গুদামে বিরল বন্যপ্রাণী, নেপথ্যে অনলাইন পাচার চক্র

উদ্ধার হওয়া চশমাপরা হনুমান। সংগৃহীত ছবি

মিরপুরের একটি গোপন গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪২টি বিরল ও বিপন্ন বন্য প্রাণী। বন বিভাগ বলছে, এটি ঢাকার ইতিহাসে বন্য প্রাণী উদ্ধারের অন্যতম বড় ঘটনা।

মঙ্গলবার বিকেলে মিরপুর-১২-এর ইস্টার্ন হাউজিং-সংলগ্ন সোনালী বাজার এলাকার ওই গোপন আস্তানায় হানা দেয় বন্য প্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের কর্মকর্তারা।

বাইরে থেকে দেখতে একটি সাধারণ টিনশেড গুদাম, বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরেই চলছে গহিন অরণ্যের বিরল সব বন্য প্রাণীর অবৈধ কারবার।

তদন্তকারীরা বলছেন, এই পাচার চক্রের জাল দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলো বর্তমানে ঢাকার আগারগাঁওয়ের বন ভবনে চিকিৎসাধীন থাকলেও দীর্ঘ সময় খাঁচাবন্দী ও অযত্নে থাকায় অনেকগুলোর শারীরিক অবস্থা এখন অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক জানান, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং গুদামের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকায় বন্য প্রাণীগুলোর শারীরিক অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং এসব প্রাণীর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

উদ্ধার করা প্রাণীগুলো এখন আগারগাঁওয়ে বন ভবনের উদ্ধার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এগুলোর বেশিরভাগই পার্বত্য অঞ্চল থেকে এসেছে। প্রাণীগুলোকে আবার তাদের আদি আবাসস্থলে পাঠানোর চিন্তা করছি। চকরিয়ার ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক অথবা রাঙ্গুনিয়ার যে পক্ষীশালা আছে, সেখানে এদের রাখা হতে পারে।’ এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

যেভাবে এই অভিযান

বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, তারা গত সোমবার খবর পায় যে চশমাপরা হনুমান ও লজ্জাবতী বানরের একটি চালান নিয়ে আসা হচ্ছে। তখন চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী বিভাগকে বিষয়টি অবগত করা হয়। পরে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ হাদিস রহমান নামের এক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে পাওয়া যায় ১৩টি পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ ও একটি বিপন্ন উল্লুক।

পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে গ্রেপ্তারের পর হাদিস জানায় যে এই চক্রটি প্রাণীগুলো এনে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুরের ওই আস্তানায় অভিযান চালিয়ে সাজুদ্দিন নামের চক্রের আরেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আরও ৪২টি বিরল প্রাণী উদ্ধার করা হয়।

মিরপুরের ওই গুদাম ও চকরিয়া থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের তালিকায় এমন সব প্রজাতি রয়েছে, যা সচরাচর লোকালয়ে দেখা যায় না। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে তিনটি চশমা-পরা হনুমান, তিনটি লজ্জাবতী বানর, তিনটি হিমালয়ান মাস্ক সিভেট, তিনটি ভাম এবং একটি বাচ্চাসহ মোট তিনটি সজারু। পাখিদের মধ্যে ছিল একটি বিরল চিতিপেট হুতোম পেঁচা বা ইগল পেঁচা।

আরও আছে রাজধনেশ, কাও ধনেশ, একটি পাহাড়ি ময়না ও ১২টি বিভিন্ন প্রজাতির টিয়া। সরীসৃপের তালিকায় আছে ১৩টি বিরল প্রজাতির হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ।

পাচারের উদ্দেশ্যে এসব প্রাণীকে অত্যন্ত ছোট খাঁচায় গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছিল।

মিরপুরের গোদাম থেকে উদ্ধার হওয়া পাখি-প্রাণী। সংগৃহীত ছবি

অনলাইনে বন্য প্রাণী বিক্রির রমরমা বাজার

চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, ‘গ্রেপ্তার হাদিসের স্ত্রী খুশি এই চক্রের অন্যতম মূল হোতা। তিনি মূলত অনলাইন ও ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহক ধরতেন এবং দেশের বাইরে প্রাণী পাচারের বিষয়টি সমন্বয় করতেন। এটি কেবল দেশের ভেতরের ব্যবসা নয়, আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের একটি আস্তানা ছিল এই গুদাম।’

আজকাল বন্য প্রাণী পাচার অনলাইনে হওয়ার কারণে বন বিভাগের জন্য তা শনাক্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, সশরীরে কোনো বাজারে প্রাণী বিক্রি হলে লোক পাঠিয়ে ধরা সহজ হয়, কিন্তু অনলাইনে কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা খুঁজে বের করা মুশকিল। তাদের লোকবল খুব কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা সক্রিয় থাকে। এ কারণে তারা এখন স্বেচ্ছাসেবীদের সাহায্য নিচ্ছেন এবং অনলাইনে বন্য প্রাণী বিক্রি বন্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ এই গুদামটিকে ঢাকার অন্যতম প্রধান আস্তানা বা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি ঢাকার মধ্যে উদ্ধার হওয়া বন্য প্রাণীর সবচেয়ে বড় চালান। পাচারকারীরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বন্য প্রাণী সংগ্রহ করে এখানে মজুত করত। হাদিসের মতো পাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখের আড়ালে অনলাইনে এই অবৈধ কারবার চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে চিতিপেট হুতোম পেঁচার মতো দুর্লভ পাখি সচরাচর লোকালয়ে দেখা যায় না।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর প্রায় সবই আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকা অনুযায়ী মহাবিপন্ন ও সংকটাপন্ন। এর মধ্যে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত। চশমাপরা হনুমান ও উল্লুক বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া লজ্জাবতী বানর বিপন্ন এবং রাজধনেশ সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। পাহাড়ের গহিন বনের বাসিন্দা চিতিপেট হুতোম পেঁচা এবং হিমালয়ান মাস্ক সিভেট বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল ও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট জানিয়েছে, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০২৬ অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হাদিস ও সাজুদ্দিন জেলহাজতে আছে। এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা উদঘাটনে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে ইউনিট। এই আইনে বন্য প্রাণী পাচারের সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

প্রাণী অধিকারকর্মীদের দাবি, কেবল উদ্ধার করলেই পাচার কমবে না, বরং পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আদনান আজাদ বলেন, বন্য প্রাণী পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলে এ ধরনের চক্র গড়ে ওঠার সাহস পাবে না।

সম্পর্কিত