যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ

আট তেল কোম্পানি মিনিটে মুনাফা করেছে ৭ লাখ ডলার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২৮
সরবরাহ-সংকটে-বড়-মুনাফা-জায়ান্ট-তেল-কোম্পানিগুলোর। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’। বাংলা প্রবাদের সফল বাস্তবায়ন করেছে বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধকে পুঁজি করে তারা মুনাফার পাহাড় গড়েছে।

ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আটকে রাখার প্রভাবে তেলের সরবরাহ সংকটে পড়েছে বিশ্ব। এতে স্পট মার্কেটে হু হু করে বেড়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য, যা থেকে মোটা অঙ্কের মুনাফা ঘরে তুলেছে বহুজাতিক শীর্ষ কোম্পানিগুলো।

গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ, বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি বড় তেল কোম্পানি সবশেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ লাইনে স্থবিরতায় ভোক্তারা ভুগলেও, এই সংকটে শীর্ষ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ করেছে।

বিশ্বে সমুদ্রপথে মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালিতে। প্রতিদিন দুই কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হয় এই নৌপথে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই ‘চেক পয়েন্ট’ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে তেলের দর ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

দক্ষিণ এশিয়াতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। একই সময়ে পাকিস্তান, ভারত ও উত্তর-পশ্চিম চীনে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

ফুলে-ফেঁপে ওঠা বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলো হলো– সৌদি আরবের আরামকো, যুক্তরাজ্যের বিপি ও শেল, নরওয়ের ইকুইনর, ফ্রান্সের টোটাল এনার্জিস, ইতালির এনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন ও এক্সনমোবিল।

গার্ডিয়ান জানায়, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এই আট প্রতিষ্ঠান প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। এর সুবাদে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজার মূলধনের পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার বেড়ে ৩ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

এই যে সাধারণ মানুষের দুর্দশার বিপরীতে অতিরিক্ত মুনাফা করছে কোম্পানিগুলো, সেখান থেকে একটি অংশ দিয়ে সবুজ রূপান্তরের জন্য তহবিল গঠন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষতি মোকাবিলার দাবি উঠেছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া ইতিহাসের ভয়াবহতম তাপপ্রবাহের পেছনে তেল কোম্পানিগুলোর বড় দায় রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রাণঘাতী দাবদাহের সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক কোম্পানিগুলোর সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। সেই বিশ্লেষণে বলা হয়, শীর্ষ ১৪টি তেল কোম্পানির যেকোনো একটি এককভাবেই ৫০টির বেশি তাপপ্রবাহের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট থেকে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। অথচ এর মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একদিকে তেল ও বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

ফুলে-ফেঁপে ওঠা বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলো হলো– সৌদি আরবের আরামকো, যুক্তরাজ্যের বিপি ও শেল, নরওয়ের ইকুইনর, ফ্রান্সের টোটাল এনার্জিস, ইতালির এনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন ও এক্সনমোবিল।

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো। এই সময়ে কোম্পানিটির নিট আয় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। ইরান ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও এই আয়ই বলে দেয়– তেলের দরবৃদ্ধি তাদের জন্য কতটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। অথচ এই আরামকো ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী কোম্পানিগুলোর তালিকায় শীর্ষে। কার্বন মেজরস ডেটাবেজ অনুযায়ী শেভরন, এক্সনমোবিল, শেল ও বিপিও এই তালিকার শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে রয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে লাভবান হওয়া আরেক অয়েল জায়ান্ট বিপি। ব্রিটিশ কোম্পানিটি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৫৭৩ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের প্রান্তিকের দ্বিগুণের বেশি। অথচ সম্প্রতি কোম্পানিটি সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। তাদের বার্ষিক জ্বালানি রূপান্তর বাজেট ৫০০ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলারে নামানো হয়েছে।

বিপি এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে সামুদ্রিক বায়ুবিদ্যুৎ খাতে তাদের ব্যবসা মূল প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্পদ বিক্রি করেছে। আরও কিছু ব্যবসা বিক্রির আলোচনা চলছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল উইটনেসের জীবাশ্ম জ্বালানিবিষয়ক প্রধান প্যাট্রিক গ্যালে বলেছেন, বিপির আকাশচুম্বী মুনাফা আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছে, তারা মানুষের সংকট কাজে লাগিয়ে নিজেদের পকেট ভরছে। দাবানল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে, খরা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, সাধারণ মানুষ জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ভুগছে। আর কোম্পানিগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের পোর্টফোলিও ভারী করছে।

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সৌদি আরবের আরামকো। কোম্পানিটির নিট আয় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। অথচ আরামকো ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী।

তাঁর মতে, তেল কোম্পানিগুলোর উচিত হবে পরিবেশের যে ক্ষতি তারা করেছে, তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ করা। গ্যালে বলেন, ‘চিন্তা করতেই অবাক লাগে, তারা যদি তাদের ন্যায্য করটুকু পরিশোধ করত, তাহলে আরও কত বন্যা ও দাবানল প্রতিরোধ ব্যবস্থা নির্মাণ করা যেত! কতগুলো সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানো যেত!’

একই ধরনের কথা বলেছেন ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থের হেড অব ক্যাম্পেইন রোজি ডাউনিসও। তিনি বলেন, একদিকে কোটি কোটি মানুষকে জ্বালানি ও বিদ্যুতের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। একদিকে, জলবায়ু সংকট বাড়তে বাড়তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের মুনাফা ঘরে তুলছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি প্রকাশ্যে সমালোচনা করে বলেছেন, তেল কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা করছে। প্রয়োজন হলে সেই লাভের একটি অংশ জনগণের স্বার্থে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে, চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে যে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ খরা ও দাবানল দেখা দিয়েছে, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া এমন ঘটনা অনেকগুলো ঘটার সম্ভাবনা কম ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, চরম গরমে ইউরোপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। খরার কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ টন শস্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিপির আকাশচুম্বী মুনাফা আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছে, তারা মানুষের সংকট কাজে লাগিয়ে নিজেদের পকেট ভরছে। প্যাট্রিক গ্যালে, গ্লোবাল উইটনেসের জীবাশ্ম জ্বালানিবিষয়ক প্রধান

ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে দাবানলে কয়েকশ কোটি ইউরোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও আফ্রিকার বিভিন্ন অংশেও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। একই সময়ে পাকিস্তান, ভারত ও উত্তর-পশ্চিম চীনে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেছেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত