সরকারের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে: টিআইবি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ২৫
টিআইবির সংবাদ সম্মেলন। স্ট্রিম ছবি

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে যে নীতি বিএনপি সরকার নিয়েছে, তার কড়া সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সরকারের সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘পেছনে হাটার’ ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছে সংস্থাটি।

সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে অধ্যাদেশ রহিত, বাতিল বা সংশোধন নিয়ে টিআইবির অবস্থান তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কিছু অধ্যাদেশ বিল আকারে এগোলেও, বেশির ভাগ অধ্যাদেশ এখনই না এনে আরও পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব গতকাল (রোববার) বলেছেন– ‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে’। আবার তাদের আইনমন্ত্রী বলেছেন– ‘গুম অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণেত করা হলে গুমের শিকার ও অমানবিকতার শিকার ব্যক্তিরা অন্যায়ের শিকার হবেন’। এটিকে তিনি আরও বেশি যুগোপযোগী করার কথা বলেছেন, যাতে করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। আমরা তাদের দুজনের বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু আস্থা রাখাটা কঠিন হচ্ছে। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি– তারা যেটা বলছেন, সেটি কাজে রূপান্তর করার ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ২ এপ্রিল মোট ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার জন্য সুপারিশ করেছে, যা সাধুবাদ পাবার যোগ্য। তবে আইনে পরিণত হতে যাওয়া অধ্যাদেশের সবই দুর্বলতাহীন নয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। যেমন– সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও এর মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে এখনো যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে, তা মহাহিসাব-নিরীক্ষকের সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী। স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় দুষ্ট।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার যেমন- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা পায় সরকার। যেখানে বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থে সরকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নির্বাচিত সরকারও নিজের ইচ্ছেমতো সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করেছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশকে রহিত করার মাধ্যমে বিষয়টিকে একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এই তিনটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কোনো টাইমলাইনও ঠিক করেনি বা ভবিষ্যতে করা হবে তার ইঙ্গিতও দেয়নি। মানবাধিকার কমিশন, দুদকসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয়। তৃতীয় ধাপে থাকা পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এনে পাসের কথা বলা হয়েছে, যদিও এসব ক্ষেত্রে কি ধরনের পরিবর্তন আনা হবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।

টিআইবি বলেছে, এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে, সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পেছনে হাটার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দূরীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করত।

সংস্থার ভাষ্যে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যা চরম দুর্বলতার কারণে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য। অথচ সেটিতে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার বিধান সংযুক্ত করে বিল আকারে পাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা হতাশাজনক। ‘আমলাতন্ত্র ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার’ পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, এই অধ্যাদেশ পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার করার বদলে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের কর্তৃত্ব স্থাপনের সুযোগ করে দেবে।

বিচারক নিয়োগে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ বহাল, মানবাধিকার কমিশনকে পুরোপুরি স্বাধীন, পুলিশ কমিশনকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করতে নতুন করে প্রণয়ন, দুদকের জবাবদিহিতার জন্য স্বাধীন বাছাই কমিটি গঠন এবং রাজস্ব আদায় ও নিরীক্ষায় মহাহিসাব-নিরীক্ষকের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে টিআইবি।

সম্পর্কিত