প্রাধান্য রাজনীতি, ২০ নতুন ভিসির ১৯ জনই বিএনপির

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ১৫: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

সরকারে এসে এখন পর্যন্ত ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে ১৯ জনই দলটির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে আবার আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ হয়েছে সার্চ কমিটির সুপারিশ ছাড়াই। স্বায়ত্তশাসিত চার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটিতে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের সিনেট প্যানেল গঠনের বিধান পাশ কাটিয়ে ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ অজুহাত খাড়া করা হয়েছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, উপাচার্যের মতো প্রশাসনের শীর্ষ পদে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার বদলে বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। অতীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারও একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিত।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী স্ট্রিমকে বলেছেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে– কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার হলো না। উপাচার্যদের রাজনৈতিক মতাদর্শ দোষের নয়। কিন্তু এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত এবং উপাচার্যদেরও প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে।

সূত্র জানায়, গত মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর গত ১৪ মে আরও ১১ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আর গত ২৩ মে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়াদের কেউ বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব), সাদা দল কিংবা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সঙ্গে যুক্ত।

ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি একইসঙ্গে বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। ইউট্যাবের সহসভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট), এম এম শরীফুল করিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মো. মামুন অর রশিদ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।

ইউট্যাবের যুগ্ম মহাসচিব গোলাম রব্বানী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবুল হাসনাত মোহা. শামীম পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং খায়রুল ইসলাম রুবেল নিয়োগ পেয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংগঠনের কার্যনির্বাহী সদস্য মোশারফ হোসেন ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য মোহাম্মদ আল ফোরকান বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিদ্দিকুর রহমান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া রইস উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আবু জাফর খান ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গঠিত কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য মুহাম্মদ মাছুদ ছাত্রদলের পদধারী ছিলেন এবং শিক্ষক রাজনীতিতেও বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নুরুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন আট কলেজ নিয়ে গঠিত নতুন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে।

টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম শহিদুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জয়নুল আবেদিন সিদ্দিকী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য। এ ছাড়া জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কে এম মতিনুর রহমান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক।

এর বাইরে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একরামুল হকের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে নিয়োগ দিতে গিয়ে ১৯ জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ডিঙানো হয়েছে। তা ছাড়া আগে একরামুল হক কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী– ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। উপাচার্য নিয়োগের সার্চ কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান অধ্যাদেশ মানার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, উপাচার্যের পদে ছুটি, অসুস্থতা, পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে সাময়িক শূন্যতা সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন। গত ১৬ মার্চ এই ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ বিধানটি ব্যবহার করেই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার।

ওইদিন একসঙ্গে মোট আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগে সার্চ কমিটির সুপারিশ নেওয়া হয়নি। তবে চলতি মাসে নিয়োগ পাওয়া ১২ জনের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটির সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের বক্তব্য পায়নি স্ট্রিম। তাঁর মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে রিসিভ হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলেও সাড়া দেননি।

সম্পর্কিত