ট্রাম্পের বিপদ বৃদ্ধির জন্য ভোট পর্যন্ত যুদ্ধ চায় আত্মবিশ্বাসী ইরান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

আমেরিকাকে বিপাকে ফেলতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় ইরান সরকার। স্ট্রিম গ্রাফিক
আমেরিকাকে বিপাকে ফেলতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় ইরান সরকার। স্ট্রিম গ্রাফিক

ছয় মাসের যুদ্ধের পর ইরানের আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার বদলে উল্টো বেড়েছে বলে মনে করছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন চাপ সহ্য করা এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তেহরান এখন আগের চেয়ে বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অপ্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। যুক্তরাষ্ট্রকে হতাশ ও বিপাকে ফেলতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করছে দেশটি।

চলতি সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর প্রেক্ষাপটে এই মূল্যায়ন সামনে এলো। এই সংঘাতে মাত্রা এখন পর্যন্ত কিছুটা সীমিত। একাধিক কর্মকর্তার বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের কট্টরপন্থী সরকার বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টির কথা ভাবছে।

যুদ্ধ থামানোর জন্য শান্তিচুক্তি করা খুব কঠিন হবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করতে তেহরান প্রস্তুত নয় বলেই দাবি করছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দ্রুত ও নিশ্চিত বিজয় হবে। একের পর এক হামলার পরও ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতাকে ট্রাম্প প্রশাসন যে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল, তা এখন পরিষ্কার।


নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও রাজনৈতিক সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন) পর্যন্ত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে ইরান। যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের চড়া দামের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়বে বলে হিসাব কষছে তেহরান।

অন্যদিকে ট্রাম্প এই মুহূর্তে কোনো কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা করছেন না। অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে ইরানকে নত করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন তিনি। গোয়েন্দা নিউইয়র্ক টাইমস অপ্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্যের আলোকে দাবি করছে, অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ইন্টেলিজেন্স কমিটির সদস্য নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জশ গোথেইমার বলেন, ‘ইরানিরা ভাবছে দর-কষাকষির সব তাস এখন তাদের হাতে। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পকে এই বিপাকে ফেলে রাখাটাই সবচেয়ে লাভজনক ।’

নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে অনলাইনে প্রচার চালাচ্ছে ইরান। মেটার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় ইরানি অ্যাকাউন্ট নেটওয়ার্ক থেকে মার্কিন রাজনীতি নিয়ে পোস্ট দেওয়া হচ্ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কিছু কন্টেন্টে প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানবিরোধী বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা 'আলেথিয়া' জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ইরানের অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমে ট্রাম্প ও মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ১ হাজার ২০০-র বেশি ফার্সি ভাষার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মূল কথাই ছিল এই যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও হরমুজ প্রণালির প্রভাব

নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক ড্রোনের শক্তির ওপর ভরসা করেই রণকৌশল সাজাচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে দর-কষাকষির বড় হাতিয়ার (লেভারেজ) হিসেবে ব্যবহার করছে দেশটি।

হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির সদস্য ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জেসন ক্রো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান নিয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসী আছেন।’

ক্রো জানান, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে। তারা জানে, ক্ষতি সামলে নেওয়া সম্ভব।

ক্রো আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্ব মনে করে তারা এখন আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। দেশটির বিভক্ত নেতৃত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের সম্পূর্ণ চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও এখনো তাদের হাতে অটুট রয়েছে।

গোয়েন্দা ব্রিফিং পাওয়া অন্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকার কাছে নতুন অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ নেই বলে ধারণা করছে ইরান। মার্কিন অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ওয়াশিংটন বড় ধরনের নতুন হামলা চালাতে পারবে না বলে বিশ্বাস করে তেহরান।

শুরুর দিকে যুদ্ধের সমর্থক থাকলেও এখন ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করছেন প্রতিনিধি জশ গোথেইমার। গোথেইমার জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছিল না এবং ইরান খুব সহজেই মার্কিন হামলা সামলে নিয়েছে।

গোথেইমার বলেন, ‘ইরান সরকার নিজের জনগণের ভোগান্তি নিয়ে কোনো তোয়াক্কা করে না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক বোমাবর্ষণ উভয়ের বিরুদ্ধেই তারা অটুট থাকতে পেরেছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এসব ভাবনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ভুল ভাবনাও অনেক সময় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে লড়াইয়ে কোন পক্ষকে এগিয়ে দিতে পারে।

সাইবার লড়াইয়ের নতুন ফ্রন্ট

সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি বড় আকারে সাইবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা যায়, গত জুলাইয়ের শেষের দিকে আমেরিকার ১০০টির বেশি সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাইবার হামলা (সাইবার অ্যাটাক) চালানো হয়েছিল। অনেক জায়গায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে পানি ফুটিয়ে খাওয়ার সতর্কতা জারি করেছিল স্থানীয় প্রশাসন।

মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করেন ইরানি হ্যাকাররা এই হামলার সঙ্গে যুক্ত। আমেরিকার তেল ও গ্যাস সংক্রান্ত অবকাঠামোর ওপরও ইরানি হ্যাকাররা নজর রাখছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

যুদ্ধের প্রথম দিকে ধাক্কা খেলেও ইরানি হ্যাকাররা নতুন শক্তিতে সংগঠিত হয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট সাইবার হামলা চালিয়ে আমেরিকার জনমনে অস্থিরতা তৈরি করাই তেহরানের লক্ষ্য। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন সাধারণ মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে।

ইরানি হ্যাকারদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সাবেক মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স অরলিন্স বলেন, ‘ইরানি হ্যাকাররা এখন নিজেদের শক্তিশালী মনে করছে। সাইবার হামলা পুরোপুরি সফল না হলেও তা সাধারণ মানুষের ধৈর্য নষ্ট করে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ায়।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত