পোড়ার চরে এবার জুটবে না মাংস

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কুড়িগ্রাম

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ২০: ০৪
কুড়িগ্রামের বিচ্ছিন্ন পোড়ার চরে ঘর আগলে বসে আছেন এক দম্পতি। স্ট্রিম ছবি

কুড়িগ্রাম সদরের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যে গড়ে উঠেছে ‘পোড়ার চর’। এখানে শতাধিক পরিবারের অন্তত চার শ লোকের বাস। তাঁদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে বছরে দুই-তিনবার নদী ভাঙার ইতিহাস। পোড়ার চরে নেই কোনো প্রস্তুতি।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব হাকিম খান বলেন, ‘আগের বছর কিস্তি তুললোং (তুলেছি) ৪০ হাজার টেকা, হেই কিস্তির টেকা শোধ করার নাগি ফির কিস্তি তুললোং ১২ হাজার টেকার। প্রতি সপ্তাহে এলা কিস্তি ৩ হাজার। এপাহে নাই কোনো কাজ-কাম, গাঙ্গে মাছও কম। সোজ মাছ কারেন্ট জালে খাইছে। দুই মাইনষে (দুজনে) কোনো রকমে খায়া-পড়ি চলি। জীবন বাঁচে না, ফির ঈদ!’

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত পোড়ার চর। শহর থেকে সেখানে যেতে প্রথমে ১১ কিলোমিটার সড়কপথ। তারপর নদে ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় ৪০ মিনিটের পথ পারি দিতে হয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ২০ থেকে ২৫ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদের গড়ে ওঠে এই চর। গত বছর এই চরে অনুদানে একটি মাত্র গরু কোরবানি হয়েছে। চরের সব পরিবারের পাতে পৌঁছায়নি সেই মাংস। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কেউ কোরবানির সিদ্ধান্ত নেয়নি।

পোড়ার চরের প্রতিটি পরিবারের আছে বছরে দুই-তিনবার বাড়ি ভাঙার ইতিহাস। স্ট্রিম ছবি
পোড়ার চরের প্রতিটি পরিবারের আছে বছরে দুই-তিনবার বাড়ি ভাঙার ইতিহাস। স্ট্রিম ছবি

স্থানীয় বাসিন্দার বাইরে শহর থেকে বেশি লোকজন যান না পোড়ার চরে। সম্প্রতি সেখানে যান স্ট্রিম সংবাদদাতা। ব্রহ্মপুত্রের এই চরের ২৫ থেকে ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ভাঙা-গড়া আর অভাবের গল্প। সবার কাছে প্রায় একই কথা— ঈদে উৎসব তাদের কাছে এক বিলাসিতা, তাতে গা ভাসান না কেউই।

চরে শহর থেকে লোক এসেছে শুনে ছুটে আসেন মো. শাহ আলম (৪৫)। তিনিই ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পেশাও কৃষিকাজ। তার ঘরে ৪ মেয়ে আর ২ ছেলে। ঈদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই জালালের সোজা জবাব ‘জীবনই বাঁচে না আবার ঈদ। এখন পর্যন্ত যে কতবার বাড়ি ভাঙ্গছি, কে জানে। চরে কোনো ঈদগাহ নেই ঈদের নামাজ পড়ি একবার এই জমিতে আর একবার ঐ জমিতে।’

নদের ভাঙানের শিকার এক পরিবারের প্রধান মো. রাজু মিয়ার (৩৫) পেশা কৃষিকাজ। তাঁর দুই ছেলে, এক মেয়ে। সবাই নাবালক। তাঁর জীবনের অন্যতম সমস্যা নদের ভাঙন। গত ২ বছরে তিনি ভিটেমাটি হারিয়েছেন তিনবার। সদ্য বানানো চালা ঘর দেখিয়ে তিনি জানান, ধারদেনা ও গরু বিক্রি করে তুলেছেন। এজন্য মাটি কেটে উঁচু করতে ১৫ হাজার টাকা ও ঘর তোলা বাবদ আরও ৫৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই বাড়িটিই এখন নদের পাড়ে। যেকোনো দিন এটাও ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায় তিনি।

পোড়ার চরের মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। স্ট্রিম ছবি
পোড়ার চরের মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। স্ট্রিম ছবি

ঈদ নিয়ে জানতে চাইলেই হতাশ কণ্ঠে রাজু মিয়া বলেন, ‘আমাদের আর ঈদ, নদেই সব নিয়ে যায়। এখানে কেউ গরু কোরবানি দেয় না। গতবার একটা দিয়েছে, মাংস পেয়েছে দুই কি তিন টুকরা। ওই মাংস খাওয়া না খাওয়া সমান।’ এবার ঈদে কেউ কোরবানি দিবে কি না তিনি জানেন না।

এই চরের একমাত্র মসজি মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. দেওবর মণ্ডল (৫০) জানান, ২০ বছর ধরে মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ঈদ নিয়ে বাড়তি তার কোনো প্রস্তুতি নেই। তিনি জানালেন, এই চরে ঈদের দিন ও অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই। এখানে তেমন কোনো আয়োজন থাকে না। এখন পর্যন্ত কেউ কোরবানি দেবেন বলে জানেন না তিনি।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, প্রতি বছর তাঁর ইউনিয়নের চরগুলোর জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে ৮-১০টি গরু আসে। সেগুলো চরেই কোরবানি ও মাংস বিলি বণ্টন হয়। তবে এবার তেমন একটি গরুও আসেনি এখন পর্যন্ত। সরকারি পর্যায় থেকে কেউ খোঁজও নেয়নি।

পোড়ার চরে কৃষিপণ্য পরিবহনে ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। স্ট্রিম ছবি
পোড়ার চরে কৃষিপণ্য পরিবহনে ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। স্ট্রিম ছবি

কারণ হিসেবে আব্দুল গফুর বললেন, ‘মানুষের হাতের অবস্থা খারাপ। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। এই জন্য মনে হয় কেউ এবার দানের গরু দেয়নি।’

লেখক নাহিদ হাসান বলেন, কুড়িগ্রামের হাটগুলোতে যে গরু ওঠে, সেগুলো মূলত চরেরই গরু। তবুও চরে কেন কোরবানি হয় না, এটা একটা প্রশ্ন। তা ছাড়া চরে এজমালি চারণভূমি কমে গেছে। যেহেতু চরের মানুষকে গো-খাদ্য কিনে খাওয়াতে হয়, তাই অনেকে কোরবানি থেকে পিছপা হয়।

সম্পর্কিত