শাহেদের ‘ঘুষ’ সাইটে ১২ দিনে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের অভিযোগ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৩৭
শাহেদের ঘুষ. সাইটে ১২ দিনে ১৫ হাজার মানুষের অভিযোগে ৪০০ কোটির লেনদেন চিত্র। ছবি: স্ট্রিম চ
শাহেদের ঘুষ. সাইটে ১২ দিনে ১৫ হাজার মানুষের অভিযোগে ৪০০ কোটির লেনদেন চিত্র। ছবি: স্ট্রিম চ

‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামে একটি ওয়েবসাইট খুলে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছেন ১৭ বছরের তরুণ শাহেদ শরীফ আহমেদ। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে এই ওয়েবসাইটে।

কোন দপ্তরে, কী সেবার জন্য কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে, তা জানাতে পারছেন নাগরিকরা। মাত্র ১২ দিনেই ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। যেখানে ঘুষের দাবি করা টাকার পরিমাণ সাড়ে ৪০০ কোটির বেশি।

শাহেদ শরীফ আহমেদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তিনি ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকেন এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছেন। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।

যে কারণে ঘুষ নিয়ে ওয়েবসাইট তৈরির চিন্তা

শাহেদ শরীফ জানান, ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তার মা আমিনা খাতুন। অসুস্থতায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান তিনি। মৃত্যুর পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে পদে পদে ঘুষ দিতে হয়েছে। তার অভিযোগ, কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য টাকার জন্য শিক্ষা কার্যালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেও এমন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন পাসপোর্ট করাতে গিয়ে। ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ করে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ ও যন্ত্রণা থেকে ঘুষের এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই অভিনব এই উদ্যোগ, জানান শাহেদ শরীফ।

ঘুষ ডট সাইটের উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফ আহমেদ
ঘুষ ডট সাইটের উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফ আহমেদ

যেভাবে ওয়েবসাইট তৈরি

ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় কোডিং করে ওয়েবসাইটটির কাঠামো তৈরি করেন শাহেদ। পরে তার বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কেনা হয় এবং ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালুর পর তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

শাহেদ বলেন, ‘সাইটটি ওপেন করার পর বন্ধু সাইফ এটি নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট করে। পরে পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। প্রথম তিন দিনেই প্রায় ৫ হাজার মানুষ এতে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এত মানুষের রেসপন্স পাবো, তা আশা করিনি।’

কোন বিভাগে কত রিপোর্ট

সাইফ জানান, সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট এসেছে ভূমি, এরপরই আছে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ নিয়ে। বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত ৮টি বিভাগ থেকে ১৫ হাজার ৩৩৭ টি অভিযোগ এসেছে ঘুষ ডট সাইটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা ও সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। ঢাকা বিভাগে ৬ হাজার ১৬২টি, চট্টগ্রাম থেকে ৩ হাজার ২৮১, রাজশাহী ১ হাজার ৩০৩, খুলনা ১ হাজার ১৮৫, রংপুর ১ হাজার ৫৮, ময়মনসিংহ ৮৮৯, বরিশাল ৮০১ ও সিলেট বিভাগ থেকে ৬৫ টি রিপোর্ট হয়েছে। বর্তমানে আইনি ঝুঁকি এড়াতে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য সাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি (লিগ্যাল) টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান শাহেদ।

মাত্র ১২ দিনে বিপুল সাড়া পেয়েছে ঘুষ সাইট, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসছে অভিযোগ।
মাত্র ১২ দিনে বিপুল সাড়া পেয়েছে ঘুষ সাইট, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসছে অভিযোগ।

শাহেদ শরীফ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারি অফিসে ঘুষ নেওয়া অত্যন্ত অন্যায় ও গর্হিত কাজ। আমরা বিষয়গুলো সবার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই, যেন মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশে কীভাবে এসব অনিয়ম ঘটছে।’

সরকারি সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার স্বপ্নের কথা জানিয়ে শাহেদ আরও বলেন, ‘সরকার যদি এই তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তা শুধু আমাদের উদ্যোগের সফলতা নয়, দেশের জন্যও বড় সুফল বয়ে আনবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরে ‘ঘুষ.সাইট’

সাড়া ফেলা এই সাইট ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৃষ্টিতেও এসেছে। শাহেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এটি কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে চাই, তা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া আমার মায়ের পেনশনের বিষয়টিও জানতে চেয়েছেন।’

এর আগে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চান। কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কিছু করতে চাওয়া এমন তরুণদের উৎসাহিত করা দরকার।’

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাইটের উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত