
নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো! আমরা কি শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্যই খাই? যদি তাই হতো, তবে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট এলাকার সবাই প্রতিদিন একই রকম খাবার খেয়েই বেঁচে থাকত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। খাবার কেবল আমাদের ক্ষুধাই মেটায় না, বরং মানবদেহের অনেক অনুভূতিকেও নাড়া দেয়। তাই খাবারের স্বাদ, গন্ধ, বাহ্যিক রূপ এবং কার শরীরে কোন খাবার কেমন প্রভাব ফেলছে—এমন অনেক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।
খাবারের সামাজিক অবস্থানও (স্ট্যাটাস) একটি বড় বিষয়! একজন নিম্নবিত্ত মানুষ মুরগীর মাংস যেভাবে খান, একজন উচ্চবিত্ত মানুষ হয়তো খান একটু ভিন্নভাবে। এখানে মুরগী ধ্রুব হলেও অপরাপর বিষয় গুলি ভিন্ন। খাবারের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি, ধর্ম, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, এমনকি পারিবারিক স্মৃতিও জড়িত থাকে। মাছে-ভাতে বাঙালি বললেই আমরা খাদ্যাভ্যাস টা বুঝে ফেলি!
সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় খাবার খাওয়ার সময় আমরা সাধারণত রোগের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা ভাবি না। কোনো নির্দিষ্ট খাবারের ব্যাপারে চিকিৎসকের আপত্তি থাকলে বড়োজোর সতর্কতা অবলম্বন করি! কিন্তু আমরা কি খাবার টেবিলে বসার সময় ক্যানসারের মত জটিল প্রাণঘাতী রোগের কথা মাথায় রাখি? খাবার টা স্বাদ ছিলো কিনা, আমার ক্ষুধা নিবারণ হয়েছে কিনা, খাবার টা পাওয়া যাচ্ছে কিনা এবং সেটা আমার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আছে কিনা, এগুলোই থাকে মূল আলাপ। কতজন মানুষ চিন্তা করেন যে এই খাবারটি দীর্ঘদিন ধরে খেতে থাকলে ক্যানসার ঝুঁকিতে পড়তে হবে? বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে আজ আমরা খাদ্যাভ্যাসে ক্যানসারের ঝুঁকি বিষয়টি নিয়ে আলাপ করব।
ক্যানসার কোনো একক কারণের রোগ নয়। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, অ্যালকোহল, শরীরের অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, সংক্রমণ, পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাস—সব মিলিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাদ্যাভ্যাস, শরীরের অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন পরিবর্তনযোগ্য উপসর্গ ক্যানসারের কারণ বোঝার এবং শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবু খাবারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা প্রতিদিন খাই এবং বছরের পর বছর ধরে খাই। ফলে কোনো খাবারের সঙ্গে যদি দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসার ঝুঁকির সম্পর্ক থাকে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত। কেননা ক্যানসার ফিরে আসার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই একই খাদ্যাভ্যাস দায়ী থাকে। এ বিষয়ে বিজ্ঞান আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ‘প্রসেসড মিট’ বা প্রক্রিয়াজাত মাংস। এটি এমন মাংস যা দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য লবণ দেওয়া, কিউরিং, স্মোকিং, ফারমেন্টেশন বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। সসেজ, হ্যাম, বেকন, সালামি, হটডগ বা কর্নড বিফ হলো এর পরিচিত উদাহরণ।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) প্রসেসড মিট কে মানুষের জন্য কার্সিনোজেনিক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এই ধরনের খাবারের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্কটি পাওয়া গেছে কোলোরেক্টাল ক্যানসার, অর্থাৎ বৃহদন্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসারের। বিশ্ব ক্যানসার গবেষণা তহবিলও প্রসেসড মিট যতটা সম্ভব কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়।
এখানে একটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। প্রসেসড মিটকে কার্সিনোজেনিক বলা মানে এই নয় যে একদিন সসেজ খেলে একজন মানুষের ক্যানসার হবে। ক্যানসারের ঝুঁকি একদিনে তৈরি হয় না। গবেষণায় বলে, নিয়মিত এবং বেশি পরিমাণে এধরণের খাবার গ্রহণের সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইএআরসি মূল্যায়নে প্রতিদিন ৫০ গ্রাম প্রসেসড মিট খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসার-এর ঝুঁকি আনুমানিক ১৮ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। এই ১৮% মানে এমন নয় যে ১০০ জনের মধ্যে ১৮ জনের ক্যানসার হবে। এটি আপেক্ষিক ঝুঁকির পরিবর্তন। একজন ব্যক্তির প্রকৃত ঝুঁকি তাঁর বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাপন এবং অন্যান্য কারণের ওপরও নির্ভর করে। এরকম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রসেসড মাংস সেই ক্যানসার ঝুঁকি কে আরও ১৮% বাড়িয়ে দিতে পারে!
এখন তাহলে টাটকা গরু বা ছাগল এর মাংসের কী হবে? এই অংশ টুকু আলোচনা করার ছোট্ট একটি সামাজিক ঝুঁকি রয়েছে। তবুও আলাপ টা জরুরি।
গরু, ছাগল, ভেড়া বা শুকর এর মাংসকে রেড মিট বলা হয়। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রেড মিট হলো স্বাদের এবং সামাজিক অবস্থানের সবচেয়ে উপরের স্তরের খাবার। বলতে শোনা যায়, ‘মাংস না খেতে পারলে বেঁচে থেকে কি লাভ!’ কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখানে আমাদেরকে কিছুটা হতাশ করে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ এর মতো রোগ গুলোকে বাদ দিয়ে আলাপ করলেও রেড মিটের সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে প্রসেসড মিট-এর তুলনায় এভিডেন্সের প্রকৃতি বেশ আলাদা।
উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের কথা বাদ দিলেও, রেড মিটের সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে প্রক্রিয়াজাত মাংসের মতো এর প্রমাণ অতটা জোরালো নয়। ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড রেড মিটকে ক্যানসারের একটি সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করে। তাই তারা নিয়মিত বেশি মাংস খাওয়ার বদলে পরিমিত খাওয়ার পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ, ‘গরুর মাংস মানেই ক্যানসার’—কথাটি যেমন ভুল, তেমনি ‘গরুর মাংসের সঙ্গে ক্যানসারের কোনো সম্পর্ক নেই’—এটিও অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞানের অবস্থান ঠিক এই দুইয়ের মাঝামাঝি।
গবেষকরা মনে করেন, রেড মিট-এর হিম নামের একটি উপাদান অন্ত্রে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে যা অন্ত্রের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মাংসকে খুব বেশি তাপমাত্রায় রান্না করলেও হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বনস—এর মতো কিছু রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। এসব বায়োলজিক্যাল মেকানিজম নিয়ে জানা জরুরি কারণ এগুলি থেকেই বোঝা যায় কেন মিট প্রিপারেশনও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আগুনে সরাসরি পুড়ে যাওয়া মাংসে কিছু সম্ভাব্য কার্সিনোজেনিক কমপাউন্ড তৈরি হতে পারে। মানুষের ক্যানসার রিস্ক এর ক্ষেত্রে যদিও এ বিষয়ের তথ্য উপাত্ত প্রসেসড মিট এর মতো শক্তিশালী নয়, তবুও অতিরিক্ত পোড়া মাংস বা কাবাবের কালো হয়ে যাওয়া অংশ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
উপরে এতক্ষণ যা আলোচনা করা হলো তা কেবল ভালো মানের প্রক্রিয়াজাত খাবার ও টাটকা মাংস নিয়ে। কিন্তু ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে যদি অস্বাস্থ্যকরভাবে মাংস সংরক্ষণ করা হয়? অথবা অস্বাভাবিকভাবে গরু-ছাগল মোটাতাজাকরণ এবং পশু খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়? তাহলে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা একবার চিন্তা করুন!
আমরা আলোচনায় কেনো প্রসেসড ফুড, মাংস, সুগারী আইটেম নিয়ে এত গুরুত্ব দিচ্ছি? কারণ ২০০৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুর্যোর গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের মানুষের খাবার টেবিল থেকে ভাত ২৫.২ % কমে গেছে। আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা ভালো হচ্ছে। আমরা এখন ভাত কম খাই, মাংস খেতে পারি। কিন্তু সেই মাংস নিরাপদ কি না বা মাংস গ্রহণ করার পরিমাণ কতটুকু হওয়া উচিত অথবা প্রোটিনের সঙ্গে খাবারের অন্য উপাদান গুলিও আমরা সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করছি কি না—এমন অনেক গুলো প্রশ্ন থেকে যায়।
আমাদের একটি সরল ধারণা হচ্ছে—যেকোনো ধরনের ফল বা সবজি খেলেই আমাদের ফাইবার চাহিদা পূরণ হয়। বিষয় টা মোটেও এমন নয়। অনেক গুলো ফল, সবজি খেলেও হিসাব করে দেখা যাবে খুবই নগণ্য পরিমাণ ফাইবার শরীরে প্রবেশ করছে। অতিরিক্ত রেড মিট যেভাবে কোলাক্টেরাল ক্যানসারের ঝুঁকি কে ট্রিগার করতে পারে, একই ভাবে খাবারে ফাইবারের অপূর্নতাও সেই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ক্যানসার এবং খাবারের সম্পর্কের আরেকটি শক্তিশালী অধ্যায় হলো অ্যালকোহল। বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে অ্যালকোহল হয়তো পশ্চিমা দেশের মতো ততটা সাধারণ নয়। কিন্তু বৈশ্বিক ক্যানসার বার্ডেনের দিকে তাকালে এর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। অ্যালকোহল মুখ, গলা, খাদ্যনালি, লিভার, স্তন এবং কোলোরেক্টাল ক্যানসারসহ একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যালকোহলকে একটি গ্রুপ ওয়ান কার্সিনোজেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে শহুরে জীবনে ক্যানসারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়াচ্ছে ‘আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড’ বা অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, বিস্কুট, কনফেকশনারি, রেডি-টু-ইট খাবার এবং নানা ধরনের কোমল পানীয় আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাবার গ্রহণের সঙ্গে ক্যানসার ও হৃদরোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে, প্রক্রিয়াজাত প্রতিটি খাবারই সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে। গবেষণায় সম্পর্ক পাওয়া আর নিশ্চিত কারণ প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। যারা এসব খাবার বেশি খান, তাদের ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা এবং সামগ্রিক জীবনযাপন ভিন্ন হতে পারে। তাই এ বিষয়ে এখনও বিস্তর গবেষণা চলছে।
ক্যানসার গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘চিনি কি ক্যানসার সৃষ্টি করে?’
এই প্রশ্নের উত্তর ততটা নাটকীয় নয় যতটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সচরাচর দেখা যায়। ‘চিনি ক্যানসার সেলকে খাওয়ায়, তাই চিনি বন্ধ করলেই ক্যানসার বন্ধ হয়ে যাবে’—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। এগুলো দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শরীরের ওজন বাড়তে পারে, আর ওভারওয়েট এবং ওবেসিটি বহু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। আইএআরসি-এর ক্যানসার প্রিভেনশন গাইডেন্সেও উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাদ্য, ওবেসিটি এবং ক্যানসার রিস্ক-এর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ তাই শুধু চিনিকে ভয় না পেয়ে, আমাদের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের খাদ্য-ঝুঁকি হলো ‘আফলাটক্সিন’। অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাদ্যশস্যে এক ধরনের বিষাক্ত ছত্রাক জন্মায়। ফসল কাটার পর তা পর্যাপ্ত রোদে না শুকিয়ে গুদামজাত করলে এই ছত্রাকের আক্রমণ বাড়ে। নিয়ম অনুযায়ী, সংরক্ষণ করা শস্যে আর্দ্রতার মাত্রা ১৪% এর নিচে (গমের ক্ষেত্রে ৭%) থাকা উচিত। বাংলাদেশে ধান বা গমের চেয়ে ভুট্টা ও চিনাবাদামে এই বিষাক্ত আফলাটক্সিন বেশি পাওয়া যায়। চিন্তার বিষয় হলো, এই ভুট্টা দিয়ে তৈরি পোলট্রি ফিড মুরগি খায়। আর সেই মুরগির মাংস খাওয়ার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আমরাও এই বিষাক্ত উপাদানের শিকার হচ্ছি। যেসব শস্য মানুষের খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, সেগুলোই মূলত পশু বা মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুরগি থেকে কীভাবে এই আফলাটক্সিন মানুষের শরীরে ঢোকে, তা নিয়ে বাংলাদেশ খাদ্য মন্ত্রণালয়ও সতর্কতামূলক প্রচারণা চালায়।
দীর্ঘদিন ধরে এই আফলাটক্সিন শরীরে প্রবেশ করলে লিভার ক্যানসারের প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশে লিভার ক্যানসারের অবস্থান তৃতীয়। হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি কিংবা ফ্যাটি লিভারের পাশাপাশি খাদ্যে থাকা এই আফলাটক্সিন লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ।
ছত্রাক আক্রান্ত খাবারের জন্য শুধু মুরগি বা পশুখাদ্যকে দায়ী করলেই হবে না। আমাদের সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। গুদামঘর শুকনো ও বাতাস চলাচলের উপযোগী কি না, বা সেখানে আর্দ্রতা ঠিকমতো মাপা হয় কি না—তা আমরা নিশ্চিত নই। এছাড়া রেশন বা বাজারে আসার আগে ছত্রাকযুক্ত শস্য আলাদা করা হচ্ছে কি না, আমাদের দেশের বাস্তবতায় তা নজরদারি করাও বেশ কঠিন।
এছাড়াও আমাদের খাদ্যাভ্যাস এর মধ্যে হানি নাট, মধুময় বাদামের মতো নয়া সংযোজনও ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু এই বাদামগুলো ছত্রাক আক্রান্ত ছিল কি না, তা কে নিশ্চিত করবে? ফাইবার যুক্ত চাল বা লাল গমেও এই ছত্রাক সহজে জন্মায়। কারণ, এই চালের গায়ে প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা ফ্যাট থাকে। ফাইবার যুক্ত খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হলেও, বর্ষার আগে ও পরে ঘরে সংরক্ষিত চাল-গমে সহজেই ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে।
বিএসএমএমইউ-এর জনসংখ্যা-ভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মোট নতুন শনাক্ত হওয়া ক্যানসার রোগীদের মধ্যে প্রায় ১২.৯% রোগী লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর লিভার ক্যানসারে প্রায় ২,৮৮৪ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়। উন্নত বিশ্বে সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে এই ক্যানসার বেশি দেখা গেলেও বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম বয়সে মানুষ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণায় বলছে, আক্রান্তদের গড় বয়স ৪৫ থেকে ৫০ বছর এবং ১৮ থেকে ৭৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এত ইয়াং অবস্থায় লিভার ক্যানসার হবার কারণ গুলো খতিয়ে দেখবার দাবি রাখে৷
আপনি হয়তো স্বাস্থ্যকর ভেবেই লাল আটা বা হানি নাট কিনছেন। কিন্তু সংরক্ষণের ভুলে সেগুলো বিষাক্ত হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে, বাজার থেকে বা সরকারিভাবে আমদানি করা চাল-গম ছত্রাকমুক্ত কি না। অর্থাৎ, এখানে ক্যানসারের ঝুঁকি খাবারের উপাদান থেকে আসছে না, বরং আসছে ভুল সংরক্ষণ ও ভেজালের কারণে। তাই ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য শুধু ‘স্বাস্থ্যকর খাবার খান’ বললেই হবে না। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সঠিক সংরক্ষণ এবং উন্নত কৃষি ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরেকটি দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয় হলো অতিরিক্ত লবণ এবং সল্ট-প্রিজার্ভড ফুড। এসব খাবারের সঙ্গে স্টমাক ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ইনফেকশনের মতো অন্যান্য ঝুঁকি থাকলে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আইএআরসি এর ক্যানসার প্রিভেনশন এভিডেন্স-এ সল্ট-প্রিজার্ভড ফুডস এবং স্টমাক ক্যানসারের সম্পর্কও আলোচিত হয়েছে।
‘লবণ খেলেই পাকস্থলীর ক্যানসার হয়’—এটি ভুল। সঠিক কথাটি হলো, অতিরিক্ত লবণ এবং কিছু সল্ট-প্রিজার্ভড খাবারের সঙ্গে স্টমাক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই পার্থক্যগুলো হয়তো সাধারণ পাঠকের কাছে খুব টেকনিক্যাল মনে হতে পারে। কিন্তু ক্যানসার নিয়ে দায়িত্বশীল আলাপের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, কোনো কিছুর সঙ্গে ‘সম্পর্ক থাকা’ আর সেটিই ‘একমাত্র কারণ হওয়া’ এক বিষয় নয়। একইভাবে ‘ঝুঁকি বেড়েছে’ আর ‘আপনার ক্যানসার হবে’—এ দুটিও এক কথা নয়। ক্যানসারের ক্ষেত্রে আমাদের এই ভাষাগত সতর্কতা জরুরি খুব দরকার। কারণ একটি ভুল হেডলাইন একজন সুস্থ মানুষকে অযথা ভয় পাইয়ে দিতে পারে, আবার একজন রোগীকে ভুল চিকিৎসার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ভোক্তা-স্বার্থের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক আদেশে আদালত প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যে উচ্চমাত্রার চিনি, চর্বি ও লবণের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করার ওপর জোর দিয়েছে। অর্থাৎ, প্যাকেটের পেছনে অতি ক্ষুদ্র অক্ষরে উপাদানের তালিকা লিখে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বরং ভোক্তার চোখে পড়ার মতো করে সামনের অংশেই সতর্কীকরণ চিহ্নে জানাতে হবে ‘হাই সুগার’ ‘হাই ফ্যাট’ ‘হাই সল্ট’।
এই উদ্যোগের মূল কথা হলো ভোক্তাকে পণ্য কেনার আগে তার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সহজ ও স্পষ্টভাবে জানার সুযোগ দেওয়া। শুধু প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআই-এর সিল দেখেই কোনো খাবারকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের এই পদক্ষেপ তাই আমাদেরও ভাবতে বাধ্য করে—‘প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআই লেখা দেখেই কি আমরা সত্যিই নিরাপদ খাবার খাচ্ছি বলে ধরে নিতে পারি?’
আমাদের আরেকটি বিপজ্জনক অভ্যাস হলো ‘একটি খাবার’কে কেন্দ্র করে ক্যানসার প্রিভেনশনের পুরো গল্প তৈরি করা। কখনো বলা হয় হলুদ ক্যানসার প্রতিরোধ করে। কখনো রসুন, কখনো গ্রিন টি। কখনো কোনো একটি ফলকে ‘ক্যানসার-কিলিং ফুড’ বলা হয়। এসব দাবির পেছনে ল্যাবরেটরি রিসার্চ থাকতে পারে। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে কোনো কমপাউন্ড ক্যানসার সেলের ওপর প্রভাব ফেলেছে মানেই মানুষের মধ্যে সেই খাবার ক্যানসার প্রতিরোধ করে—এমন নয়।
মানুষের ক্যানসার রিস্ক বোঝার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এপিডেমিওলজিক্যাল স্টাডিজ, প্রসপেক্টিভ কোহোর্টস, সিস্টেম্যাটিক রিভিউজ এবং বিভিন্ন গবেষণার সমন্বিত এভিডেন্স। এই কারণেই আন্তর্জাতিক ক্যানসার প্রিভেনশন রেকমেন্ডেশনস কোনো ‘ম্যাজিক ফুড’-কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। বরং তারা সামগ্রিক একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দেন। যেমন: পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, ফল এবং ডাল জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া; রেড মিট এবং প্রসেসড মিট কম খাওয়া; শ্যুগারি ড্রিঙ্কসএবং হাইলি এনার্জি-ডেনস ফুডস সীমিত রাখা; অ্যালকোহল কমানো এবং স্বাস্থ্যকর বডি ওয়েট বজায় রাখা।
কিন্তু এই আলোচনা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়। একজন মানুষ ভালো খাবার খেলেও ক্যানসার আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ ক্যানসারের সঙ্গে বয়স, জিন, ইনফেকশন, টোব্যাকো, এনভায়রনমেন্টাল এক্সপোজার এবং আরও অনেক কারণ জড়িত।
আবার একজন মানুষ কোনো একটি খাবার খেয়েছেন বলে তাঁকে তাঁর ক্যানসারের জন্য দায়ী করাও অন্যায়। ক্যানসার কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়। এটি একটি জটিল শারীরিক অসুস্থতা। তবু প্রিভেনশনের জায়গায় আমাদের হাত-পা পুরোপুরি বাধা নয়, অনেক কিছুই করার আছে।
আমরা প্রসেসড মিটের ব্যাপারে সতর্ক হতে পারি। রেড মিটের পরিমাণ বিবেচনা করতে পারি। অতিরিক্ত চার্ড ফুড এড়িয়ে চলতে পারি। অ্যালকোহল সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। নিরাপদভাবে সংরক্ষিত খাবার খেতে পারি। অতিরিক্ত শ্যুগারি ড্রিঙ্কস ও হাইলি প্রসেসড ফুডস কমাতে পারি। আর আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, ফল এবং ডাল জাতীয় খাবারের জায়গা বাড়াতে পারি। এগুলো ওষুধ নয় বরং এগুলো একটি লো রিস্ক লাইফস্টাইলের অংশ। আমাদের খাবারকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু খাবার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকারও সুযোগ নেই।
‘কোন খাবারের সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির প্রমাণ সবচেয়ে শক্তিশালী, কেন সেই সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, এবং আমাদের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসে তার অর্থ কী?’ - এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের রাতের খাবারের টেবিল বদলে দেবে না। কিন্তু তার আগে আমাদের সেই টেবিলের দিকে তাকানোর দৃষ্টি এবং মনোভাব বদলাতে হবে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই। ভয় থেকে নয়, জ্ঞান থেকেই জয়!
- নাজিব খান: পাবলিক হেলথ অ্যান্ড এক্সারসাইজ সায়েন্স রিসার্চার ও ক্যান্সার সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট কো-অর্ডিনেটর, গিপসল্যান্ড রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড ক্যান্সার সার্ভিস (জিআরআইসিএস), ভিক্টোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া
- মূর্তজা খান লোদী: কৃষি গবেষক
.png)
-40e58c.jpeg)









