‘সারের জন্য কাজ শিকেয় তুলে ঘুরছি, এদিকে ধান শেষ’
স্ট্রিম সংবাদদাতামাগুরা

সারের অভাবে ধান মরে যাচ্ছে। গতকালও সার নিতে এসে ফিরে গেছি, আজও পেলাম না। সারের জন্য সব কাজ-কাম শিকেয় তুলে ঘুরেই যাচ্ছি। এদিকে ধান তো শেষ– স্ট্রিমের কাছে এভাবেই সার সংকটের কথা তুলে ধরেন মাগুরা সদরের তিতারখাঁ পাড়ার কৃষক মো. পান্না।
আমনের ভরা মৌসুমে মাগুরার বেশিরভাগ এলাকার অবস্থায় এমন। কৃষকরা ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। একাধিক কৃষক স্ট্রিমকে জানান, ইউরিয়া সার প্রয়োজন মতো পেলেও টিএসপি ও ডিএপির তীব্র সংকট চলছে। ৫০ কেজির বস্তা চাইলে দেওয়া হচ্ছে ১০ কেজি। অথচ কালোবাজারে বেশি দামে ঠিকই মিলছে। এই অবস্থা চললে ধানে ফলন বিপর্যয় হবে।
মাগুরা কৃষি অফিস জানিয়েছে, জেলা সদর এবং শ্রীপুর, মহাম্মদপুর ও শালিখা উপজেলায় এ বছর প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। এই মৌসুমের জন্য সার বরাদ্দ হয়েছে ১১ হাজার ৪৪১ টন। এর মধ্যে টিএসপি ২৬৮০, ডিএপি ৩৮৭১ ও এমওপি ৩৩৪৩ টন। জেলায় বিএডিসির ৭৫ ও বিসিআইসির ৩৯ ডিলারের মাধ্যমে এই সার বিতরণ করা হচ্ছে। কোনো সংকট নেই।
কৃষি অফিস সার সংকট নেই দাবি করলেও কৃষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। জেলা সদরের মঘি ইউনিয়নের কুশবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস বলেন, দুই বস্তা ইউরিয়া এবং এক বস্তা পটাশ পেয়েছি। এখন ডিএপি ও টিএসপি সার না দিলে তো ধান হবে না। কিন্তু ডিলারের কাছে ঘুরেও পাচ্ছি না। আজ এসেছি, পায়নি। ডিলার বলেছে, আগামীকাল আসতে। জানি না আগামীকাল আদৌ পাব কি না।
-af16d4.jpeg)
একই ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২ একর ৩০ শতাংশ জমিতে ধানের আবাদ করেছি। আমার কমপক্ষে ১০ বস্তা সারের দরকার, সেখানে এখন পর্যন্ত পেয়েছি মাত্র ৪ বস্তা। টিএসপি ও ডিএপি সার পেয়েছি মাত্র ১০ কেজি করে। কী করব বুঝতে পারছি না।
মঘি বাজারে বিসিআইসি ডিলার নিমাই পাল বলেন, চলতি মাসে ২ হাজার ৮০০ বস্তা ইউরিয়া পেয়েছি। তবে মাত্র ১৫০ বস্তা টিএসপি, ২৭২ বস্তা ডিএপি ও এমওপি দিয়েছে ১৯৯ বস্তা। অথচ এখন ডিএপি ও টিএসপির চাহিদা বেশি। বরাদ্দ কম পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ১০ কেজি করে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তাদের জানালেও এখনো সমাধান হয়নি।
ডিলাররা বরাদ্দ কম পাওয়ার কথা বলেও কৃষকদের অভিযোগ, বেশি দামে বিক্রি করতে সার মজুত করা হচ্ছে। বাড়তি দাম দিলে রাতের অন্ধকারে বাড়িতে ভ্যানে করে সার পৌঁছে দিচ্ছে কালোবাজারিরা।
কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সম্প্রতি প্রশাসনের অভিযানে। গত ৬ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীর অভিযোগ পেয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শ্রীপুরের আমলসার গ্রাম ও বাজারের তিনটি গুদামে অভিযান চালান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম। এ সময় শহিদ জোয়ার্দ্দারের বাড়ি এবং নবাব জোয়ার্দ্দারের গুদাম থেকে ৩২৮ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২৬৭ বস্তা ছিল ডিএপি, বাকি ৬১ বস্তা এমওপি। পরে ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই উপজেলার টিকারবিলা বাজারে ১০ সেপ্টেম্বর অভিযান চালান সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমাউল হুসনা পিংকি। এ সময় জামিরুল ইসলামের দোকানে ২৮৮ বস্তা সার পাওয়া যায়, অথচ তিনি সার ব্যবসায়ীই না। পরে জামিরুলকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমাউল হুসনা পিংকি বলেন, এত সার তিনি কোথা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করেছেন এবং আর কেউ জড়িত কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এদিকে, জেলার শত্রুজিতপুর বাজারে বিসিআইসি ডিলার সঞ্জিত কুমার সাহার দোকানে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত ১৩৫০ টাকার বদলে টিএসপির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২২০০ টাকায়। ১০৫০ টাকার ডিএপির বস্তায় নেওয়া হচ্ছে ১৭০০ টাকা। তথ্য লুকাতে রেজিস্ট্রার খাতায় তোলা বা কোনো ভাউচার দেন না তিনি। অভিযানে বিষয়টি ধরার পর তাকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং সতর্ক করা হয়।
সার কালোবাজারি নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনের নামে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সার কালোবাজারির একটি সিন্ডিকেটের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আর কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে মাগুরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, জেলায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ টিএসপি ও ডিএপি সার রয়েছে। দাম কম হওয়ায় কৃষকরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করেন। এতে সংকট দেখা দেয়। এরপরও কৃষি কর্মকর্তাদের জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
.png)



-38b1de.jpg)



