হোসেন জিল্লুর রহমানের লেখা/মুডিস রেটিংয়ে স্বস্তি এবং অর্থনীতির আড়ালের বাস্তবতা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডি’স বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে পরিবর্তন করে ‘স্থিতিশীল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বাহ্যিক খাতের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া এই মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে আগের তুলনায় ইতিবাচক। কিন্তু এই রেটিং থেকে বড় ধরনের কোনো উপসংহার টানার আগে গভীরভাবে বুঝতে হবে, মুডি’স ঠিক কোন সূচকগুলোর ওপর এই মূল্যায়ন করেছে এবং আমাদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত বাস্তবতা আসলে কী।

সামষ্টিক অর্থনীতি বুঝতে হলে আমরা সাধারণত কিছু স্বল্পমেয়াদী চলক বা ‘শর্ট-টার্ম ভ্যারিয়েবল’ দিয়ে বিচার করি। কিন্তু আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলো স্বল্পমেয়াদী নয়, বরং এর চেয়ে অনেক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী। মুডি’স মূলত স্বল্পমেয়াদী কিছু সামষ্টিক পরিসংখ্যানের ওপর এই রেটিং দিয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে যে কাঠামোগত দুর্বলতা আছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।

রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহকেও সামষ্টিক অর্থনীতির স্বস্তির বড় জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শর্ট-টার্ম সামষ্টিক ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টকে এটি স্বস্তি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও চিত্রটি মিশ্র। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পেছনে মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, নতুন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার কারণে এটি বাড়েনি। উল্টো ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করলে দেখা যায়, বিদেশে যাওয়া নতুন শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির স্বস্তির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে রপ্তানি খাতের কথা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আমাদের রপ্তানি খাত তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে বা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনীতির পরিচিত চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত এক ধরনের রেজিলিয়েন্স বা ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু কীভাবে তারা এই সক্ষমতা ধরে রাখল, সেটা এক বড় প্রশ্ন।

বাস্তবতা হলো, ক্রেতাদের চাপে পণ্যের দাম কমিয়ে তারা ভলিউম বা উৎপাদনের পরিমাণ ঠিক রেখেছে। ফলে কারখানা পর্যায়ে মুনাফা বা প্রফিটেবিলিটি আরও কমে গেছে। অন্যদিকে, রপ্তানি ধরে রাখার কথা বলা হলেও আমাদের অন্য পরিসংখ্যানগুলো ভিন্ন কথা বলছে। গত পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে দেশে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, এ খাতে কর্মসংস্থান ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। আমাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি তৈরি করা, যা এখনো করে উঠতে পারিনি।

রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহকেও সামষ্টিক অর্থনীতির স্বস্তির বড় জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শর্ট-টার্ম সামষ্টিক ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টকে এটি স্বস্তি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও চিত্রটি মিশ্র। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পেছনে মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, নতুন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার কারণে এটি বাড়েনি। উল্টো ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করলে দেখা যায়, বিদেশে যাওয়া নতুন শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে।

তাহলে রেমিট্যান্স বাড়ছে কেন? মূলত সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন প্রণোদনার কারণে প্রবাসীরা ইনফরমাল চ্যানেল (যেমন হুন্ডি) থেকে ফরমাল চ্যানেলে অর্থ পাঠানো বাড়িয়েছেন। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের এই বৃদ্ধি কাঠামোগত উন্নতির লক্ষণ নয়, বরং চ্যানেল পরিবর্তনের ফল মাত্র।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা— সামষ্টিক অর্থনীতির এই স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি খানা বা হাউসহোল্ড পর্যায়ে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে না। অর্থনীতির এই পরিসংখ্যানগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি বা গতিশীলতা হিসেবে রূপান্তরিত হচ্ছে না। আমাদের দেশীয় তথ্য ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন— উভয় জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত নির্ভর করেন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ওপর। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাময়িক স্বস্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদী যে অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেটি বিনিয়োগকারীদের ভাবায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যদি ডোমেস্টিক বা দেশীয় বিনিয়োগ জোরালো না হয়, তবে বিদেশি বিনিয়োগ কখনোই আসবে না।

মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে প্রান্তিক পর্যায়ের অর্থনীতির আসল স্পন্দন বোঝা যায়। ঋণ পরিশোধের যে চিত্র দেখতে পাচ্ছে, তাতে মাঠ পর্যায়ের অর্থনীতি নিয়ে তারা বেশ উদ্বিগ্ন। প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে কতটা নাজুক, তা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অনেকে মনে করছেন, মুডি’স-এর এই মূল্যায়নের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন এবং ফরেন ক্যাপিটাল মার্কেটে আমাদের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। বাস্তবতা এত সরল নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু মুডি’স-এর রেটিং দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। নতুন কোনো বিনিয়োগকারীর জন্য এটি হয়তো একটি প্রাথমিক ইতিবাচক সিগন্যাল হতে পারে; কিন্তু চূড়ান্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এর ওপর নির্ভর করে না।

আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত সমীকরণ কাজ করে। এখানে বিনিয়োগের জন্য যত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়, প্রকৃত বিনিয়োগ সে তুলনায় একেবারেই আসে না।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত নির্ভর করেন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ওপর। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাময়িক স্বস্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদী যে অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেটি বিনিয়োগকারীদের ভাবায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যদি ডোমেস্টিক বা দেশীয় বিনিয়োগ জোরালো না হয়, তবে বিদেশি বিনিয়োগ কখনোই আসবে না।

বাহ্যিক রেটিংয়ের চেয়ে নিজেদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সংকট মোচনে দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।

নির্বাচনের পর দেশীয় বিনিয়োগ বাড়বে বলে যে ধারণা করা হয়েছিল, পরিসংখ্যানে তার কোনো প্রতিফলন নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি থেকে বৃহৎ শিল্প— কোথাও বিনিয়োগ বাড়ার লক্ষণ নেই। বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না, তা কোনো রহস্যও নয়। এর প্রধান কারণ অনিশ্চয়তা।

বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা। ব্যবসার অনুমোদন নেওয়ার জন্য তৈরি করা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ যদি বাস্তবিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস হিসেবে কাজ না করে, তবে বিনিয়োগকারীরা কীভাবে ভরসা পাবেন?

মুডি’স রেটিং নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিসি ভ্যারিয়েবল’ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিসংখ্যানগত স্বস্তি কেন সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনছে না— আমাদের সেই কাঠামোগত সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে।

প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে এবং বিনিয়োগ সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। মুডি’স-এর মতো সংস্থাগুলো অর্থনীতির এই কাঠামোগত সংকট নিয়ে কাজ করে না। তাই বাহ্যিক রেটিংয়ের চেয়ে নিজেদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সংকট মোচনে দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।

হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক; গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত