দুর্যোগের ঘাতে পর্যটক খরা, বান্দরবানে থমকে জীবিকা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দরবান

বান্দরবানের থানচি রোডের টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট পর্যটনকেন্দ্র। স্ট্রিম ছবি

বৃষ্টি-বন্যার পর বান্দরবানে পর্যটকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু চার দিনেও নেই পর্যটকের দেখা। এতে পাহাড়ের অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে। বন্যার পানি নামলেও, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের জীবিকার ওপর নেমে আসা দুর্যোগ কাটেনি।

জেলার থানচি সড়কের ডুয়াল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্টে ছোট্ট দোকান চালান মেনসিপাড়ার বাসিন্দা পাওরুং ম্রো। পাহাড়ে উৎপাদিত আম, কলা, পেঁপে, আনারস, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও কৃষিপণ্য বিক্রি করেন তিনি। দুই ছেলে, তিন মেয়েসহ সাত সদস্যের সংসার চলে এই ব্যবসায়।

পাওরুং ম্রো বলছিলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন পাহাড়ি ফল বিক্রি করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হতো। টানা ১২ দিন বেচাবিক্রি নেই। শনিবার মাত্র ২০০ টাকার ফল বিক্রি করেছি। সংসার চলবে কীভাবে, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছি।

৪০ বছর বয়সী পাওরুং ম্রোর এক সন্তান দ্বিতীয়; অন্যজন পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া। বিক্রি কমে যাওয়ায় পরিবারের কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

নীলগিরি সড়কের পাশে ছোট দোকানে উইরিং ম্রো ও তাঁর স্ত্রীর। স্ট্রিম ছবি
নীলগিরি সড়কের পাশে ছোট দোকানে উইরিং ম্রো ও তাঁর স্ত্রীর। স্ট্রিম ছবি

সদর উপজেলার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গালেঙ্গ্যা এলাকার এরাপাড়ার বাসিন্দা ৬৫ বছরের উইরিং ম্রো। প্রায় চার বছর ধরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নীলগিরি সড়কের পাশে একটি ছোট দোকানে পাহাড়ি ফল বিক্রি করেন। সাত ছেলেসহ ৯ সদস্যের বড় পরিবারে প্রধান আয়ের উৎস এটি। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘পর্যটক না থাকলে ফল কিনবে কে?’

উইরিং ম্রো জানান, ক্রেতা না থাকায় দোকানের ৮টি কলার ছড়া, প্রায় ২ মণ পেঁপে ও ১ মণ আম নষ্ট হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯ হাজার টাকা। একদিকে যেমন পুঁজি হারিয়েছেন, অন্যদিকে পরিবারের একমাত্র আয়ের পথও প্রায় বন্ধ। এতে পরিবার নিয়ে চরম অর্থসংকটে দিন কাটছে তাঁর। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে দাদন করে চাল কিনতে হচ্ছে।

শুধু পাহাড়ি ফল বিক্রেতাই নয়, বন্যার পর পাহাড়ে পর্যটন নির্ভর পুরো অর্থনীতিই স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যটক না থাকায় আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় খাবারের দোকান, পরিবহন ব্যবসা, জিপ ও চাঁদের গাড়ির চালক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলচালক, ট্যুর গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্প বিক্রেতা— সবাই কাজ হারিয়ে দুঃসময় পার করছেন।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৬টি দর্শনীয় পর্যটন স্পট রয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন পরিচালিত প্রধান পর্যটন স্পটের সংখ্যা ৭। এসব পর্যটনকেন্দ্রে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।

সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার কারণে গত ৭ থেকে ১৫ জুলাই (বুধবার) পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখেছিল জেলা প্রশাসন। পরে তা ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও দেখা নেই কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের। বন্যায় অনেকের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, এতে পর্যটন নির্ভর পেশা হারিয়ে ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও ব্যবসার পুঁজি নিঃশেষ। আগামীতে কীভাবে পরিবার চলবে, সন্তানদের লেখাপড়া হবে ও নতুন করে ব্যবসা শুরু করবেন— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

বান্দরবান হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট সমিতির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, হিলটন, হিলভিউ, গ্র্যান্ড ভ্যালি, প্লাজা ও অরণ্য হোটেলসহ ৬ থেকে ৭টি হোটেল পানিতে ডুবে ছিল। দামি দামি আসবাবপত্র, জেনারেটরসহ ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ২ থেকে আড়াই কোটির মতো লোকসান হবে। এখন দেবতাকুম ছাড়া সব পর্যটন স্পট খোলা আছে। তবে লোকজন সেভাবে পাচ্ছি না।

থানচি রোডে ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্টেও পর্যটক নেই। স্ট্রিম ছবি
থানচি রোডে ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্টেও পর্যটক নেই। স্ট্রিম ছবি

বান্দরবান জিপ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রায় ৪০০টি গাড়ি আছে। প্রতি ট্রিপ ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় একদিনে অন্তত ২০০টি গাড়ি চলে।

ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম বাচ্চা জানান, ‘হিসাব করলে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে আমাদের। এখন বেশির ভাগ বেকার, কাজহীন। বন্যার সময় অনেকের বাড়ি পানিতে ডুবে ছিল। জেলা প্রশাসক ছাড়া কারও কাছ থেকে কিছুই পায়নি।’

জেলার থানচি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দেবতাকুম পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনো বন্ধ। সেখানে যাওয়ার ১১টি নৌকার মধ্যে ৮টি গত বন্যায় পানিতে ভেসে চলে গেছে। প্রতিটি নৌকা বানাতে অন্তত ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া বাঁশের ভেলা ছিল ৭০টি। এখন একটাও নেই। প্রতিটি বাঁশের ভেলার দাম সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

দেবতাকুম ট্যুর গাইড সমিতির সভাপতি চিংনু মারমা জানান, নৌকা-ভেলা হারিয়ে যাওয়ার কারণে এখনো পর্যটন স্পট চালু করা যাচ্ছে না। চালু করতে না পারায় ১৩৯ জন গাইড ১২ দিন ধরে পুরো বেকার।

বান্দরবানের অর্থনীতি অনেকাংশেই পর্যটন নির্ভর জানিয়ে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলে দিলে পর্যটকদের আগমন বাড়বে, কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও সচল হবে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট লোকজনরা যাতে ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠে পারে, সেই লক্ষ্যে পর্যটনকেন্দ্রগুলো তাড়াতাড়ি খুলে দিয়েছি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত