ad

জন্মদিনে শ্রদ্ধা/বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: সমস্ত কবিতাই মানুষের জন্য

ধ্রুব সাদিক
ধ্রুব সাদিক

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্ট্রিম গ্রাফিক
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্ট্রিম গ্রাফিক

সেটাই যথার্থ কবিতা, যা যে ভাষায় আমাদের সবার চৈতন্যকে করে বাঙ্ময়, অবচেতনকে জ্যোতির্ময়, মন্ত্রে পরিণত করে মানবিক প্রত্যয় ও শপথ। কেননা আজ, বিবেকী কবির অনুভব—‘শীতের মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়/ মৃত্যুর মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়।’

—বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মাথা উঁচু রাখতেন ঝড়ে, জলে, কুয়াশায়। এমনকি মাথা উঁচু রাখতেন নরকের আগুনেও। মাটির দিকে তাকাতেন, তাকাতেন মানুষের দিকে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নানা কারণে স্মরণীয় আমাদের এই প্রসারিত হৃদয়ের কবি। বড় প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতেন না। দরজায়-দরজায়, মেলায়, গ্রামে ঘুরে ঘুরে নিজের বই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। না, শুধু নিজের বই-ই নয়। যদি মনে করতেন কোনো তরুণ কবির কবিতা মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি, সেইসব কবিতাও পৌঁছে দিয়েছেন। কবিতা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও দায় ছিল। এই মানুষটি, ‘মানুষের মুখ’-এর কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। গোটা জীবন অভাবের সঙ্গে পার করেছেন। একজীবনে কখনও তিনি আপোষ করেননি।

মানুষের প্রতি এই দায়বোধই তাঁর কবিতার মূল সুর। মানবীয় যা কিছু, তার সবই ছিল তাঁর আপন। ১৯২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে। প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘গ্রহচ্যুত’ প্রকাশিত হওয়ার পর একটা গোটা জীবন কবিতা ফেরি করেছেন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমসাময়িক কবি মনীন্দ্র রায় মনে করতেন যে বীরেন্দ্রর সমস্ত কবিতাই মানুষের জন্য। ‘যন্ত্রণার জ্বালা তীব্র হয়ে বাজে তাঁর কবিতায়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা কবিতার ভিতর দিয়ে ফোটে, শ্লোগানে পর্যবসিত হয় না।’

আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শঙ্খ ঘোষের কথায়। তিনি মনে করতেন, ‘বীরেন্দ্রর কবিতা হলো জন্মভূমির মাটিকে ছুঁয়ে থাকার কবিতা। এ কবিতা জেগে ওঠে জীবনযাপনের নিজস্ব সত্য থেকে।’ শঙ্খ ঘোষ এ-ও মনে করেন, সমস্ত অর্থেই বাংলার সবচেয়ে প্রতিবাদী কবি বীরেন্দ্র। এই প্রতিবাদ কোনো আরোপিত রাজনৈতিক ভাষা নয়। তা জন্ম নিয়েছে তাঁর নিজের দেখা জীবন, মানুষের যন্ত্রণা এবং চারপাশের অন্যায়ের ভিতর থেকে। সত্তরের দিকে ক্রমান্বয়ে জেগে উঠতে থাকে তাঁর ক্রুদ্ধ মুখচ্ছবি সমস্ত ভণ্ডতা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেশের বিবেক হিসেবে।

এই জায়গাতেই বীরেন্দ্রর কবিতাকে বোঝার একটি চাবিকাঠি পাওয়া যায়। তাঁর কবিতা প্রতিবাদী, কিন্তু কেবল স্লোগান নয়। বেদনা, সামাজিক ক্ষুধা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা মিলেই তাঁর প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হয়েছে। নিজেকে নিয়ে হিমেনেস বলেছেন, কবিতা ছাড়া তিনি এমনকি চিঠিও লিখতে জানেন না। ইংরেজ কবি অডেন কবিতাকে বলেছেন ‘মেমোরেবল স্পিচ’। কল্পনাপ্রতিভার মহত্তম অভিব্যক্তি হলো কবিতা—বলেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আর স্যান্ডবার্গ-এর মতে, কবিতা হচ্ছে প্রতিধ্বনি, একটা ছায়াকে নাচতে বলা।

বীরেন্দ্রর কবিতায় সেই কল্পনা ও প্রতিধ্বনি এসেছে খুব সংক্ষিপ্ত, সংকেতময় এবং অন্তরঙ্গ ভাষায়। তার ভিতরে রয়েছে এক গভীর মানবিক অভিঘাত। সমগ্র দুনিয়ার প্রতারিত মানুষের বেদনা এবং মানবতাবিরোধী ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে’, ‘ফুটপাথের কবিতা’, ‘বর্ষা’, ‘এ শহর’, ‘এই অন্ধকার’ প্রভৃতি কবিতা তার উদাহরণ।

‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ’ খুঁজতেন কবি রাত্রির আকাশে। ফলে বৃষ্টি তাঁর জন্য সুখকর হতো না। যে বৃষ্টি কারো কাছে অলস সৌন্দর্য, বীরেন্দ্রর কাছে তা ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায় চোখ যেমন:

কালো মেঘের ফিটন চ’ড়ে

কালীঘাটের বস্তিটাতেও বর্ষা এলো।

সেখানে যত ছন্নছাড়া গলিরা ভিড় ক’রে

খিদের জ্বালায় হুগলি-গঙ্গাকেই

রোগা মায়ের স্তনের মতো কামড়ে ধ’রে

বেহুঁশ প’ড়ে আছে।

আষাঢ় এসে ভীষণ জোরে দুয়ারে দিল নাড়া—

শীর্ণ হাতে শিশুরা খোলে খিল।

[বর্ষা]

বৃষ্টি, নদী, মেঘ—সবকিছু তাঁর কবিতায় এসে মানুষের জীবনের সঙ্গে জুড়ে যায়। খুব বাস্তব হয়ে। খুব সত্য হয়ে।

মানুষের মুখ খুঁজেছেন একজীবন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ফলে তাঁর পক্ষেই সম্ভব ফুটপাথের চরম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জীবন আর তাদের নির্মম বাস্তবতার এক মর্মস্পর্শী দলিল আঁকা। রূপালী চাঁদের আলোর সৌন্দর্য অবলোকন করার কালেও তাঁর মস্তিষ্কে খেলে যায় ক্ষুধার্ত মানুষের বেঁচে থাকার নির্মম হাহাকার। বীরেন্দ্র দেখেন।

ধ্রুব সাদিক: কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত