হাওরে ‘ভেজা ধান’ নিয়ে আরেক বিপদে কৃষক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জ

পানিতে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে ধান

শ্রমিক সংকটে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে এমনিতেই হাওর অঞ্চলের অনেক ধান কাটতে পারেননি কৃষকেরা। তবে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর তুলনায় অনেকটা আগেভাগেই অধিকাংশ ধান কেটে ফেলেছেন সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। তবে বৃষ্টির পানিতে ভেজা এই ধান নিয়ে এখন তাঁরা পড়েছেন আরেক বিপদে। রোদ না থাকায় অনেক ভেজা ধান এরইমধ্যে নষ্ট হওয়ার উপক্রম। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি জমে থাকায় শুকানোর জায়গাও মিলছে না। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামেই ধান বিক্রি করছেন।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) ভোর থেকেই ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, সঙ্গে বজ্রপাতও হচ্ছে। এতে হাওরের কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

জেলার মধ্যনগর উপজেলার আবিদনগর হাওরের জিনারিয়া বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে। এই এলাকার বেশিরভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হলেও অন্তত ১০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। যদিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ দাবি করেছেন, এই উপজেলার হাওরের সব ফসলই কাটা হয়ে গেছে।

দিরাই উপ‌জেলার বরাম হাওরের ধান কেটে নিচ্ছেন কৃষান-কৃষানি। স্ট্রিম ছবি
দিরাই উপ‌জেলার বরাম হাওরের ধান কেটে নিচ্ছেন কৃষান-কৃষানি। স্ট্রিম ছবি

এদিকে চোখের সামনে সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল তলিয়ে যেতে দেখে হতাশ কৃষকেরা। ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত ও বৃষ্টির মধ্যেও তাঁরা হাঁটু থেকে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন এবং শুকনো জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কৃষকেরা বলছেন, কাটা ধান রোদ না থাকায় খলায় (কাটার পর ধান রাখার স্থান) পচে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ধানে গেরা (চারা) উঠে যাচ্ছে। আবার না কাটলেও জমিতে ডুবে যাচ্ছে। মধ্যনগরের ইকরাছই হাওরে বাঁধ ভেঙে পাকা ধান ডুবে গেছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার ১০টি উপজেলার নিচু জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে।

সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘পানিতে ডুবে ডুবে ধান কেটে আনলেও শুকাতে পারছি না। এই ধান এখন নষ্ট হবে।’

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নতুনপাড়া এলাকার আফজাল হোসেন বলেন, ‘খরচার হাওরের অর্ধেক জমি এখনো ধান কাটার বাকি আছে। এর মধ্যে আমরা পাকা ধান কাটার চেষ্টা করছি। তবে ধান কেটেই কি হবে যদি শুকাতে না পারি।’

মধ্যনগর উপজেলায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে  জিনা‌রিয়া হাও‌রে। স্ট্রিম ছবি
মধ্যনগর উপজেলায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে জিনা‌রিয়া হাও‌রে। স্ট্রিম ছবি

অন্যদিকে শ্রমিকসংকটের কারণে ধান কাটা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কম্বাইন হারভেস্টার যোগান দেওয়ার কথা জানানো হলেও পানির কারণে তা জমিতে নামানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

হাওরপাড়ের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আর পাওয়া গেলেও একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে দৈনিক প্রায় ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে এক মণ ধানের দাম পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, ফলে ধান কাটার খরচই উঠছে না।

এদিকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের হরিমনের ভাঙা এলাকায় ফসলরক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রায় ৯ হাজার হেক্টর বোরো ফসল রক্ষায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেড় কিলোমিটার বাঁধের একটি অংশে মঙ্গলবার সকালে ফাটল দেখা দেয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সংস্কারকাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সুনামগঞ্জে হাওর থেকে ধান সংগৃহ করছেন দুজন কৃষক। স্ট্রিম ছবি
সুনামগঞ্জে হাওর থেকে ধান সংগৃহ করছেন দুজন কৃষক। স্ট্রিম ছবি

এদিন বিকেলে পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন খান বলেন, ‘এই বাঁধের কোনো স্থানে ফাটল দেখা দিলে হাওরে পানি প্রবেশ করবে। এই বাঁধের কারণে উপজেলার কৃষকের ফসলের যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এর দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন যতক্ষণ না বাঁধ মেরামত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত থেকে কৃষকদের ফসল তুলে দিতে নিশ্চয়তা করতে হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘ঠিকাদারকে ইতিমধ্যে শোকজ করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘বৃষ্টিপাত আরও ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকবে।’ পাশাপাশি ভবিষ্যতে ধান শুকানোর ভোগান্তি কমাতে হাওরে শেড নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না ও পানির জন্য হারভেস্টারও চলছে না, সিরিয়াস ক্রাইসিস।’ তবে সবাই সচেতন ও সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করলে বন্যা হওয়ার আগেই ধান তোলা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত