
কখনো পিচঢালা, কখনো মেঠোপথ। কোথাও নদী, কোথাও বন। ভোরে মাছের আড়তের কোলাহল। কোথাও চোখে পড়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব পেরিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত ৭৫০ কিলোমিটার পথ হাঁটছেন হাইকার ও পরিবেশকর্মী মাসফিকুল হাসান টনি।
‘বাংলাদেশ কোস্টাল ট্রাভার্স’ নামে এই অভিযানের লক্ষ্য জলবায়ু ন্যায়বিচার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও উপকূলীয় মানুষের সুপেয় পানির অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি। আয়োজকদের দাবি, দেশের পুরো উপকূল ধরে এটি বাংলাদেশের প্রথম হাইকিং অভিযান।
১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের পাঁচ নদীর মুখ থেকে হাঁটা শুরু করেন টনি। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় ১১টি জেলার বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে তাঁর হাঁটা শেষ হবে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাটে।

মাছের আড়ত থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র
পদযাত্রার ষষ্ঠ দিনে শনিবার মুন্সীরহাট থেকে তালতলীর নিদ্রার চর পর্যন্ত ৩৩ দশমিক ৮২ কিলোমিটার পথ হাঁটেন টনি। এ নিয়ে মোট ২২০ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। সকালে বরিশাল-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়ক ধরে পাথরঘাটার মাছের আড়তে পৌঁছান। তখন সকাল সাড়ে সাতটা। সমুদ্র থেকে নৌকা ফিরেছে। আড়তে ইলিশ, লইট্যা, পোয়া, শাপলাপাতা, জাভাসহ বিভিন্ন মাছ। ভোরের ব্যস্ততা আর মাছের গন্ধে মুখর পুরো এলাকা।
এখান থেকে টনি খেয়া পেরিয়ে বিষখালী নদীর ওপারে যান। এরপর নিশানবাড়ী, গাজীমাহমুদ, সোনাতলা, কুমিরমারা ও পদ্মা গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যান।
বনের পরেই পায়রা নদী। নদীর তীরে সংরক্ষিত বনের ভেতর কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রকৃতির একেবারে পাশে শিল্পায়নের এই দৃশ্যই টনির অভিযানের মূল প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রভাব নদী, বন, মাছ ও মানুষের জীবনে কতটা পড়ছে; তা নিয়েও ভাবতে চান তিনি।
পায়রায় ইলিশ কম
পায়রা নদীর পাড়ে অপেক্ষার সময় স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলেন টনি। তাঁর ভাষ্য, কয়েকজন জেলে বলেছেন, পায়রা নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। বিষখালী নদীতে তুলনামূলক ভালো মাছ পাওয়া গেলেও পায়রায় ইলিশ ও পোয়া ছাড়া অন্য মাছ কম পাওয়া যায়।

টনি বলেন, নদী শুধু পানি প্রবাহের জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে, নৌকা, জাল, মাছের আড়ত, বাজার; উপকূলের বহু পরিবারের জীবিকা। তাই নদীর স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবিকার সম্পর্কটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জলবায়ুর কথা
পায়রা নদী পার হয়ে তালতলী খেয়াঘাটে পৌঁছলে স্থানীয় পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান ও মুশফিক আরিফসহ তরুণেরা টনিকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। তাঁরা সাইকেল ও হেঁটে টনির সঙ্গে তালতলী অন্বেষা রেসিডেনশিয়াল স্কুলে যান। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে নিজেদের অভিযান নিয়ে কথা বলেন টনি। স্কুলের পরিবেশ ক্লাবের পক্ষ থেকে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এরপর টনি আবার হাঁটা শুরু করেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে দিয়ে জয়ালভাঙা এলাকায় পৌঁছলে শুরু হয় বৃষ্টি। কিছুক্ষণ একটি দোকানে অপেক্ষার পর ওয়াপদার বেড়িবাঁধ ধরে আবার হাঁটা শুরু করেন। তেঁতুলবাড়িয়া, নলবুনিয়া, কিল্লা ও মরা নিদ্রার চর পেরিয়ে নিদ্রার চর বাজারে গিয়ে দিনের পথচলা শেষ করেন।
অ্যাডভেঞ্চার থেকে পরিবেশের বার্তা
নাটোরের বনপাড়া পৌরসভায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা মাসফিকুল হাসান টনি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ও অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আগ্রহী। কৈশোর থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল অ্যাডভেঞ্চারার ও পর্বতারোহী হওয়ার। ২০১৯ সালে তিনি নিজ এলাকা থেকে দীর্ঘপথের হাইকিং শুরু করেন। এরপর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, ভোমরা থেকে সাকা হাফং এবং রৌমারী থেকে চর কুকরিসহ বিভিন্ন দীর্ঘপথের অভিযানে অংশ নেন।
তাঁর দাবি, ২০ দিনে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। তবে এবার হাঁটার উদ্দেশ্য শুধু অ্যাডভেঞ্চার নয়। পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা জানাও অভিযানের অংশ।
টনি বলেন, অ্যাডভেঞ্চার শুধু নিজের আনন্দের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাই। উপকূল ধরে হাঁটার সময় মানুষের কথা শুনছি, তাঁদের বার্তা আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।
.png)




-5ae092-256x144.webp)

