ডেঙ্গু রোগী নিয়ে সরকারি হিসাবের ভিন্ন চিত্র হাসপাতালে

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার অদূরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৪৫। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এখানে ভর্তি হন ১৬ জন। সবমিলে ওই সপ্তাহে ভর্তির সংখ্যা ৮৭ জন। গত ১৮ আগস্ট ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুও হয়। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে চলতি বছর হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তিই হয়েছেন একজন। বর্তমানে নেই চিকিৎসাধীন।

শুধু এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নয়, রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দৈনিক প্রতিবেদনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যে এমন গরমিল পাওয়া গেছে।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাঠানো নতুন ভর্তি, মৃত, চিকিৎসাধীন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরাদের তথ্য নিয়ে দৈনিক এই প্রতিবেদন তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। ঢাকা মহানগরে এমন নথিভুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৫৯টি। তবে কয়েকটি হাসপাতালের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, অধিদপ্তরের প্রকাশিত হিসাবের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে আগের ২৪ ঘণ্টায় কিছু হাসপাতালে শূন্য ভর্তি দেখানো হলেও সেখানে একাধিক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। আবার চলতি বছর কিছু হাসপাতালে হাতেগোনা রোগী ভর্তি দেখানো হলেও রেজিস্ট্রি খাতায় পাওয়া গেছে কয়েক গুণ।

এর মধ্যে রাজধানীর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিতে রয়েছে, গত এক সপ্তাহে এখানে চারজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীনও চারজন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নথিতে রয়েছে, গত এক সপ্তাহে ৩৯ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৫ জন।

পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালের তথ্যেও রয়েছে বড় ব্যবধান। অধিদপ্তরের হিসাবে এই বছরে হাসপাতালটিতে কোনো ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নেয়নি। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে সেখানে ৯ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। ৩ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন একজন। সবমিলে ওই সপ্তাহেই ১০ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিভুক্ত আরেক প্রতিষ্ঠান হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালেও একই ধরনের তথ্যগত পার্থক্য পাওয়া গেছে। সরকারি হিসাবে, চলতি বছর এখানে ১৫ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং বর্তমানে কোনো রোগী ভর্তি নেই। বিপরীতে হাসপাতালটি জানিয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন ছিলেন একজন। সবমিলে ওই সপ্তাহে ভর্তির সংখ্যা চারজন। আর চলতি বছরে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের মেডিকেল অফিসার ডা. আরাফাত বলেন, কোনো হাসপাতাল থেকে তথ্য পাঠালে তা দৈনিক প্রতিবেদনে যুক্ত হওয়ার কথা। এটা তো এরকম হওয়ার কথা না। আগামীকাল আবার ফোন দিলে আশা করি পেয়ে যাবেন।

হাসপাতালগুলোর দাবি, তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে নিয়মিত তথ্য পাঠায়। শমরিতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে ই-মেইলে তথ্য পাঠানো হয়। ইবনে সিনা হাসপাতাল ও এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও একই কথা জানিয়েছে।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতাল থেকে প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তথ্য পাঠানো হয়।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মেডিকেল অফিসার ডা. আরাফাত বলেন, কোনো হাসপাতাল থেকে তথ্য পাঠালে তা দৈনিক প্রতিবেদনে যুক্ত হওয়ার কথা।

সুনির্দিষ্ট হাসপাতালের তথ্য উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা তো এরকম হওয়ার কথা না। আগামীকাল আবার ফোন দিলে আশা করি পেয়ে যাবেন।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু হাসপাতাল ও অধিদপ্তরের তথ্যের অমিল নয়, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক নজরদারি ব্যবস্থাতেও ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতাল থেকে ভর্তি রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা প্রশাসনিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে বৈজ্ঞানিক সার্ভেইল্যান্স বলা যায় না। ডেঙ্গু কোন এলাকায় বাড়ছে, আক্রান্তের প্রবণতা কী, কোন বয়সে সংক্রমণ বেশি— এসব জানতে প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনার ভিত্তিতে আলাদা নজরদারি প্রয়োজন।

ইনফ্লুয়েঞ্জা, করোনা ও নিপাহ ভাইরাসের মতো ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত নজরদারি প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত