নবম পে-স্কেল/কোটি মানুষের স্বস্তির মূল্য চুকাতে হতে পারে যেভাবে

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৩১
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে নবম পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। এতে বেতন বেড়েছে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে লাখ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ের এই বোঝা আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতি সামাল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন দেশের ১০ শতাংশের কম মানুষ। তবে অর্থনীতির সামগ্রিক বোঝা চাপবে দেশের সবার ওপর। মূল্যস্ফীতি থেকে কর বৃদ্ধির ধাক্কায় পিষ্ট হবেন বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমজীবীরা।

সরকারের জন্যও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাত সামাল দেওয়াও হবে বড় পরীক্ষা। কারণ, পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে দেড় বছর সময় নেওয়া হলেও এত টাকা জোগান দেওয়ার মতো সক্ষমতা বর্তমান অর্থনীতির নেই। এতে ব্যয় সামাল দিতে আয় বাড়াতেই হবে সরকারকে। বর্তমান কাঠামোয় তা কতটা সম্ভব তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে অর্থনীতিবিদদের।

স্বস্তির বৃত্তে ১ কোটি ৩২ লাখ, বাইরে বিপুল জনগোষ্ঠী

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের সরাসরি আওতায় পড়বেন ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক চাকুরিজীবী। সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মিলিয়ে সংখ্যাটি প্রায় ৩৩ লাখ। পরিবারপ্রতি চারজন ধরলে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৩২ লাখের মতো। এই হিসাবে, ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে বড় অংশই থাকছেন সুবিধার বাইরে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় বেতন কাঠামোর পরিবর্তন কেবল চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এর বহুমুখী অভিঘাত পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতি ও বাজারে। নতুন বেতন কাঠামোয় সুবিধা পাবেন জনসংখ্যার মাত্র ৭-৮ শতাংশ। তবে বাকি প্রায় ৯২ শতাংশ বেসরকারি খাতের স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কী হবে তার জবাব নেই সরকারের কাছে।

তাদের ভাষ্য, বেতন বৃদ্ধির পরপরই যদি বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়, তবে সেই চাপ সরাসরি পড়বে এই সাড়ে ১৬ কোটি সাধারণ মানুষের ওপর, যাদের আয় বাড়ানোর মতো কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বলয় নেই।

ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক স্ট্রিমকে বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতির এই চাপ সরকারি কর্মচারীদের ওপরও পড়বে। কারণ, বেতন বাড়ানোর ফলে আগে করের বাইরে থাকা বিশাল কর্মী-শ্রেণী এবার আওতায় আসবে। এতে বর্ধিত আয়ের একটি অংশ আবার আয়করের মাধ্যমে ফের রাষ্ট্রের কাছে ফিরে যাবে।

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের অব্যবহিত পরেই বাজারে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই স্বাভাবিক। সরকারও এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না।

গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের কারণে মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুটা চড়তে পারে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত জায়গা থেকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, আমাদের প্রায় ৬০ লাখ কোটি টাকার অর্থনীতিতে ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন হলে বাজারে আসবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। সরকার তো এটা টাকা ছাপিয়ে করছে না; বরং বাজেটের মধ্যে এক খাতের অর্থ অন্য খাতে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং বরাদ্দের শৃঙ্খলার ভেতরে থেকেই করছে। ফলে এতে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাজারে অর্থ এলে সাধারণত একটি ‘সাপ্লাই সাইড রেসপন্স’ বা জোগানের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। চাহিদা বাড়লে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহও বাড়ে। তবে বাংলাদেশে ‘এক্সপেকটেশনাল ইনফ্লেশন’ বা মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতির বড় ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে— এই অজুহাতে ব্যবসায়ীদের আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তাঁর মতে, এই কারসাজি রুখতে বাজারে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা প্রয়োজন।

করের বোঝা কার কাঁধে

সরকারি কর্মচারীদের প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার বাড়তি বেতন মেটাতে সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব জোগাড় করতে হবে। এই অর্থের সংস্থান করতে সরকার পুরো চাপ দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর।

গতকাল মঙ্গলবার এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর নির্দেশনা দেন, যেকোনো উপায়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ট্রিমকে বলেন, ‘উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন, যেকোনো মূল্যে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।’ আরেক কর্মকর্তা যোগ করেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনের অর্থ আমাদেরই জোগান দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।’

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

এনবিআরের কর্মকর্তারাই এই লক্ষ্যমাত্রাকে ‘অসম্ভব’ হিসেবে দেখছেন। তারা জানান, স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে কখনোই সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই। সেখানে হঠাৎ ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের (যেমন ভ্যাট ও শুল্ক) বোঝা বাড়াতে হবে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে সংকটে পড়বেন সাধারণ মানুষ।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণের চেষ্টাও বাড়াতে হবে। যাদের বেতন বাড়ল, তাদের মধ্যে তো রাজস্বের কর্মচারীরাও রয়েছেন। সমান্তরালভাবে সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ আহরণ, সেবা প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে জড়িত, তাদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

বেসরকারি খাতের সংকট

সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক ধাক্কায় বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রে কখনও তা হয় না। বেসরকারিতে মজুরি বাড়ে মূলত উৎপাদনশীলতার উপরে। এতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাবে পড়লে প্রথম ধাক্কাটিই লাগে বেসরকারি খাতের কর্মীদের ওপর।

এ বিষয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম স্ট্রিমকে বলেন, সরকারি খাতে বেতন বাড়ায় এখন বেসরকারি খাতেও মজুরি বৃদ্ধির তীব্র চাপ তৈরি হবে। বেসরকারি খাতে যদি মজুরি বাড়ে, তবে মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব পড়বেই। অথচ অল্প সময়ে উৎপাদন সেই অর্থে বাড়বে না। এতে বাজারে অর্থ আসবে, তবে পণ্য বা সেবা না বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

গত চার বছর ধরে ধারাবাহিক ৬ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতিতে দেশের মানুষ এক প্রকার দমবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ১০-১১ বছর পর পে-স্কেল পুনর্বিবেচনা করা যৌক্তিক হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আরও দূরদর্শিতা দরকার ছিল। অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। একসঙ্গে কোথায় ব্যয় কমানো যাবে, সরকারি অফিসের কোন কোন জায়গায় অপ্রয়োজনীয় পদ সংকোচন বা অবলোপন করা যাবে—সেই দিকনির্দেশনাও দরকার ছিল।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত