সংকটকালে আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে সোলার পাম্প, খরচও কম

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চুয়াডাঙ্গা

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৫৪
চুয়াডাঙ্গায় সোলার প্যানেল। স্ট্রিম ছবি

জ্বালানি সংকট ও তীব্র লোডশেডিংয়ের এই সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের স্থাপিত এই পাম্প দ্বারা ডিজেল বা বিদ্যুতের ঝামেলা ছাড়াই সহজে জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে। এরফলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে সেচ খরচও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গায় মোট চাষযোগ্য আবাদি জমির পরিমাণ ৯৯ হাজার ১২০ হেক্টর। এ বছর বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ৩৫ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। আর দু-এক মাস পর এই বোরো ধান কৃষকের ঘরে উঠবে। মাঠে মাঠে এখন বোরো ধানের শীষে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। তবে এই সময়ের ডিজেল সংকট ও তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। ঠিক এ সময় কৃষকদের আশীর্বাদ হয়ে সামনে এসেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প। এতে যেমন সেচের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, তেমনি কমেছে সেচ খরচ। এতে কৃষকেরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সৌরবিদ্যুৎচালিত ৫১টি সেচ পাম্পের আওতায় কৃষিজমির পরিমাণ ৩০৬ হেক্টর।

ফসলের মাঠে সোলার প্যানেল। স্ট্রিম ছবি
ফসলের মাঠে সোলার প্যানেল। স্ট্রিম ছবি

অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের আওতায় সৌর সেচ প্রকল্প রয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদরে ১৫টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় তিনটি, দামুড়হুদা উপজেলায় পাঁচটি এবং জীবননগর উপজেলায় ৩১টি। মোট ৫৪টি সৌর সেচ প্রকল্পের আওতায় কৃষিজমির পরিমাণ ৬ হাজার হেক্টর।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, চুয়াডাঙ্গাসহ মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায় তাদের মোট সৌর সেচ প্রকল্পের সংখ্যা ১২৮টি, যার আওতায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন।

উপকারভোগী কৃষকেরা জানান, বোরো ধানের জন্য নিয়মিত সেচ প্রয়োজন হয়। ধানের গোড়ায় প্রায় সবসময় পানি রাখতে হয় এবং একদিন পরপর সেচ দিতে হয়। কিন্তু বর্তমানে ডিজেল সংকটের কারণে সেচে সমস্যা হচ্ছে। এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প তাদের ভরসা হয়ে উঠেছে।

সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পে তোলা পানি। স্ট্রিম ছবি
সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পে তোলা পানি। স্ট্রিম ছবি

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। সেখানে প্রতি বিঘায় উৎপাদন হয় গড়ে ২৩ থেকে ২৫ মণ ধান। ডিজেলে সেচ দিলে খরচ হতো বছরে প্রায় ৬ হাজার টাকা, যা সোলার পাম্প ব্যবহারে কমে প্রায় ৩ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। ভুট্টা আবাদেও প্রতি বিঘায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচে সোলার পাম্পে ভালোভাবে সেচ দেওয়া যাচ্ছে। এতে খরচ কমছে এবং দুশ্চিন্তাও কমছে।

সদর উপজেলার শৈলগাড়ি গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘এই ডিজেল সংকটের মুহূর্তে আমরা বোরো ধানে সেচ দিচ্ছি সৌরবিদ্যুতের পাম্পে। এতে সেচ খরচ অনেক কমছে। ধান ও ভুট্টায় বিঘায় সেচ খরচ অর্ধেক নিচে নামে। এতে ফসল উৎপাদনের খরচ কমছে। লাভও পাচ্ছি। ফসল উৎপাদনও ভালো পাচ্ছি।’

মোমিপুর গ্রামের কৃষক শাহিন আলী বলেন, ‘সময় কম লাগছে, আবার ডিজেল তেল লাগছে না। দুর্ভোগ ভোগান্তি ছাড়াই সোলার পাম্পে জমিতে সেচ দিচ্ছি। মোমিনপুর গ্রামের মাঠে প্রায় ১২০ বিঘে জমিতে সোলার পাম্পের সাহায্যে সেচ দেওয়া হয়। এতে চাষিদের অনেক সুবিধা হয়।’

সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পে তোলা পানি। স্ট্রিম ছবি
সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পে তোলা পানি। স্ট্রিম ছবি

আরেক কৃষক রোকন হোসেন বলেন, ‘পাম্পে গিয়ে ডিজেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। তেল না পেলে জমিতে সেচ দিতে পারবো না এই চিন্তা থেকে মুক্ত আছি। সোলার পাম্পে সেচের কোনো ঘাটতি নেই। এতে ধানের ভালো ফলন হয়।’

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার স্ট্রিমকে বলেন, ‘একদিকে ডিজেল সংকট, অন্যদিকে লোডশেডিং। এই সংকটের মুহূর্তে কৃষকেরা সোলার পাম্পের সাহায্যে জমিতে সেচ দিতে পারছেন। এতে চাষের খরচের পরিমাণ কমছে। ফলে কৃষকরা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পানি দিতে পারছে ফসলে। তবে কৃষকদের কৃষি বিভাগ বিভিন্নভাবে উদ্ভুদ্ধ করছে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প আরও সম্প্রসারণ করা হয়। এতে কৃষি খাতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আছে।’

সম্পর্কিত