একুশ শতকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র কেন ব্যর্থ হচ্ছে?

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক।
স্ট্রিম গ্রাফিক।

প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স নগররাষ্ট্রে যে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণমূলক শাসনের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্বমূলক উদারনৈতিক গণতন্ত্রে রূপ নেয়। আঠারো ও উনিশ শতকের বিভিন্ন বিপ্লব-আমেরিকান বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব এবং শিল্প বিপ্লবোত্তর সামাজিক রূপান্তর-গণতন্ত্রকে কেবল এক প্রকার সরকার পরিচালনা পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বজনীন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর প্রখ্যাত তত্ত্ব দ্য থার্ড ওয়েভ: ডেমোক্রাটাইজেশন ইন দ্য লেইট টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি (১৯৯১)-এ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক বিকাশ ও রূপান্তরকে তিনটি প্রধান তরঙ্গের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন: প্রথম তরঙ্গ (১৮২৮-১৯২৬): আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ তরঙ্গে প্রধানত পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে ভোটাধিকারের বিস্তার ঘটে এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর গোড়াপত্তন হয়। দ্বিতীয় তরঙ্গ (১৯৪৩-১৯৬২): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় এবং পরবর্তীকালে এশিয়া ও আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে এই তরঙ্গের সূচনা হয়। এই পর্বে নবগঠিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের জোয়ার দেখা যায়। তৃতীয় তরঙ্গ (১৯৭৪-১৯৯০-এর দশক): ১৯৭৪ সালে পর্তুগালের 'কার্নেশন বিপ্লব'-এর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই তরঙ্গটি লাতিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার মাধ্যমে এই 'তৃতীয় তরঙ্গ' তার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গণতন্ত্রের অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটায়।

এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধ ও গ্রন্থ দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান-এ দাবি করেছিলেন যে, আদর্শগত বিবর্তনের চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রই মানবজাতির সর্বজনীন শাসনব্যবস্থা হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে।

তবে, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের অভিজ্ঞতা ফুকুয়ামার সেই রৈখিক ও আশাবাদী ইতিহাস-ভাবনাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের বিকাশের ধারা কোনো ঊর্ধ্বমুখী রেখা অনুসরণ করেনি; বরং এটি প্রবেশ করেছে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’-এর যুগে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ল্যারি ডায়মন্ড এই সময়কালকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ডেমোক্রেটিক রিসেশন’ বা 'গণতান্ত্রিক মন্দা' হিসেবে। রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, বিশ শতকের শেষার্ধে বিশ্বজুড়ে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছিল, একবিংশ শতাব্দীতে এসে তার বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিন্যাসে গণতন্ত্রের বিকাশের ধরন বা প্যাটার্নটি অতীতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের পতন ঘটেছিল প্রধানত হঠাৎ করে সামরিক অভ্যুত্থান, রক্তক্ষয়ী বিপ্লব কিংবা প্রত্যক্ষ স্বৈরাচারী দখলের মাধ্যমে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ধস নামছে নীরব, ধীর ও সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায়। আজ গণতন্ত্র কেবল কোনো বাইরে থেকে আসা সশস্ত্র আক্রমণ বা সামরিক ট্যাংকের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে না; বরং এটি ধসে পড়ছে ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান, ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে।

গণতন্ত্রের প্যারাডাইম শিফট: ক্যু থেকে স্বৈরতান্ত্রিক পপুলিজম

একবিংশ শতাব্দীতে কর্তৃত্ববাদের চরিত্র ও কৌশলগত কাঠামোর এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। বিংশ শতাব্দীর স্বৈরাচারী শাসকরা সরাসরি সংবিধান স্থগিত করতেন, সংসদ ভেঙে দিতেন এবং সামরিক আইনের মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করতেন। কিন্তু সমকালীন বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী নেতারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবলাট তাঁদের প্রভাবশালী গ্রন্থ ‘হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই’ (২০১৮)-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক গণতন্ত্রের মৃত্যু আর সামরিক ব্যারাকে ঘটছে না, বরং ঘটছে 'ব্যালট বাক্সের ভেতর দিয়ে'।

বর্তমানে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা শুরুতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন এবং পরে সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বকরণ, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং নির্বাচনী সংস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার একচ্ছত্র বিস্তার ঘটান। এই প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘এক্সিকিউটিভ অ্যাগ্র্যান্ডাইজমেন্ট’ বা 'নির্বাহী ক্ষমতার স্বৈরাচারী সম্প্রসারণ' বলা হয়। এটি কোনো একদিনে ঘটে না; বরং ধাপে ধাপে, আইনের সূক্ষ্ম গলি ব্যবহার করে এবং সাংবিধানিক কাঠামোর আড়ালেই সম্পন্ন হয়। ফলে সাধারণ নাগরিকরা তাৎক্ষণিকভাবে টের পান না যে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ হরণ করা হচ্ছে।

এই কৌশলের মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নিয়েছে 'ইলেকটোরাল অটোক্রেসি' বা 'হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা'। এই ব্যবস্থায় নিয়মিত ব্যবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং দৃশ্যমান বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক দল থাকে, কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য ও অবাধ প্রতিযোগিতা এমনভাবে নষ্ট করা হয় যে বিরোধীদের পক্ষে নির্বাচনে জয়ী হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ভিক্টর ওরবানের নেতৃত্বে হাঙ্গেরি একুশ শতকের ‘ইলিবারেল’ বা ‘উদারনীতিহীন গণতন্ত্র’-এর নিখুঁত মডেলে পরিণত হয়েছে। সেখানে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা সরকারি ঘনিষ্ঠদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং নির্বাচনী আইন পরিবর্তন করে ক্ষমতাসীন 'ফিদেজ' দলকে স্থায়ী সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালে ভিক্টর ওরবান নিজেই এক বিখ্যাত বক্তৃতায় আনুষ্ঠানিকভাবে হাঙ্গেরিকে একটি উদারনীতিহীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।

রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হলেও ধীরে ধীরে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ, সংবাদমাধ্যম দমন এবং ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক ক্যু-এর পরবর্তী জরুরি অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অতি-রাষ্ট্রপতিশাসিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভেনিজুয়েলায় উগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর শাসনকাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উভয় ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধী দলগুলোকে কৌশলে দুর্বল বা নিষিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে নির্বাচনকে কেবল নিজেদের বৈধতা অর্জনের সংকেতে পরিণত করা হয়েছে।

এই প্যারাডাইম শিফট বা কৌশলগত রূপান্তর আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক প্রতীক 'নির্বাচন' কে বাঁচিয়ে রেখে তার আত্মাকে (আইনের শাসন, মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমতা) ধ্বংস করে দেয়।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নব্য-উদারবাদের ব্যর্থতা

একুশ শতকে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম প্রধান আর্থ-সামাজিক অনুঘটক হলো নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর চরম ব্যর্থতা। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগে মার্গারেট থ্যাচার ও রোনাল্ড রেগানের সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া নব্য-উদারবাদ মূলত বাজারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারীকরণ, রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক খাতের সংকোচন এবং কর হ্রাসের ওপর জোর দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে দাবি করা হয়েছিল যে, বাজার-চালিত এই ব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেবে। তবে বাস্তবতার চিত্র হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত।

নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ বিশ্বজুড়ে যে কাঠামোগত অসাম্য ও বৈষম্য তৈরি করেছে, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি ‘রাজনৈতিক সমতা’ কে অর্থহীন করে তুলেছে। থমাস পিকেটি তাঁর গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি-তে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, পুঁজির রিটার্নের হার (আর) যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার (জি) অপেক্ষা বেশি হয়, তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় আয়ের সিংহভাগ সমাজ বা রাষ্ট্রের শীর্ষ এক শতাংশ (টপ ১%) সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি স্থবির কিংবা ক্রমহ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক বৈষম্য নাগরিকদের কাছে গণতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এই গভীর ধারণার জন্ম হয়েছে যে, বিদ্যমান প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামো বাস্তবে আমজনতার কল্যাণে কাজ করছে না; বরং এটি বহুজাতিক কর্পোরেশন, অর্থশালী গোষ্ঠী এবং সুবিধাভোগী 'এলিট' শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক খোলসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কলিন ক্রাউচ কপিং উইথ পোস্ট ডেমোক্রেসি (২০০৪) গবেষণাপত্রে এই অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘পোস্ট ডেমোক্রেসি’ বা 'উত্তর-গণতন্ত্র' হিসেবে যেখানে বহিরাঙ্গনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ টিকে থাকলেও মূল নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয় সাধারণের অলক্ষ্যে, অর্থশালী সুবিধাভোগী চক্রের বন্ধ কক্ষে।

বিশেষ করে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং তৎপরবর্তী কঠোর অর্থনৈতিক সংকোচন নীতি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনের আস্থায় চরম আঘাত হানে। বামপন্থী কিংবা ডানপন্থী যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, টেকনোক্র্যাট কেন্দ্রিক নীতিমালার কারণে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে নাগরিক সমাজ ঐতিহ্যবাহী মূলধারার সামাজিক-গণতান্ত্রিক বা রক্ষণশীল দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চরম হতাশা প্রকাশ করতে শুরু করে, যা নব্য-উদারবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন স্বৈরতান্ত্রিক পপুলিজমের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

পপুলিজম, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরিচয়ের রাজনীতি

নব্য-উদারবাদী কাঠামোর অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থার ফলশ্রুতিতে একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটেছে 'পপুলিজম' ও ক্ষতিকর রাজনৈতিক মেরুকরণের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জান-ওয়ার্নার মুলার তাঁর হোয়াট ইজ পপুলিজম? গ্রন্থে পপুলিজমকে এমন এক রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন, যা সমাজকে কৃত্রিমভাবে দুটি বিপরীতমুখী ও অলঙ্ঘনীয় শিবিরে বিভক্ত করে: "একদিকে খাঁটি ও বঞ্চিত সাধারণ জনগণ" এবং "অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত, বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এলিট"।

একবিংশ শতাব্দীর পপুলিজম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বিকশিত হয়েছে: একটি হলো ডানপন্থী পপুলিজম। এটি মূলত অর্থনৈতিক ক্ষোভের সাথে সাংস্কৃতিক ভয় ও জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের রাজনীতিকে যুক্ত করে। তারা অভিবাসী, ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু এবং বৈশ্বিক বিশ্বায়নকে সকল সামাজিক সমস্যার জন্য দায়ী করে। আর অন্যটি বামপন্থী পপুলিজম। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপর জোর দিয়ে অর্থশালী কর্পোরেট শ্রেণি ও বৈশ্বিক পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানায়।

তবে ডান কিংবা বাম উভয় প্রকার পপুলিজমই গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক, কারণ তারা বহুমাত্রিকতা বা বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে। পপুলিস্ট নেতারা নিজেদের "একমাত্র জনগণের আসল প্রতিনিধি" হিসেবে দাবি করেন এবং তাদের বিরোধীদের কেবল 'রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ' নয়, বরং 'জনগণের শত্রু' বা 'দেশদ্রোহী' হিসেবে চিত্রায়িত করেন।

এই রাজনৈতিক ধারণার কারণে সমাজে তৈরি হয়েছে গভীর 'আবেগজনিত মেরুকরণ'। সমাজে কেবল নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ভিন্নমত থাকছে না; বরং নাগরিকদের মধ্যকার সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাতেও শত্রুভাবাপন্ন বিভাজন তৈরি হচ্ছে। স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র দুটি অদৃশ্য প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির ওপর ভর করে টিকে থাকে: পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম। পপুলিস্ট রাজনীতি এই দুটি অপরিহার্য রীতিনীতিকেই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবাদের উত্থান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পপুলিস্ট প্রচারণার ফলে আমেরিকান সমাজে যে অভাবনীয় দ্বিপাক্ষিক মেরুকরণ ঘটেছে, তার চরমতম প্রকাশ ঘটেছিল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল আক্রমণের মাধ্যমে। সেখানে নির্বাচনের আইনগত ফলাফলকে অস্বীকার করে সরাসরি গণতান্ত্রিক হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার নজিরবিহীন চেষ্টা চালানো হয়।

ইউরোপের পোল্যান্ডে 'ল অ্যান্ড জাস্টিস' দল কিংবা ফ্রান্সে মারিন ল্য পেনের আন্দোলন এবং ইউরোপ জুড়ে অতি-ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান জাতিগত পরিচয়ের রাজনীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বিরোধী পপুলিজমকে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং পরিচয়ের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচন জয়ের কৌশল বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনাকে মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখানে সংখ্যালঘুদের নাগরিক মর্যাদা ও অধিকারকে প্রান্তিকীকরণ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করা হচ্ছে।

পরিচয়ের এই আগ্রাসী রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা শেষ পর্যন্ত নাগরিক সমাজকে এতটাই বিভক্ত করে ফেলে যে, সাধারণ মানুষ একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক বিতর্ক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ, নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পথ প্রশস্ত হয়।

অপতথ্যের আগ্রাসন ও ডিজিটাল নজরদারি

একবিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে ধারণ করা হয়েছিল যে, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের অবারিত বার্তা ছড়িয়ে দেবে এবং স্বৈরাচারী শাসকদের পতন ঘটাবে যেমনটি ২০১০ সালের ‘আরব বসন্ত’ এর সূচনায় দেখা গিয়েছিল। তবে দেড় দশকের ব্যবধানে সেই প্রযুক্তিই উল্টে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার অন্যতম ঘাতক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত ‘ডিজিটাল মুক্তিসাধন’ বাস্তবে পরিণত হয়েছে ‘ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র’ এবং ইনফরমেশনাল ডিসরাপশনে।

প্রখ্যাত মার্কিন সামাজিক বিজ্ঞানী হার্ভার্ডের অধ্যাপিকা শশানা জুবফ তাঁর আলোচিত দ্য এজ অব সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তিশিল্প বিশ্বব্যাপী মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক আবেগ ও মনস্তত্ত্বকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করেছে। এই ‘সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম’ কেবল বিজ্ঞাপনের কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং এটি ব্যবহৃত হচ্ছে নাগরিকদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ভোটাধিকারকে প্রভাবিত ও ম্যানিপুলেট করার কাজে।

ডিজিটাল যুগে গণতন্ত্রের ব্যর্থতার পেছনে প্রযুক্তি খাত সম্পর্কিত তিনটি প্রধান কার্যকারণ সক্রিয়। প্রথমত, অ্যালগরিদমীয় মেরুকরণ ও ইকো-চেম্বার। ফেসবুক, এক্স কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হয়েছে ব্যবহারকারীকে ধরে রাখার নীতিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, গঠনমূলক বা যুক্তিনির্ভর সংবাদের চেয়ে উসকানিমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ ও চরমপন্থী কনটেন্ট অ্যালগরিদমে বেশি ছড়ায়। ফলে নাগরিকরা নিজ নিজ মতাদর্শের ‘ইকো-চেম্বারে’ বন্দি হয়ে পড়ে, যা সামাজিক সংহতি ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, তথ্যের বিষাক্তকরণ ও অপতথ্য যুদ্ধ। ফেক নিউজ, ডিপফেক ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বটের সাহায্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমত বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। রাশিয়ার ইন্টারনেট রিসার্চ এজেন্সি কর্তৃক ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে যে, কীভাবে উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট মানসিকতার ভোটারদের প্রভাবিত করা যায়।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল নজরদারি ও আইনি নিপীড়ন। আধুনিক কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিরোধীদলীয় নেতা, বিচারক ও সাংবাদিকদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর নীতিমালার দোহাই দিয়ে মুক্তচিন্তা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং নাগরিক প্রতিবাদ দমন করা হচ্ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার তথ্যের যে মহাসমুদ্র তৈরি করেছে, সেখানে ‘সত্য’ ও ‘মিথ্যা’-র মধ্যকার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক আলোচনার ভিত্তি হলো বস্তুনিষ্ঠ সত্যের উপস্থিতি; ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র সেই ভিত্তিকেই বিষাক্ত করে তুলেছে।

ভূ-রাজনীতি ও কর্তৃত্ববাদী মডেলের আকর্ষণ

একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সংকটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুঘটক হলো বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে রূপান্তর। বিংশ শতাব্দীর শেষে সোভিয়েত পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের যে ‘একমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে উঠেছিল, তা বিশ্বব্যাপী উদারনৈতিক গণতন্ত্র বিস্তারে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বব্যবস্থা বহুমেরুর দিকে ধাবিত হয়েছে, যা সমান্তরালভাবে বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলোর হাতকে শক্তিশালী করেছে।

বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা উদারনৈতিক আধিপত্যের অবক্ষয় এবং তার বিপরীতে চীনা ও রুশ প্রভাবের পুনরুত্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ধরে রাখার তাগিদ হ্রাস করেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ হলো:

‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ এবং চীনা মডেলের আকর্ষণ

বিগত চার দশকে চীন কোনো প্রকার পশ্চিমা স্টাইলের বহুপক্ষীয় গণতন্ত্র বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়াই কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে এবং নিজেকে দ্বিতীয় বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছে। এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সাফল্য বিশ্বজুড়ে একটি নতুন ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করেছে,‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র অপরিহার্য নয়; বরং কঠোর শাসনব্যবস্থা বা কর্তৃত্ববাদ অধিক কার্যকর’।

গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক শাসক এখন পশ্চিমা শর্তযুক্ত অর্থায়নের চেয়ে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর মতো বিনা শর্তের অবকাঠামোগত অর্থায়নকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। এর ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক যে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ছিল, তা অনেকাংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার স্বৈরতান্ত্রিক রপ্তানি ও সংঘাত

ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার জন্য কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অতি-ডানপন্থী ও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিগুলোকে অর্থ ও সাইবার সহায়তা দেওয়া, তথ্যযুদ্ধ চালানো এবং বেসরকারি সামরিক বাহিনী (যেমন: ওয়াগনার গ্রুপ) পাঠানোর মাধ্যমে রাশিয়া কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে বা প্রসার ঘটাচ্ছে।

বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলোর অকার্যকারিতা

জাতিসংঘ, ইউরো-অ্যাটলান্টিক ব্লক কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান স্বৈরাচার, ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সার্বজনীনতাকে অকার্যকর করে তুলেছে।

পশ্চিমা বিশ্ব নিজেই যখন ইরাক আক্রমণ, অভিবাসী সংকট, অভ্যন্তরীণ পপুলিজম কিংবা ডবল-স্ট্যান্ডার্ড (দ্বিমুখী নীতি)-র কারণে নিজেদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তখন উদীয়মান স্বৈরাচারী শাসকরা বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে গণতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস পাচ্ছে।

একুশ শতকের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের যে চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক গোলযোগ নয়; বরং এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত সংকট। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জেগে ওঠা আশার আলোকবর্তিকা এবং ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ সংক্রান্ত স্বস্তিদায়ক বয়ান আজ ফিকে হয়ে গেছে। স্পষ্টতই, গণতন্ত্রের এই ব্যাকস্লাইডিং বা পশ্চাদপসরণ কোনো বাইরে থেকে বয়ে আনা আকস্মিক বিপর্যয় নয়। এটি মূলত নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ থেকে উদ্ভূত চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, পপুলিস্ট রাজনীতির দ্বারা ঘটিত সামাজিক মেরুকরণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক তথ্যের অপব্যবহার এবং ভূ-রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বহুমুখী পরিবর্তনের এক পুঞ্জীভূত ও সমন্বিত ফসল।

তবে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন বাস্তবতা গণতন্ত্রের অমোঘ মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করে না; বরং এটি শাসনব্যবস্থাটিকে নতুন করে পর্যালোচনা ও সংস্কারের এক ঐতিহাসিক তাগিদ দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ রোধ করতে এবং একে পুনরায় গতিশীল করতে হলে নিম্নে বর্ণিত বহুমুখী কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

প্রাতিষ্ঠানিক সংযম ও সুরক্ষাকবচের পুনর্গঠন

গণতন্ত্রকে কেবল নিয়মিত ‘ভোট প্রদান বা নির্বাচনের অনুষ্ঠান’ হিসেবে দেখলে চলবে না; একে আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দানকারী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং মানবাধিকার কমিশনগুলোর স্বায়ত্তশাসন আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সাথে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে ‘পারস্পরিক সহনশীলতা’ এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক সংযম’-এর চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে নির্বাহী বিভাগ একক স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে না পারে।

অর্থনৈতিক সমতা ও টেকসই জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র

নব্য-উদারবাদী কাঠামোর যে চরম ব্যর্থতা সাধারণ মানুষকে গণতন্ত্রের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে, তার জায়গা স্থলাভিষিক্ত করতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি। রাষ্ট্রকে কেবল বাজার-ব্যবস্থার নিষ্ক্রিয় দর্শক না হয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। থমাস পিকেটিসহ আধুনিক অর্থশাস্ত্রীদের পরামর্শ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সম্পদ কর ও প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রয়োগ এবং জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ নাগরিক অনুভব করেন যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও অ্যালগরিদম-নির্ভর জবাবদিহি

প্রযুক্তির বিষাক্ত ছায়া থেকে নাগরিক মানসিকতা ও স্বাধীন মতামতকে রক্ষা করতে হলে বিগ-টেক কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর আইনি তদারকি ও নজরদারি প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম কীভাবে জনমত গঠন করছে এবং উসকানিমূলক বা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, তার স্বচ্ছতা ও আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নজরদারি পুঁজিবাদ রোধে কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক তথ্যের বিকৃতি ও ডিপফেক প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক স্তরে ঐক্যবদ্ধ নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

নাগরিক সমাজ ও সক্রিয় গণমাধ্যমের পুনরুজ্জীবন

যেকোনো টেকসই গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো একটি সচেতন, চিন্তাশীল ও স্বাধীন ‘পাবলিক স্পিয়ার’ বা জনপরিসর। সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের আর্থিক ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারে। পাশাপাশি, তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং যুব সমাজকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে রাজনীতির ওপর এলিট শ্রেণির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের এই সত্যটি স্বীকার করতেই হবে যে, একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের ব্যর্থতা মূলত এর মৌলিক আদর্শের ব্যর্থতা নয়; এটি হলো গণতন্ত্রকে যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছে সেই চর্চা ও কাঠামোর ব্যর্থতা। গণতন্ত্র কোনো স্থবির বা চূড়ান্তভাবে অর্জিত কোনো বস্তু নয়, যাকে একবার প্রতিষ্ঠা করে দিলেই চিরকাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকবে। এটি একটি অনবরত চর্চা ও সংস্কারের গতিশীল প্রক্রিয়া।

গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে একে কেবল ‘ভোটের উৎসব’ বা আনুষ্ঠানিকতার খোলস থেকে বের করে এনে একটি মানসম্মত, অংশগ্রহণমূলক এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সুনিশ্চিতকারী শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। তবেই একুশ শতকের উদীয়মান স্বৈরতান্ত্রিক অন্ধকার দূর করে একটি সাম্যবাদী, মানবতাবাদী ও টেকসই বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত