leadT1ad

খুলনা মেডিকেলে খাবারের মান নিয়ে রোগী-স্বজনদের অভিযোগ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১২: ৪৪
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্ট্রিম ছবি

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিবেশ ও খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হাসপাতালের রোগী ও স্বজনরা জানান, এখানকার খাবার মুখে তোলার মতো নয়। বাধ্য হয়ে অনেক রোগী বাইরে থেকে খাবার কিনে খান।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর দরপত্রে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে রোগীদের খাবার সংগ্রহ করা হয়। একজন রোগীর তিন বেলা খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। খাবারের মেন্যুতে থাকে ডায়েট-১ এ কলা, রুটি ও ডিম; ডায়েট-২ এ দুধ এবং ডায়েট-৩ এ স্বল্প সংখ্যক রোগীর জন্য হাই প্রোটিন খাবার। দুপুর ও রাতে একবেলা মাছ আর একবেলা ব্রয়লার মুরগির মাংস অথবা ডিম।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল মাসুম খান জানান, দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংসের পরিবর্তে বেশির ভাগ দিনই ডিম ও সন্ধ্যায় রুই-কাতলার পরিবর্তে কম দামের বিভিন্ন মাছ অথবা ডিম, সবজি আর পানির মতো স্বাদহীন ডালই রোগীদের নিয়মিত খাবার। নিম্নমানের চালের ভাত থেকে দুর্গন্ধ আসে।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

মাসুম খান জানান, নিম্নমানের খাবারের বিষয়টি হাসপাতাল প্রশাসনের অজানা নয়। প্রতিদিন রোগীর খাবারের নমুনা পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও তা শুধু নিয়মেই আছে। হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তা-ঠিকাদারের দুর্নীতিতে নিম্নমানের খাবারে ভোগান্তিতে থাকেন ভর্তি-রোগীরা।

হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর বলে উল্লেখ করেন মাসুম খান। তিনি বলেন, মেঝে, রান্নার পাত্র সব অপরিষ্কার। অপরিশোধিত পানি দিয়ে চলে রান্নার কাজ। খোলা অবস্থায় রেখে দেওয়া ভাত-তরকারির পাশেই দেখা যায় ঝাড়ু দিতে। রয়েছে ইঁদুর, বিড়ালের বিচরণ।

হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডের রোগী রায়হান বলেন, রোগীরা এমনিতেই শারীরিক কষ্টে থাকেন। এর মধ্যে নিম্নমানের খাবার তাঁদের জন্য আরও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুরে হাসপাতালের খাবারে পচা মুরগির মাংস দেওয়া হয়। ওই মাংস খেয়ে আমি নিজেও বমি করি। অনেক রোগী অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হাসপাতালের নিচতলায় গাইনি ইউনিট-১ ওয়ার্ডে ভর্তি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মুড়াগাছা এলাকার সাবিনা আক্তার। তিনি বলেন, আমি গত সপ্তাহে এখানে ভর্তি হয়েছি। যেদিন ভর্তি হয়েছি সেদিনও খাবার পাইনি, আজ হাসপাতাল ত্যাগ করার দিনও খাবার পাইনি।

সাবিনা আক্তার আরও বলেন, রোগীদের খাবার খাওয়ার পর থালা-বাটি ধোয়ার জন্য অধিকাংশ সময়েই হাসপাতালের ট্যাপে পানি থাকে না। তা ছাড়া পুরো হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় বাইরে থেকে।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমান খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর নিকটাত্মীয়। নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি পেয়ে, তিনি প্রায় সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের রান্নাঘরে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। রোগীদের খাবার সরবরাহে তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ রোগী থাকে। প্রত্যেক রোগীর জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ স্টুয়ার্ট হাবিবের মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রতিদিন রোগীদের জন্য দুটি তালিকা তৈরি হয়। একটি খাবার তালিকা, আরেকটি বিল তৈরির তালিকা।

এ ছাড়া স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমানের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে রোগীদের খাবার বাইরে পাচার হয়। আশপাশের বিভিন্ন হোটেলে বিক্রি করা হয় সেসব খাবার। কাঁচা মাছ, মাংস ও ডিম এলাকার বাজারে বিক্রি করা হয়। রান্নাঘরে স্টুয়ার্ট ও কুক মশালচির সাথে পাঁচজন করে শিফটভাগে ১০ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী কাজ করেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোজাহার আলী খান জানান, গত ৩ জুন স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমানকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দুদক হাসপাতালের রান্নাঘরে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে অনিয়মের অভিযোগে হাবিবুর রহমানকে ২৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে দুই মাস পর আবার স্বপদে ফিরে আসেন।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

আলহাজ্ব এ রহমান অ্যান্ড সন্স এবং মেসার্স আল মামুন ট্রেডিং নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোগীদের খাবার সরবরাহ করে বলে জানান মোজাহার। তিনি বলেন, ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন আমি খুলনাতে ছিলাম না। রান্নাঘরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে তা তিনি এড়িয়ে যান।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে জনবল সংকটসহ অনেক সমস্যা রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি ২০২৫ সালের আগস্টে খুলনা মেডিকেলে যোগদান করি। এর আগে স্টুয়ার্ট হাবিব এখানে কী করেছে জানি না। তবে আমি যোগদানের পর হাসপাতালের রান্নাঘর নিয়মিতই তদারকি করি।’

ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন রোগীদের পচা মুরগির মাংস খাওয়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত