ঢাকায় মৌসুমি কসাই: কারও স্বস্তি, কারও আক্ষেপ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ১৭: ৩৬
অপেক্ষায় দুই মৌসুমি কসাই। স্ট্রিম ছবি

প্রতি ঈদে ঢাকায় আসেন মৌসুমি কসাই। অল্প সময়ে এই মৌসুমি শ্রমিকদের কেউ কেউ অনেক আয় করলেও, কারও ভাগ্যে জোটে বিড়ম্বনা। আবার অদক্ষ শ্রমিক নিয়ে কোরবানিদাতারাও পড়েন বিপাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

পরিবারের জন্য মাংস ও বাড়তি রোজগারের আশায় শেরপুর থেকে ঢাকায় আসা সুলতান কসাই জানান, তারা এবার ৫৮ জনের একটি বড় দল নিয়ে এসে চার ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করছেন।

কাজের চাপ ও প্রাপ্তি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পরিবার ছাইড়ে আইছি। এখন তো কষ্ট করছি, এই কাজ করতেছি, (কাজ শেষে) মাংস নিয়ে গিয়ে দেখা দিমু।’

সকাল ১০টার মধ্যেই তাদের ছয়টি গরু কাটা হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গরুর দাম অনুযায়ী পারিশ্রমিকের রেটটা ধরি। কাজের যে মজুরি পাচ্ছি, তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’

প্রায় একই রকম সন্তুষ্টির কথা জানান ঢাকার স্থানীয় এক মৌসুমি কসাই সোহেল। ১২ জনের দল নিয়ে কাজ করা এই ব্যক্তি জানান, তারা পেশাদার নন, কেবল কোরবানির মৌসুমেই কাজ করেন। কাজের মজুরি ও তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ তৃপ্ত তিনি।

গার্মেন্টস শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম যোগ দিয়েছেন মৌসুমি কসাইদের দলে। আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পরিবার ছাড়া ঈদ করা তো নিজেরই খারাপ লাগার বিষয়। কিন্তু পেটের তাগিদে আসছি। আজকের ঈদের দিন পরিবারকে সময় দিতে পারলাম না, কাজে আসছি, কারণ টাকা লাগবে। দুইটা টাকার জন্যই এই কাজে আসছি।’

কাজের ধরন ও পারিশ্রমিক নিয়ে তিনি জানান, তারা ১৮ জনের একটি বড় দল নিয়ে এসেছেন এবং চারজন করে ভাগ হয়ে কাজ করছেন।

মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে গরুর দামের ওপর হাজারে ১০০ টাকা করে দেওয়ার একটা হিসাব থাকে। আবার অনেক সময় এককালীন কন্ট্রাক্টও (চুক্তি) করে নেওয়া হয়। হাজারে একশ টাকার হিসাবে করলে টাকা বেশি পাওয়া যায়, কিন্তু কন্ট্রাক্টে কাজ করলে আয় কিছুটা কম হয়।’

উলটো গল্পও আছে কারও কারও। তেমনই একজন পাবনার মুলাডুলি থেকে আসা আলম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘কালকে ঢাকায় আসছি আমরা তিনজন। সারা পথ হেঁটে ঘুরেছি, কিন্তু কাজ পাইনি। আজ সকাল থেকে ঘুরে মাত্র একটা গরুর কাজ পেয়েছি।’

পাবনা থেকে এসে কাজ করে উলটো আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ৫ হাজার ৫০০ টাকা দিতে চেয়েছিল, পরে হাতে-পায়ে ধরে ৬ হাজার টাকায় রাজি করিয়েছি। পাবনা থেকে তিনজনের যাতায়াতেই খরচ হয়েছে ৪ হাজার টাকা। এর ওপর ৭০০ টাকা দিয়ে মাংস কাটার জন্য গাছের গুঁড়ি কিনেছি। যে টাকাটা দিল, সেটাও বিকাশে দিয়েছে, ক্যাশআউটের খরচটুকুও দেয় নাই। লাভ তো দূরের কথা, ঢাকায় এসে আমাদের উলটো লোকসান হলো।’

নীলফামারীর মিজান বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের রাইখা টাকা কামানোর জন্যই তো ঢাকায় আসছিলাম। কিন্তু এখন তো টাকাও নাই, ঈদও নাই, কিচ্ছুই করতে পারলাম না। আমাদের ঈদ শেষ।’

যাতায়াতের বাড়তি খরচের দুশ্চিন্তা নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যা কামাইছি তার চেয়ে বেশি তো খরচই হয়ে গেছে। এখন আবার বাড়ি ফিরে যেতে বাস ভাড়ার টাকা লাগবে।’

এদিকে কসাইদের মজুরি ও তাদের বাড়তি চাহিদা নিয়ে ধানমন্ডি-৩ নম্বরের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের দিন সকালে ভালো কসাই পাওয়াটা যেন লটারি জেতার মতো। আগে থেকে বুকিং দিয়েও অনেক সময় তারা আসে না। এবার বাধ্য হয়ে হাজারে ১৫০ টাকা চুক্তিতে ১২ জনের একটা দলকে কাজ দিয়েছি। শুধু টাকাই নয়, কাজ শেষে তাদের ভালো পরিমাণ মাংস, যাতায়াত খরচ আর দুপুরের খাবারও দিতে হয়।’

খরচ একটু বেশি হলেও সকাল সকাল কাজটা ঠিকঠাক শেষ হওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।

ঢাকার বাইরের কসাইদের দিয়ে কাজ করানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রিনরোডবাসী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বাসায় যারা কাজ করছে তারা অপেশাদার। এরা তো আর সারা বছর এই কাজ করে না, মূলত ঈদের সময় দু-পয়সা বাড়তি আয়ের জন্য গ্রাম থেকে আসে। তাই চামড়া ছাড়ানো বা মাংস কাটার সময় সারাক্ষণ মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থেকে নির্দেশনা দিতে হয়। না হলে চামড়া বা মাংস নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে।’

বিষয়:

শ্রমিক

সম্পর্কিত