ব্রহ্মপুত্রে ৮বার ঘরহারা দম্পতি, মরলে মাটি দিব কনে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
জামালপুর

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২২
শেষ আশ্রয়টুকু ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে অশীতিপর দম্পতি। স্ট্রিম ছবি
শেষ আশ্রয়টুকু ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে অশীতিপর দম্পতি। স্ট্রিম ছবি

দরজার পাশে পুরোনো কাঠের পিঁড়িতে বসে অশীতিপর চন্দ্রা বানু। পাশে তাঁর স্বামী আলমাস প্রামাণিক (৯০)। দুজনেই জানেন, মাথার ওপর টিনের যে ঘর, সেটি হয়তো টিকবে কয়েকটা দিন। কারণ, আঙিনা থেকে কয়েক হাত দূরে ব্রহ্মপুত্র।

প্রতিদিন একটু একটু করে নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতঘর ও ফসলি জমি। এরই মধ্যে চলে গেছে আলমাসের রান্নাঘরের একাংশ। ঘরের এক পাশে বসে নিজেদের শেষ আশ্রয়টুকু ভেঙে যেতে দেখছেন এই দম্পতি।

তাদের মতো অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা এখন ভাঙনের হুমকিতে। ব্রহ্মপুত্র নদের দুই পাড়ে জামালপুরের ইসলামপুরের লক্ষ্মীপুর গ্রামের প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় এক মাস ধরে ভাঙন চলছে।

৯ সন্তানের আলমাস-চন্দ্রা এরইমধ্যে ৮ বার ঘর হারিয়েছে। প্রতিবারই নতুন করে ঘর তুলেছেন, নদী তা কেড়ে নিয়েছে। শেষ সম্বল হারানোর ঝুঁকিতে চন্দ্রা বানুর চোখে পানি, ‘এক বছরই তিন ভাঙা দিছে। ওহন থিকা ওই বাত্তে যাই, ওই বাত্তে থিকা ওই বাত্তে যাই, ওহনেই যায় নদী। ভাইঙ্গা-চুইড়া এডাই আইছি। এডাই অল্প একটু জমি। দুই ঘরে থাকি। এহন জমি গেল গা, ঘরও গেল গা। আমরা এহন থাকমু কনে?

কিছুক্ষণ চুপ। বিলাপের সুরে চন্দ্রা আবার বলেন, ‘বুড়া মানুষ আমরা, কাল ফুরায়া গেছে। কহন মরি, কহন বাঁচি। আমরা মরলে কালা মাটি দিব কনে, আর জাগাডা নাই। এই যে যাইতেছে গা। তাইলে বাড়িডা যদি যায়, তাইলে আমরা কই থাকমু? এহন থাকার ব্যবস্থা নাই, মরলেও থাকার ব্যবস্থা নাই।’

স্ত্রীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আলমাস অসহায়ত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আটবার বাড়ি ভাঙছি। এহন তো জমি নাই। কই বাড়ি করি, কি খাই না খাই, কই গরু-বাছুর থুই—কোনো ঠিকানা নাই। ’

জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের দুই পাড়ে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। স্ট্রিম ছবি
জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের দুই পাড়ে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। স্ট্রিম ছবি

স্থানীয়দের ভাষ্য, এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েক একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের হুমকিতে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ ও বাজার। স্থানীয় বাসিন্দা জলিল মিয়া বলেন, ‘এই কয়েকদিনে ৩০-৪০টা ঘর নদীতে গেছে। প্রায় ৪০-৫০ বিঘা ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। অনেক পরিবার এখন গৃহহীন। নদীর মধ্যে সব চলে যাইতাছে। অনেকেই গ্রাম ছাইড়া চইলা গেছে।’

আরেক বাসিন্দা হৃদয় মিয়া জানান, এভাবে ভাঙতে থাকলে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজার—সব নদীতে চলে যাবে। স্থায়ী বাঁধ ছাড়া আমাদের এই এলাকা রক্ষা করা সম্ভব না। সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জুবায়ের জানান, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পাউবোর সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েকটি স্থানে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নকিবুজ্জামান খান জানান, জরুরি ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুর পূর্বপাড়ার ১০০ মিটারে ৩০ লাখ টাকার কাজ শুরু হয়েছে। পশ্চিমপাড়ারও ১০০ মিটারে প্রক্রিয়া চলছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত