'পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের’ তীব্রতায় জ্বলছে ইউরোপের দাবানল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪: ০৪
গত ২৩ জুলাই ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ল্য পর্জ এলাকায় দাবানল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন দমকলকর্মীরা। ছবি : এএফপি

ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল এখন আর শুধু মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং নতুন এক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষায়, এসব দাবানল এখন এতই তীব্র যে, এর শক্তি ‘কয়েকটি পারমাণবিক বোমার’ সমান।

ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস ও তুরস্কে একের পর এক দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। কোথাও কোথাও আগুনের ধোঁয়ায় বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়ে দাবানল আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দাবানলে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে দাবানলে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা। চলমান পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেন, ‘এমন মারাত্মক দাবানল ফ্রান্স আগে কখনো দেখেনি।’

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বোর্দোর কাছে জিরন্দ অঞ্চলে দাবানলের তাপ থেকে ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ নামে বিরল অগ্নি মেঘ তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত তীব্র দাবানল থেকে সৃষ্ট এ মেঘ নিজেই বাতাস, বজ্রপাত এমনকি নতুন আগুনেরও জন্ম দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা দেখা গেলেও ইউরোপে এটি অত্যন্ত বিরল।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশে দাবানলের ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। ২৭ জুলাই উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি। ছবি : নাসা ওয়ার্ল্ডভিউ
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশে দাবানলের ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। ২৭ জুলাই উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি। ছবি : নাসা ওয়ার্ল্ডভিউ

স্পেনেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে আভিলা প্রদেশের দাবানল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানলে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেন- দুই দেশই আগুন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছে। এ পর্যন্ত দেশ দুটিতে তিন লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বাসিন্দারা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন।

এদিকে, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে দাবানল নেভাতে গিয়ে দুই দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। প্রবল বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে রেথিমনো অঞ্চলের কয়েকটি বসতি খালি করে দেওয়া হয়েছে। তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মুগলা প্রদেশেও বন ও কৃষিজমিতে দাবানলের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

গত ২৬ জুলাই মাদ্রিদের পশ্চিমে সান মার্তিন দে ভালদেইগলেসিয়াস এলাকায় দাবানল নিয়ন্ত্রণে আকাশ থেকে পানি ছিটাচ্ছে একটি উড়োজাহাজ। ছবি : এএফপি
গত ২৬ জুলাই মাদ্রিদের পশ্চিমে সান মার্তিন দে ভালদেইগলেসিয়াস এলাকায় দাবানল নিয়ন্ত্রণে আকাশ থেকে পানি ছিটাচ্ছে একটি উড়োজাহাজ। ছবি : এএফপি

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে দাবানলের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গত শীতে অতিবৃষ্টির কারণে প্রচুর গাছপালা জন্মেছিল। পরে টানা তাপপ্রবাহে সেগুলো শুকিয়ে গিয়ে দাবানলের জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে ‘হুইপল্যাশ ইফেক্ট’ নামে বর্ণনা করছেন।

স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব লেইডার বন ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ভিক্টর রেসকো দে দিয়োস বলেন, ‘আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে কিছু দাবানল আর নেভানো সম্ভব হয় না। এগুলো কয়েকটি পারমাণবিক বোমার সমান তীব্রতায় জ্বলে।’

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো না গেলে ইউরোপে এমন ভয়াবহ দাবানল আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়ংকর রূপে ফিরে আসবে। তাঁদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার মতো লাখ লাখ হেক্টরজুড়ে দাবানল ইউরোপেও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

সূত্র : সিএনএন, আনাদোলু এজেন্সি

Ad 300x250

সম্পর্কিত