাতায় থাকার পরিকল্পনা তাঁর।

কিন্তু ঘুরতে আসা পর্যটক হিসেবেও তাঁর চোখে অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে হোটেল পাওয়া। তাঁর কথায়, ‘অনেক বাঙালি আইসা হোটেলের ভোগান্তিতে ভুগতেছে। যেমন কালকে ভাইদেরকে আমি রিসিভ কইরা অনেক হোটেলে নিয়ে গেছি। হোটেল পাইতেছি না। তারপর কষ্টসৃষ্ট করে একটা হোটেলে ঢুকিয়ে দিয়েছি।’

বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ রাসেলের কাছেও মার্কুইস স্ট্রিটের পরিচিতির মূল কারণ একই। বাংলাদেশি মানুষজন এখানে আসেন, একে অপরের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। ফলে একটা আপন পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁর কথায়, ‘আসলে এই জায়গাটা হচ্ছে, আমাদের বাঙালি যারা আসে সবাই আইসা এখানে থাকে তো। দেখা গেছে যে রাস্তায় বের হইলাম ভাই-ব্রাদারের সাথে একটু দেখা হয়, কথা হয়, একটু আনন্দ লাগে। এ জন্য সবাই এখানে আসে।”

এর সঙ্গে রয়েছে খাবার এবং হোটেলের সুবিধা। তিনি বলেন, ‘আর এখানকার যে খাবার-দাবারের ব্যবস্থাটা, থাকার হোটেলের ব্যবস্থা— এগুলা অনেক ভালো। এজন্য এখানেই বাঙালিরা আইসা থাকে।’

মার্কুইস স্ট্রিটকে ‘মিনি ঢাকা’ বা ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলা হয় কেন, সেই প্রশ্নেও রাসেলের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, ‘বাঙালিরা আসলে একটু নিরাপদ মনে করে এখানে। তারপরে খাওয়া-দাওয়া করাটা, হোটেলের যে পরিস্থিতি আছে ওইগুলা নিয়াই সব মিলায়া আসলে এখানে অনেক ভালো আরকি। থাকার জন্য সুব্যবস্থা আছে, সবাই এখানে থাকে এজন্য।’

তবে অগ্নিকাণ্ডের পর তাঁরও মন খারাপ হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের একটু মন খারাপ। আমাদের দেশীয় ভাই কি, সাতজন মারা গেছে বাঙালি। উনাদের জন্য আমাদের সবার... সব বাঙালিরই একটু মন খারাপ।’

তারপরেও বাস্তব সমস্যা থেকে যাচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘আপাতত আমরা একটু সমস্যাতে আছি, হোটেল পাচ্ছি না। যেদিকে যাই সব হোটেল বন্ধ। হোটেল পাওয়া যাইতেছে না, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সমস্যা।’

আর একজন বাংলাদেশি পর্যটক মাহাদীর কাছে মার্কুইস স্ট্রিটের পরিচয় আরও একটু আলাদা। ঢাকার বাসিন্দা মাহাদী এই এলাকায় প্রথমবার এসেছেন। কিন্তু প্রথমবার এসেও জায়গাটিকে তাঁর পরিচিত মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মার্কুইস স্ট্রিট… ইটস আ লাভলি প্লেস। এখানে মনে করেন সবকিছু আমাদের দেশের মতো কালচার। ইটস সেকেন্ড বাংলাদেশ ইউ ক্যান সে।’

কেন ‘সেকেন্ড বাংলাদেশ’? মাহাদীর ব্যাখ্যায়, খাবার থেকে শুরু করে মানুষের সহযোগিতা—সবকিছুই এই এলাকার প্রতি তাঁর আস্থার কারণ। রাসেল বলেন, ‘এখানে ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট রেস্টুরেন্টসে ট্রাই করলে আমরা হালাল খাবারটা পাই, মুসলিম খাবারটা পাই।’

শুধু খাবার নয়, কোনো সমস্যায় পড়লেও সাহায্য পাওয়ার একটা ভরসা রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য। ‘এখানে কোনো প্রবলেম হলে সবাই এসে আমাদেরকে সাপোর্ট করে, আমাদেরকে প্রোপার গাইডেন্স প্রোভাইড করে।’

থাকার খরচও অন্য জায়গার তুলনায় কম বলে মনে করেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘অ্যাকোমোডেশন ওয়াইজ ইটস লেস কস্টলি রাদার দ্যান আদার প্লেসেস।’ আর সবথেকে বড় সুবিধা, প্রয়োজনীয় জায়গাগুলো কাছাকাছি।

রাসেলের ভাষ্য, ‘আমাদের কোনো ইমার্জেন্সি হলে হোয়াটএভার উই হ্যাভ, উই গেট দ্য সাপোর্ট ওভার হেয়ার। এভরিথিং ইজ নিয়ারবাই। মানে হসপিটাল, পুলিশ স্টেশন, ফার্মেসিস, এভরিথিং। অ্যান্ড ইটস অ্যাফোর্ডেবল।’

মাহাদী নিজেও কলকাতায় এসেছেন চিকিৎসার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমরা মণিপাল হসপিটালে ডক্টর দেখাচ্ছি। আমার ফ্যামিলি—আমার ওয়াইফ এবং আমার শাশুড়ি। তো ইট ওয়াজ সেফ এনাফ, এটার জন্য আমাদের কলকাতাতে আসা হয় আরকি।’

কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের পর তাঁর সেই নিরাপত্তাবোধেও প্রশ্ন উঠেছে। মৃতদের কথা মনে করে তাঁর খারাপ লেগেছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এবার হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘উদ্বেগের কারণ হচ্ছে ইটস ভেরি স্যাড টু হিয়ার অ্যাবাউট দেম। ইটস অ্যান ইন্সিডেন্ট।’ তাঁর বক্তব্য, ছোট হোক বা বড়—প্রতিটি হোটেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা দরকার।

হোটেলের লাইসেন্স দেওয়ার সময়ই যদি অগ্নিনিরাপত্তা এবং অন্যান্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন বিপদ এড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে তাঁর মত।

অগ্নিকাণ্ডের পর এখন মার্কুইস স্ট্রিটে হোটেল পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নে মাহাদীর উত্তরও পরিস্থিতির জটিলতাই তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘আপাতত হোটেল এভেলেবল নেই, তবে মার্কুইস স্ট্রিটেই আপনার হোটেল এভেলেবল আছে। ইটস সেফ এনাফ। তবে সেখানেও ঘর পাওয়া সহজ নয়।’

কথাগুলি পাশাপাশি রাখলে উত্তরটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়, কেন এত বছর ধরে বাংলাদেশিদের কাছে মার্কুইস স্ট্রিট এত জনপ্রিয়। দীর্ঘদিনের যাতায়াতের অভ্যাস, নিউমার্কেটের কাছে থাকা, তুলনামূলক সস্তা খাবার, পরিচিত খাবারের ব্যবস্থা, মানি এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশগামী বাস, পরিচিত মানুষজন, একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি কাছাকাছি থাকা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও বাণিজ্যিক পরিসর।

বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের কাছে এই সুবিধাগুলির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ তাঁদের অনেকেরই কলকাতায় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ থাকতে হয়। হাসপাতালের পাশাপাশি থাকার জায়গা, খাবার এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা দরকার হয়। সেই জায়গা থেকেই মার্কুইস স্ট্রিটের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশি পর্যটকদের কথায় উঠে এসেছে।

একদিকে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বহু বছরের পরিচিতি এবং স্বস্তির জায়গা মার্কুইস স্ট্রিট। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর সেই জায়গাতেই হোটেল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। কোথাও ঘর নেই, কোথাও ভাড়া বেড়েছে, আবার কোথাও নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন।

তারপরও বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকেই বলছেন, তাঁরা এই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও সহজে যেতে চান না। কারণ এখানে তাঁরা শুধু একটি থাকার জায়গা খুঁজে পান না। পান পরিচিত খাবার, পরিচিত ভাষা, পরিচিত মানুষ এবং প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়ার একটা ভরসা।

হয়তো সেই কারণেই, অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্কের পরও মারকুইস স্ট্রিটের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে যায়নি। এখন তাঁদের চাওয়া একটাই—পরিচিত এই জায়গাটা যেন আরও নিরাপদ হয়। হোটেল যেন পাওয়া যায়। চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের উপর যেন বাড়তি আর্থিক চাপ না পড়ে। আর কোনো পরিবারকে যেন কলকাতায় চিকিৎসা বা থাকার জন্য এসে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত