প্রশ্নের মুখে যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা!
-2b06a0-480x270.webp)
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বৈঠকে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে ‘ওয়েস্ট মিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে’ ঘোষণা দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কার্ডিফে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি, ওয়েলসের প্লাইড সাইমরু এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের শিন ফেইন-এর নেতারা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে নিজ জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতির জন্য লন্ডনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আজকের যুক্তরাজ্য একক জাতিরাষ্ট্রের মতো দেখালেও এর ইতিহাস মূলত বিভিন্ন রাজ্য, জাতি ও রাজনৈতিক চুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা। ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড ১৭০৭ সালের অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন-এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ইউনিয়ন গঠন করে। ওয়েলস তারও আগে ইংরেজ রাষ্ট্রকাঠামোয় একীভূত হয়েছিল। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ইউনিয়ন ১৮০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ শতকের শুরুতে আইরিশ জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলে দ্বীপটির রাজনৈতিক বিভাজন ঘটে। উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ থেকে যায়।
সুতরাং যুক্তরাজ্যকে কেবল একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যায় না। এর ভেতরে পৃথক জাতীয় পরিচয়, ভাষা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়ে গেছে। তাই ‘ব্রিটিশ’ পরিচয়ের পাশাপাশি ‘স্কটিশ’, ‘ওয়েলস’, ‘আইরিশ’ পরিচয়ও কম শক্তিশালী নয়।
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত হলেও ২০ শতকের শেষদিকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডকে কিছু অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে স্কটল্যান্ড অ্যাক্ট, ওয়েলস অ্যাক্ট ও উত্তর আয়ারল্যান্ড অ্যাক্ট হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সাল থেকে এই তিন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত হয় স্কটল্যান্ড পার্লামেন্ট, ওয়েলস সেনেড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড অ্যাসেম্বলি । ফলে ওয়েস্ট মিনস্টারের একক শাসনের পরিবর্তে যুক্তরাজ্য ক্রমে বহুস্তরীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা চালুর পর যুক্তরাজ্যের তিন অঞ্চলের প্রশাসনিক ফার্স্ট মিনিস্টাররা এই প্রথম আলাদা হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানালেন। স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনে এবং মিশেল ও’নিল গণভোটের পক্ষে হলেও ওয়েলসের রিন অ্যাপ ইয়োরেথ কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানাননি।
তবে তাদের সমঝোতাপত্রে বলা হয়েছে: দ্বীপপুঞ্জের মানুষ দেখছে, বিশ্ববাসীও দেখছে, ওয়েস্ট মিনস্টারের সময় শেষ হয়ে আসছে।
যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার সূত্রপাত সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যকে ঘিরে; এমনটাই মনে করছেন অনেকে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম হাউস অফ কমনসে বলেছিলেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবির পক্ষে যদি ‘সুস্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হয়, তবে তিনি সেখানে গণভোটের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। কিন্তু সেই অবস্থান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরে নিজ বক্তব্য থেকে সরে এসে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো গণভোটেই সম্মতি দেবেন না।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য বিভাজন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ মাসের গোড়ার দিকে ট্রাম্প বলেছেন, আয়ারল্যান্ডকে আবারও একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চান। তার মন্তব্য ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে দেশের অখণ্ডতা ও ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই টানাপোড়েনের আবহেই সোমবার মুখোমুখি বৈঠকে বসছেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাজ্যের ঐক্য কি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে?
এ সময় যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টির পেছনে ঐতিহাসিক কী কারণ থাকতে পারে? এখানে পরিষ্কার করা জরুরি, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস এক নয়। তিন অঞ্চলের ক্ষেত্রেই আলাদা পরিচয় ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু এর ঐতিহাসিক শেকড় ভিন্ন।
প্রথমেই স্কটল্যান্ডের কথা ধরা যাক। স্কটল্যান্ড এক সময় স্বাধীন রাজ্য ছিল; কিন্তু পরে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একীভূত হয়। ১৭০৭ সালের আগে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড ছিল দুটি পৃথক রাজ্য, যদিও ১৬০৩ সাল থেকে একই রাজপরিবারের অধীনে ছিল। ১৭০৭ সালের অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন-এর মাধ্যমে দুই দেশের পৃথক পার্লামেন্ট বিলুপ্ত হয়ে একটি নতুন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট গঠিত হয়। কিন্তু একীভূতকরণকে স্কটল্যান্ডের সবাই মেনে নিয়েছিল, এমন নয়। ইউনিয়নের আগে স্কটিশ পার্লামেন্টে ইংরেজ প্রভাব, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ১৭০৭-এর পরও স্কটল্যান্ড নিজস্ব আইনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও চার্চের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখে। ফলে কয়েক শতাব্দী ধরে একটি স্বতন্ত্র স্কটিশ পরিচয় টিকে থাকে।
বর্তমানে তাদের মূল যুক্তি তাই -- ‘আমরা আলাদা জাতিগত-ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি দেশ; তাহলে আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নিজেদের হাতে থাকা উচিত।’ এই ধারণা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে শক্তিশালী হয়। স্কটিশ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবি ক্রমে উল্লেখযোগ্য হারে শক্ত রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ১৯৯৭ সালের গণভোটে জনগণ নিজস্ব পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার পক্ষে স্পষ্টভাবে ভোট দেয় এবং ১৯৯৯ সালে স্কটিশ পার্লামেন্ট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ওয়েলসের ইতিহাস আবার আলাদা। মধ্যযুগে ওয়েলসের নিজস্ব আইন ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য ছিল। দশম শতাব্দী থেকেই পৃথক ওয়েলস আইনব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে ওয়েলসদের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। ওয়াইন গ্লিন্ডুর নামক একজন অভিজাত ও সামরিক নেতার নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ হেনরির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনটি ‘ওয়াইন গ্লিন্ডুর বিদ্রোহ’ নামেই পরিচিত; যা ওয়েলস জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর রাজা অষ্টম হেনরির আমলে ‘১৫৩৫ ও ১৫৪২ সালের ওয়েলস একীভূতকরণ আইন’-এর মাধ্যমে ওয়েলসকে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও আইনগত কাঠামোয় একীভূত করা হয়। এভাবেই ইংরেজ আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ওয়েলসে বিস্তৃত হয়।
বর্তমান মুভমেন্টের পেছনে ওয়েলসের জনগণের ভেতর যে মূল প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কেন ওয়েলসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ লন্ডনকেন্দ্রিক ব্যবস্থার অধীনে থাকবে? ওয়েলসের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল এবং তা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু স্কটল্যান্ডের মতো দীর্ঘ সময় ধরে একটি পৃথক, কেন্দ্রীভূত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে তার ধারাবাহিক অস্তিত্ব ছিল না। বর্তমানেও সেখানে স্বাধীনতার পাশাপাশি আরও বেশি ক্ষমতা হস্তান্তরের মডেল নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ওয়েলস সরকারের সাংবিধানিক কমিশন বা স্বাধীন ওয়েলস, ফেডারেল যুক্তরাজ্য এবং আরও শক্তিশালী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ-এই তিন ধরনের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিষয়টি সবচেয়ে আলাদা এবং এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশ শাসন, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিভাজনের ইতিহাস। ১৮০১ সালে আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের সঙ্গে সাংবিধানিক ইউনিয়নে যুক্ত হয়। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে আয়ারল্যান্ডের একটি বড় অংশে স্বাধীনতার দাবি শক্তিশালী হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালের ‘আয়ারল্যান্ড সরকার আইন’ দ্বীপটিকে বিভক্ত করার সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করে। ১৯২১ সালের ‘ব্রিটিশ-আইরিশ চুক্তি’র পর ২৬টি কাউন্টি নিয়ে ‘আইরিশ ফ্রি স্টেট’ গঠিত হয়। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। এর পরও উত্তর আয়ারল্যান্ডে দুটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়, উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকতে নাকি আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে চায়? এ নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতেরও সৃষ্টি হয়। অবশেষে ১৯৯৮ সালে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি হয়, যা Good Friday Agreement নামে পরিচিত। চুক্তিটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করে। এই চুক্তির মূলনীতিগুলোর একটি হলো, উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যে থাকবে নাকি ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের অংশ হবে -- তা সেখানকার জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ওপর নির্ভর করবে। ভবিষ্যতে গণভোটে সেটা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয়তাবাদী শক্তি এখন আবার জোরালো হলো কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অন্তত চারটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ব্রেক্সিট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে যাওয়ায় স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রেক্সিট ঘিরে জনমত, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলাদা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে এই অঞ্চলগুলোয় ভোটের ফল এক ছিল না। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অগ্রাধিকার কিছুটা ভিন্নভাবে গড়ে ওঠে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে তুলনামূলক বেশি সমর্থন ছিল, যা পরে কেন্দ্রের সঙ্গে স্কটল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয়করণের অভিযোগ। জাতীয়তাবাদী দলগুলোর যুক্তি হলো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক, সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বড় অংশ ওয়েস্ট মিনস্টারের হাতে রয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, জাতীয় পরিচয় ও গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণ। একজন স্কটিশ বা ওয়েলস নাগরিক মনে করতে পারেন, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজ জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দূর করা যাবে না।
চতুর্থত, ইউরোপের সঙ্গে পুনঃসম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা। জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কাছে ইউরোপ শুধু বাণিজ্যিক বাজার নয়; এটি আঞ্চলিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এই ছোট অঞ্চলগুলো একা যতটা প্রভাব ফেলতে পারে; ইউরোপীয় সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে তারা নিজ আন্তর্জাতিক পরিচয় ও সহযোগিতার সুযোগ আরও বিস্তৃত করতে পারবে।
অপরদিকে কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, যুক্তরাজ্য কেবল রাজনৈতিক ইউনিয়ন নয়; এটি যৌথভাবে পরিচালিত বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সরকারি অর্থব্যবস্থা। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি ইংল্যান্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। অর্থাৎ সরকারি আয়-ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে পুরো দেশের সম্পদ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমান সরকারি ব্যয় পর্যালোচনায় স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্যও বড় আকারের বহু বছর মেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা আছে।
যুক্তরাজ্য একটি পারমাণবিক শক্তি, ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, সীমান্ত, গোয়েন্দা সহযোগিতা সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারে সক্ষম। বর্তমানে একটি বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্য কাঠামোয় কথিত ছোট অঞ্চলগুলোও কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার সুবিধা পেয়ে আসছে।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গে কেন্দ্রের যুক্তি হলো, ওয়েস্ট মিনস্টার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে না। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব আইনসভা ও সরকার রয়েছে এবং অনেক অভ্যন্তরীণ নীতি তাদের হাতে। যুক্তরাজ্যের সরকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসিত সরকারগুলোর মধ্যে নিয়মিত আন্তঃসরকারি কাঠামো এবং যৌথ নীতিগত কাঠামোও রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটাকে শুধু ‘যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার আন্দোলন’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বরং কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা অমীমাংসিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির আধুনিক রূপ বলা চলে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি কতদূর গড়াতে পারে? সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের পর ওই তিন অঞ্চলের ফার্স্ট মিনিস্টাররা যে বললেন, ‘ওয়েস্ট মিনস্টার-এর সময় ফুরিয়ে আসছে’, তার সম্ভাবনাই বা কতটুকু? যুক্তরাজ্য অবশ্যম্ভাবীভাবে ভেঙে যাচ্ছে, এই মুহূর্তে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং বর্তমান ঘটনাকে দেখা উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক পুনর্গঠনের চাপ হিসেবে।
স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্ন এখনো রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী; কিন্তু ২০১৪ সালের গণভোটের ফল দেখিয়েছে, জনগণের অবস্থান একমুখী নয়। ওয়েলসে স্বাধীনতার আলোচনা বাড়ছে ঠিকই; কিন্তু তা এখনো মূলত সাংবিধানিক ক্ষমতা ও জাতীয় পরিচয়ের বিতর্কে আবর্তিত। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে হলে সেখানকার মানুষের সম্মতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে Good Friday Agreement-এর আলোকে গণভোটে সেই মতামত পরীক্ষার সুযোগ আছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট মিনস্টার-এর হাতে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পদ, সামরিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক প্রভাব ও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তি। ফলে বিচ্ছিন্নতার পথ রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে সহজ হবে বলে মনে হয় না। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যেভাবে আগে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পর্ক ছিল, সেটি এখন আর আগের মতো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না। কেন্দ্র ও অঞ্চলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির নতুন ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
সুতরাং ‘ওয়েস্ট মিনস্টার-এর সময় শেষ’ একটি অতিরঞ্জিত ঘোষণা; এটিকে বরং রাজনৈতিক স্লোগান বলা যায়। ওয়েস্ট মিনস্টার সবাইকে ধরে রাখতে চাইলে সে ক্ষেত্রে শুধু ‘যুক্তরাজ্যের’ অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরা যথেষ্ট হবে না। তাকে একই সঙ্গে ওই তিন অঞ্চলের জনগণকে বোঝাতে হবে যে, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার করে এবং অঞ্চলগুলোর হাতে আরও ক্ষমতা দিয়ে স্বাধীনতার একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
অতএব আপাতত মনে হচ্ছে, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ওয়েস্ট মিনস্টার-এর আগামীর রাজনৈতিক লড়াইটি শুধু ‘স্বাধীনতা’ না ‘যুক্তরাজ্য’ -- এই দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রকৃত লড়াই হবে, কোন রাষ্ট্রকাঠামোয় সাধারণ মানুষ বেশি গণতান্ত্রিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদা পাবে?
লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
.png)






