লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত

বরফসংকটে সাগরে যেতে পারছে না ইলিশ ধরার ট্রলার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০: ৫৭
লোডশেডিংয়ে ব্যহত হচ্ছে বরফ উৎপাদন। সংগৃহীত ছবি

ইলিশ আহরণের মৌসুমে দক্ষিণের বড় বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত জমজমাট থাকে। তবে চলতি বছর পটুয়াখালীর মহিপুর, আলীপুর কিংবা বরগুনার পাথরঘাটার মতো কেন্দ্রগুলোর চিত্রটা ভিন্ন। শত শত ট্রলার নোঙর করে পড়ে আছে ঘাটে। জাল, জ্বালানি কিংবা জেলে সংকটে নয়, এই স্থবিরতার নেপথ্যে রয়েছে বরফসংকট।

বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের কোটি টাকার ইলিশ অর্থনীতিতে এই অচলাবস্থার মূল কারণ বিদ্যুৎ সংকট। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকলগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে বরফ সরবরাহে ধস নেমেছে। বিপাকে পড়েছে জেলেরা। বরফ সংকটে যেতে পারছে না সাগরে।

পাথরঘাটায় ২২টি এবং আলীপুর-মহিপুর এলাকায় অন্তত ৪০টি বরফকল রয়েছে, যেগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা দিনে প্রায় ৯ হাজার টন। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এখন উৎপাদন হচ্ছে চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে বরফ না পেয়ে এখন খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে ট্রাকে করে বরফ আনতে হচ্ছে। এতে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া এত দূর থেকে আনতে গিয়ে বরফ অনেক সময় গলতেও শুরু করে।

সাগরে ইলিশ ধরার ট্রলারগুলোর জন্য প্রয়োজন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ক্যান বরফ। সাগরে অবস্থান ও আহরণ শেষে ঘাটে ফেরা পর্যন্ত কয়েক দিন মাছ সংরক্ষণের জন্য এই পরিমাণ বরফ লাগে। কিন্তু ট্রলারগুলো বরফ পাচ্ছে এর এক-চতুর্থাংশ। এত কম বরফ নিয়ে সাগরে গেলে মাছ সংরক্ষণ করা যাবে না। এতে অনেক মাছ ধরার নৌকা সাগরে যাচ্ছে না।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বেড়ে গেছে বরফের দামও। যে বরফ আগে ১৫০ টাকায় মিলত, এখন তার দাম দাঁড়িয়েছে ৪০০ টাকা।

এদিকে বরফকলের মালিকরা অপেক্ষায় আছেন কখন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তাদের ভাষ্য, একটি বরফের ক্যান তৈরি করতে টানা ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই ব্যাহত হয়।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাথরঘাটা উপজেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আরিফ শাহরিয়ার ফাহাদ বলেন, ‘উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। এ কারণে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

তিনি জানান, প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সময়ে টানা বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হলে উপজেলার ২২টি বরফকলে উৎপাদন বাড়বে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলের জেলেরা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এবার তাদের সবচেয়ে বড় বাধা প্রকৃতি নয়, লোডশেডিং। জাতীয় মাছ ইলিশ আহরণকে ঘিরে উপকূলের লাখো জেলে, শ্রমিক, ট্রলারমালিক, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীর জীবিকা নির্ভরশীল। ভরা মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পর্যাপ্ত বরফ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা না গেলে পুরো মৎস্য খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান বলেন, ‘একজন জেলে সমুদ্রে যেতে না পারলে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য অর্থনীতির সব অংশীজনই ক্ষতিগ্রস্ত হন। বরফ সংকটের আশু সমাধান তাই সর্বজনীন জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত