চোর অপবাদে কয়েক দফা পিটিয়ে প্রতিবন্ধীকে হত্যা, লাশ হাসপাতালে ফেলে পলায়ন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার (ঢাকা)

সাভারে কয়েক দফা মারধরে নিহত হন আবুল খায়ের পাটোয়ারী। স্ট্রিম ছবি

ঢাকার সাভারে অটোরিকশা চোর সন্দেহে আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৩০) নামে মানসিক ভারসাম্যহীন (প্রতিবন্ধী) একজন কয়েক দফায় পিটুনি দিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। পরে তার মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে পালিয়ে গেছে তারা।

গতকাল সোমবার (২০ জুলাই) উপজেলার উলাইল আল ইসলাম গার্মেন্টসের পেছনের এলাকায় এ ঘটনায় ঘটে। তবে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলার পর বিষয়টি জানাজানি হয়।

পরে বিকেলে নিহতের ভাই শাহ পরাণ পাটোয়ারী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন বলে জানান সাভার মডেল থানার ওসি (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ। ওই ঘটনায় অটোরিকশাচালক সবুজ ওরফে শুভ ও গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আবুল খায়ের চাঁদপুর সদর থানার কল্যাণপুর দাসাদী গ্রামের লোকমান পাটোয়ারীর ছেলে। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন জানিয়ে প্রতিবেশী আব্দুল মোতালেব হোসেন জানান, গত রোববার (১৯ জুলাই) ফজরের নামাজের পর তিনি চাঁদপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সোমবার রাতে সাভার থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়, হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। থানায় গিয়ে মরদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান স্বজনেরা। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক কামরুন্নাহার জানান, সোমবার দুপুর ১টার দিকে দুজন লোক অটোরিকশায় এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে তাকে ফেলে পালিয়ে যান। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে খবর দিলে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধারকারী সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রথমে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হিসেবে তারা মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে র‍্যাবের সহযোগিতায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পর তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয়।

এসআই ইসমাইল বলেন, ‘শুনেছি, দুজন লোক অটোরিকশায় তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান। সুরতহাল করার সময় তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্ত করছেন এসআই রফিকুল ইসলাম।’

কয়েক দফা পিটুনিতে মৃত্যু

এদিকে আবুল খায়েরকে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি স্ট্রিমের অনুসন্ধানে বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। সোমবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার উলাইল এলাকায় অটোরিকশা চোর সন্দেহে আটক করা হয় আবুল খায়েরকে। বেলা ১১টা পর্যন্ত সেখানে তাঁকে কয়েক দফায় মারধরের পর কোটঘর মহল্লায় অবস্থিত অটোরিকশার মালিক নুরুজ্জামানের গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিষয়টি অনুসন্ধানে মঙ্গলবার উলাইল গার্মেন্টসের পেছনে গেলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, ঘটনার দিন চালক সবুজ ওরফে শুভ তাঁর ছেলেকে অটোরিকশা পাহারায় রেখে বাসায় খেতে যান। তখন আবুল খায়ের শিশুটির কাছে ভাত খেতে চাইলে সে বিষয়টি বাবাকে গিয়ে জানায়। তিনি এসে আবুল খায়েরকে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকতে দেখেন। তাঁকে অটোরিকশা চোর মনে করে লোকজন জড়ো হয়ে পিটুনি দিতে শুরু করে। পরে তাঁকে নুরুজ্জামানের গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়।

মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে কোটঘর মহল্লায় নুরুজ্জামানের অটোরিকশা গ্যারেজে গিয়ে নুরুজ্জামানের পরিবারের কয়েকজন নারী সদস্যকে দেখা যায়। তবে তাঁরা কোনো কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামান এসে জানান, গতকাল সকালে অটোরিকশাটি চুরির সময় শুভ ও স্থানীয়রা আবুল খায়েরকে আটকে মারধর করেন। সকাল ১১টার দিকে তার গ্যারেজে আনা হয় তাকে। তখন অন্যান্য অটোরিকশাচালক তাকে আবারও মারধর করে।

নুরুজ্জামান বলে, ‘আমি মারধর করিনি, আমি হার্টের রোগী। পরে দুপুর ১টার দিকে একজন চালকের সহযোগিতায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ভয়ে সেখান থেকে চলে আসি।’ তবে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ এসে তাঁর সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কথা বললেও তাঁকে আটক করা হয়নি বলে জানান।

এসব বিষয়ে সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ জানান, ঘটনায় জড়িত অটোরিকশাচালক সবুজ ওরফে শুভকে আটক করা হয়েছে। তবে কয়েক ঘণ্টা কথা বলার পরও গ্যারেজ মালিককে আটক না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নুরুজ্জামানকে নিয়ে আসার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাঁকে কেন আগে থানায় আনা হয়নি, সেই বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, আবুল খায়ের হত্যাকাণ্ডে নিহতের ভাই শাহ পরাণ পাটোয়ারী বাদী হয়ে সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামান ও অটোরিকশা চালক সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয় তদন্ত চলছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত