জ্বালানি খাতে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ দেওয়ার অভিযোগ জামায়াতের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৫৯
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লোগো। ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আশঙ্কা, প্রতিযোগিতা তৈরির নামে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানির বাজার তুলে দেওয়া হতে পারে।

শনিবার (৮ আগস্ট) বিকালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়। সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে দলটি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

লিখিত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জ্বালানি খাত সংস্কারের বদলে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে এই খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

তার মতে, এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স। বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে—সরকারের এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। পরওয়ার বলেন, ‘এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংকার টার্মিনাল ও পাইপলাইন পরিচালনার পাশাপাশি বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে। এতে রাষ্ট্রীয় মনোপলি ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। এক্ষেত্রে গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অবশ্য তার আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবলই বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়। এটি মূলত বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফল। জ্বালানিমন্ত্রী নিজেও সংসদে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর লক্ষ্য থেকেই বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে।

সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অভিযোগ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

পরওয়ার বলেন, দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার আড়ালে স্বচ্ছতা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিকরণের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতছাড়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল সাধারণ পণ্য নয়। বরং কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অলাভজনক দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানি নেবে কিনা, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে এমনটি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, এর মাধ্যমে জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনের জামায়াত তাদের লিখিত বক্তব্যে নিজেদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের মতামতও তুলে ধরেছে। দলটির অবস্থান শুধুই বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এমন দাবি করে গোলাম পরওয়ার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামত তুলে ধরেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত