ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিবেদন
তনভিয়া বড়ুয়া

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও উত্তেজনা। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির উদ্যোগ, অন্যদিকে সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ ও ‘পুশইন’ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন কেবল আইনশৃঙ্খলা বা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্ত রয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম স্থল সীমান্তগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। বহু দশক ধরেই এই সীমান্ত দিয়ে বৈধ ও অবৈধ দু'ধরনেরই মানুষের চলাচল হয়েছে। দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, অভিবাসন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সামাজিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এই সীমান্ত কখনওই শুধু কাঁটাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।
রয়টার্সের ৪ জুনের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করেছে ভারত একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি দাবি করেছে, গত কয়েক সপ্তাহে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে এবং তারা বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি। তবে সীমান্তে নজরদারি এবং টহল বাড়ানোর কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর আগেই ২৬ মে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরেকটি বলা হয়েছিল, ভারত মে মাসে ঢাকার কাছে ২,৮৬০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করে।
২৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের Foreigners’ Branch একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করে। সেখানে বলা হয়, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় 'হোল্ডিং সেন্টার' তৈরি করতে হবে। এই কেন্দ্রগুলিতে রাখা হবে এমন ব্যক্তিদের, যাদের 'apprehended foreigners' বা সন্দেহভাজন বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে অথবা যাঁদের পরিচয় যাচাই সম্পূর্ণ হয়নি। ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’—এই নীতিকে সামনে রেখেই রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার কাজও শুরু হয়েছে।
সরকারি ভাষায় এগুলো ‘হোল্ডিং সেন্টার’। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, নাম আলাদা হলেও কার্যত এগুলি ডিটেনশন সেন্টারের মতোই কাজ করতে পারে। বিশেষ করে আসমের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টেনে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এই বিতর্কের শিকড় রয়েছে কেন্দ্রের নীতিতেও। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের Foreigners’ Division ২০২৫ সালে যে নির্দেশিকা জারি করেছিল, সেখানে সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের স্বার্থে ৩০ দিন পর্যন্ত হোল্ডিং সেন্টারে রাখার কথা বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে তথ্য আপলোড এবং জেলা প্রশাসনের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং 'ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা ও বক্তব্যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অনুপ্রবেশের প্রভাব নিয়ে কড়া অবস্থানের কথা বলেছেন।
সম্প্রতি তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “আমি অনুপ্রবেশকারীদের স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলতে চাই, সময় থাকতে এবার নিজে থেকেই তোমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাও, অন্যথায় কঠোর আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।”
এই সময়-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২৬ মে পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় দু’হাজার বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যাঁদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তাঁদের প্রথমে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। পরে বিএসএফের মাধ্যমে তাঁদের প্রত্যর্পণ বা ‘পুশব্যাক’-এর ব্যবস্থা করা হবে।
কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে পরিচয় যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ সরকারও একই অবস্থান নিয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করিয়ে দিয়েছে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অবৈধভাবে অন্য দেশে বসবাস করলে সংশ্লিষ্ট দেশ সরকারি চ্যানেলে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাই করতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই তারপর প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা সম্ভব। কিন্তু তাদের দাবি, ভারত সরকারের তরফে এখনও তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা পাঠানো হয়নি।
এদিকে সীমান্তের পরিস্থিতি আরও জটিল।
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত এখন এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। কয়েকশো মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছেন, যাঁদের অনেকেই নিজেদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ তিন বছর, কেউ পাঁচ বছর, আবার কেউ তারও বেশি সময় ধরে ভারতে বসবাস করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার এবং প্রশাসন আর ভারতে থাকতে দিচ্ছে না, তাই তাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যেতে চান।
ঘটনাটি নতুন নয়। গত বছর ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরুর পরও একইভাবে বহু মানুষ হাকিমপুর সীমান্তে জড়ো হয়েছিলেন। তখনও অনেকে দাবি করেছিলেন যে তাঁরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তিরাই নয়, যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে, তাঁদেরও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
এই অবস্থায় সীমান্তে কার্যত এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যাঁদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
বাংলাদেশের অভিযোগ, বিএসএফ একাধিক ক্ষেত্রে জোর করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করেছে। বিজিবি দাবি করেছে, বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে এমন একটি প্রচেষ্টা তারা রুখে দিয়েছে। সীমান্তে সতর্কতা বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় প্রশাসন সরকারিভাবে কিছু জানায়নি।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক হওয়া ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় জেলা পুলিশ। পরে বিএসএফ এবং বিজিবির আলোচনার ভিত্তিতে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। মুর্শিদাবাদের লালগোলায় পদ্মা ভবনে ইতোমধ্যেই নাকি একটি আটক শিবির বা হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে আটক হওয়া সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের সেখানে রাখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই আসামের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করছেন। আসামে ১৯৭১ সালের পর থেকে অনুপ্রবেশ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি ছিল NRC বা National Register of Citizens। ২০১৯ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ে।
যদিও নাম বাদ পড়া মানেই বিদেশি ঘোষিত হওয়া নয়, তবুও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, আদালত এবং আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ বহু মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। কারণ এই রাজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে উদ্বাস্তু ও অভিবাসনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
দেশভাগ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু আগমন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ পশ্চিমবঙ্গে বসতি গড়েছেন। তাঁদের অনেকের কাছেই আজও পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র নেই।
ফলে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নটি এখানে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্নও।
এই প্রেক্ষাপটে Citizenship Amendment Act বা CAA-ও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আইনটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বের পথ সহজ করেছে। সমর্থকদের মতে এটি নিপীড়িত উদ্বাস্তুদের সুরক্ষা দেয়। সমালোচকদের মতে, এটি নাগরিকত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ডেকেন হেরাল্ড এবং আউটলুক-এর প্রতিবেদনগুলিতেও উঠে এসেছে, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে।
বাংলাদেশ বলছে, সীমান্তে ‘পুশইন’ হচ্ছে। ভারত বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যর্পণ করা হচ্ছে। বাস্তবে এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন, যাঁদের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি আর শুধুমাত্র ‘পুশব্যাক’ বা ‘পুশইন’-এর নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কী ভাবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করবে, কীভাবে সন্দেহভাজন বিদেশিদের পরিচয় যাচাই করবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখবে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও উত্তেজনা। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির উদ্যোগ, অন্যদিকে সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ ও ‘পুশইন’ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন কেবল আইনশৃঙ্খলা বা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্ত রয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম স্থল সীমান্তগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। বহু দশক ধরেই এই সীমান্ত দিয়ে বৈধ ও অবৈধ দু'ধরনেরই মানুষের চলাচল হয়েছে। দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, অভিবাসন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সামাজিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এই সীমান্ত কখনওই শুধু কাঁটাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।
রয়টার্সের ৪ জুনের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করেছে ভারত একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি দাবি করেছে, গত কয়েক সপ্তাহে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে এবং তারা বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি। তবে সীমান্তে নজরদারি এবং টহল বাড়ানোর কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর আগেই ২৬ মে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরেকটি বলা হয়েছিল, ভারত মে মাসে ঢাকার কাছে ২,৮৬০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করে।
২৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের Foreigners’ Branch একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করে। সেখানে বলা হয়, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় 'হোল্ডিং সেন্টার' তৈরি করতে হবে। এই কেন্দ্রগুলিতে রাখা হবে এমন ব্যক্তিদের, যাদের 'apprehended foreigners' বা সন্দেহভাজন বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে অথবা যাঁদের পরিচয় যাচাই সম্পূর্ণ হয়নি। ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’—এই নীতিকে সামনে রেখেই রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার কাজও শুরু হয়েছে।
সরকারি ভাষায় এগুলো ‘হোল্ডিং সেন্টার’। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, নাম আলাদা হলেও কার্যত এগুলি ডিটেনশন সেন্টারের মতোই কাজ করতে পারে। বিশেষ করে আসমের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টেনে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এই বিতর্কের শিকড় রয়েছে কেন্দ্রের নীতিতেও। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের Foreigners’ Division ২০২৫ সালে যে নির্দেশিকা জারি করেছিল, সেখানে সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের স্বার্থে ৩০ দিন পর্যন্ত হোল্ডিং সেন্টারে রাখার কথা বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে তথ্য আপলোড এবং জেলা প্রশাসনের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং 'ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা ও বক্তব্যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অনুপ্রবেশের প্রভাব নিয়ে কড়া অবস্থানের কথা বলেছেন।
সম্প্রতি তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “আমি অনুপ্রবেশকারীদের স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলতে চাই, সময় থাকতে এবার নিজে থেকেই তোমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাও, অন্যথায় কঠোর আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।”
এই সময়-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২৬ মে পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় দু’হাজার বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যাঁদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তাঁদের প্রথমে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। পরে বিএসএফের মাধ্যমে তাঁদের প্রত্যর্পণ বা ‘পুশব্যাক’-এর ব্যবস্থা করা হবে।
কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে পরিচয় যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ সরকারও একই অবস্থান নিয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করিয়ে দিয়েছে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অবৈধভাবে অন্য দেশে বসবাস করলে সংশ্লিষ্ট দেশ সরকারি চ্যানেলে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাই করতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই তারপর প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা সম্ভব। কিন্তু তাদের দাবি, ভারত সরকারের তরফে এখনও তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা পাঠানো হয়নি।
এদিকে সীমান্তের পরিস্থিতি আরও জটিল।
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত এখন এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। কয়েকশো মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছেন, যাঁদের অনেকেই নিজেদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ তিন বছর, কেউ পাঁচ বছর, আবার কেউ তারও বেশি সময় ধরে ভারতে বসবাস করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার এবং প্রশাসন আর ভারতে থাকতে দিচ্ছে না, তাই তাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যেতে চান।
ঘটনাটি নতুন নয়। গত বছর ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরুর পরও একইভাবে বহু মানুষ হাকিমপুর সীমান্তে জড়ো হয়েছিলেন। তখনও অনেকে দাবি করেছিলেন যে তাঁরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তিরাই নয়, যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে, তাঁদেরও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
এই অবস্থায় সীমান্তে কার্যত এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যাঁদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
বাংলাদেশের অভিযোগ, বিএসএফ একাধিক ক্ষেত্রে জোর করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করেছে। বিজিবি দাবি করেছে, বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে এমন একটি প্রচেষ্টা তারা রুখে দিয়েছে। সীমান্তে সতর্কতা বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় প্রশাসন সরকারিভাবে কিছু জানায়নি।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক হওয়া ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় জেলা পুলিশ। পরে বিএসএফ এবং বিজিবির আলোচনার ভিত্তিতে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। মুর্শিদাবাদের লালগোলায় পদ্মা ভবনে ইতোমধ্যেই নাকি একটি আটক শিবির বা হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে আটক হওয়া সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের সেখানে রাখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই আসামের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করছেন। আসামে ১৯৭১ সালের পর থেকে অনুপ্রবেশ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি ছিল NRC বা National Register of Citizens। ২০১৯ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ে।
যদিও নাম বাদ পড়া মানেই বিদেশি ঘোষিত হওয়া নয়, তবুও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, আদালত এবং আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ বহু মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। কারণ এই রাজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে উদ্বাস্তু ও অভিবাসনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
দেশভাগ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু আগমন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ পশ্চিমবঙ্গে বসতি গড়েছেন। তাঁদের অনেকের কাছেই আজও পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র নেই।
ফলে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নটি এখানে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্নও।
এই প্রেক্ষাপটে Citizenship Amendment Act বা CAA-ও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আইনটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বের পথ সহজ করেছে। সমর্থকদের মতে এটি নিপীড়িত উদ্বাস্তুদের সুরক্ষা দেয়। সমালোচকদের মতে, এটি নাগরিকত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ডেকেন হেরাল্ড এবং আউটলুক-এর প্রতিবেদনগুলিতেও উঠে এসেছে, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে।
বাংলাদেশ বলছে, সীমান্তে ‘পুশইন’ হচ্ছে। ভারত বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যর্পণ করা হচ্ছে। বাস্তবে এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন, যাঁদের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি আর শুধুমাত্র ‘পুশব্যাক’ বা ‘পুশইন’-এর নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কী ভাবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করবে, কীভাবে সন্দেহভাজন বিদেশিদের পরিচয় যাচাই করবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখবে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠনে জব্দ করা ইরানি সম্পদ ব্যবহারের চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের বরাতে এমন তথ্য দিয়েছে সিএনএন।
১১ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলায় লেবাননে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। শনিবার দেশটিতে বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন বিগ্রেডিয়ার জেনারেলসহ অন্তত ১২ জন। অথচ কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দেশ দুটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। খবর আল-জাজিরার।
১১ ঘণ্টা আগে
ইরান শক্তিশালী ও অহংকারী হওয়ায় এখনো শান্তি চুক্তিতে সই করেনি বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, শেষ পর্যন্ত চুক্তি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাঁদের।
১ দিন আগে
মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির আশঙ্কায় মিত্রদেশটিকে ‘চরম’ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার (৬ জুন) এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
১ দিন আগে