বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি সিফাতের, পল্লী বিদ্যুতের তদন্তে মিলল ভিন্ন হিসাব
স্ট্রিম সংবাদদাতাটঙ্গী (গাজীপুর)

গাজীপুরে নিজ বাড়িতে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন যুবক সিফাত আব্দুল্লাহ। এ নিয়ে আলোচনার পর তার অভিযোগের বিষয়টি মাঠপর্যায়ে তদন্ত করেছে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সিফাত আব্দুল্লাহের বাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব যাচাই করে তার অভিযোগের সঙ্গে অফিসিয়াল তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
সিফাত আব্দুল্লাহ রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। নিজেকে ইনকিলাব মঞ্চের একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত শুক্রবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবারের ওই ভিডিওতে সিফাত দাবি করেন, চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে তাদের বাড়িতে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। পরে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এক মাসের বিদ্যুৎ বিল একটা পুরো পরিবারকে জিম্মি কইরা ফেলবে।’
সিফাতের বাড়ি গাজীপুর মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকায়। আজ সকালে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটিতে তিনটি পৃথক আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। বাড়িটিতে একাধিক ভাড়াটিয়া পরিবারও বসবাস করে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাস্টমার লেজার, মিটারের রিডিং এবং বিলের তথ্য পর্যালোচনা করে কর্মকর্তারা চার মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব সংগ্রহ করেছেন।
পল্লী বিদ্যুতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি মিটারে মে মাসে ৪৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিল হয়েছে ৩১৭ টাকা। জুনে ৫০ ইউনিটে ৩৪২ টাকা, জুলাইয়ে ১৫০ ইউনিটে ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৭৫ ইউনিটে ৫১৩ টাকা বিল এসেছে। চার মাসে এই মিটারে মোট ৩২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার বাবদ বিল হয়েছে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।
অন্যদিকে দ্বিতীয় মিটারে মে মাসে ২৫০ ইউনিটে ১ হাজার ৮১২ টাকা, জুনে ২০০ ইউনিটে ১ হাজার ৫৮৪ টাকা, জুলাইয়ে ৪০০ ইউনিটে ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে ২৮৫ ইউনিটে ২ হাজার ৩৯৭ টাকা বিল হয়েছে। চার মাসে এই মিটারে মোট ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে বিল হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা।
এছাড়া তৃতীয় মিটারে মে মাসে ১২৫ ইউনিটে ৮৪৭ টাকা, জুনে ১২০ ইউনিটে ৬৯০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৫ ইউনিটে ১ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং আগস্টে ১৭৫ ইউনিটে ১ হাজার ৩৬২ টাকা বিল এসেছে। চার মাসে এই মিটারে মোট ৬২৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। বিল হয়েছে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা।
অর্থাৎ, চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে ওই বাড়ির তিনটি আবাসিক মিটারে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। এতে মোট বিল হয়েছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা বলেন, বাড়িতে তিনটি মিটার থাকায় একটি মিটারের হিসাবকে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ বিল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বাড়িটিতে একাধিক পরিবার বসবাস করায় মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিলের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
তদন্তের অংশ হিসেবে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের কর্মকর্তারা সিফাত আব্দুল্লাহের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তবে কর্মকর্তাদের দাবি, বাড়ির লোকজন তালিকা দিতে রাজি হননি। একপর্যায়ে তাঁরা গেট বন্ধ করে দেন।
এসব বিষয়ে সিফাত আব্দুল্লাহর বাবা মো. সিকান্দার আলীর বক্তব্য জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সিফাতের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আলী নাসের খান বলেন, বাড়িটিতে ভাড়াটিয়া থাকার বিষয়টি সিফাত তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছিলেন। পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকের হাতে দেওয়া বিলের সঙ্গে অফিসের সংরক্ষিত তথ্যের মিল নেই।
অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুরের বোর্ড বাজার পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. আহসান কবীর বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিফাত আব্দুল্লাহর অভিযোগের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে মিটার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করেছেন তারা। মিটারে থাকা ইউনিটের সঙ্গে অফিসে সংরক্ষিত রিডিং ও বিল তৈরির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
আহসান কবীর জানান, বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি নিজে, এজিএম (অর্থ) মহিমা আক্তার, ইনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর রফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
.png)






