মাজারের কুমির এখন সুন্দরবনে, নতুন বিপদ ডেকে আনছে কী

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ২৩: ০০
বাগেরহাটের হজরত খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সেই আলোচিত কুমিরটি। স্ট্রিম ছবি

বাগেরহাটের হজরত খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সেই আলোচিত কুমিরটি। এর ঠাঁই হয়েছে সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায়।

সম্প্রতি দিঘিতে গোসল করতে নামা এক শিশুকে প্রাণঘাতী আক্রমণ এবং একটি কুকুরকে টেনে নেওয়ার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বস্তির খবর মনে হলেও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, যথাযথ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ছাড়াই লোকালয়ের কোনো প্রাণীকে সুন্দরবনের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে এভাবে 'ডাম্প' করা বা ফেলে আসা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

বাগেরহাটের এই দিঘিতে কুমির পালনের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। লোকগাথা অনুযায়ী, হজরত খান জাহান আলী (রহ.) তাঁর খনন করা দিঘিতে 'কালা পাহাড়' ও 'ধলা পাহাড়' নামে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন। সেই বংশের শেষ কুমিরটি মারা যায় ২০১৫ সালে। বর্তমানে দিঘিতে থাকা কুমিরগুলো মূলত ২০০৪ সালে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভারত থেকে আনা মিঠাপানির প্রজাতির। কিন্তু দিঘিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী বা আধুনিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই কুমিরগুলোই এখন মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কুমিরটি সরিয়ে নেওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান। তিনি বলেন, 'কুমিরটি যেহেতু মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল, তাই একে জনবহুল এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এটি একটি "ওয়াইজ ডিসিশন" বা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।'

তবে এই সিদ্ধান্তকে অবৈজ্ঞানিক বলছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক এম এ আজিজ। তাঁর মতে, কোনো সমস্যা তৈরি হলেই বন্যপ্রাণীকে ধরে করমজলে ছেড়ে দেওয়া কোনো বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হতে পারে না।

অধ্যাপক আজিজ বলেন, 'করমজল বা সুন্দরবনের নির্দিষ্ট কিছু খালকে যেন বন্যপ্রাণী ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা। আমরা বছরের পর বছর সুন্দরবনে কুমির ছাড়ছি, কিন্তু সেগুলোর কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা অ্যাসেসমেন্ট হচ্ছে না। একই জেনেটিক স্ট্রাকচারের কুমির বারবার এক জায়গায় ছাড়লে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।'

তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'এই কুমিরগুলো মিঠাপানির। এদের হঠাৎ সুন্দরবনের লবণাক্ত পরিবেশে ছেড়ে দিলে তাদের আচরণে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। সবচেয়ে বড় ভয় হলো, যে কুমিরটি লোকালয়ে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীকে শিকারের স্বাদ পেয়েছে, তাকে বনের এমন জায়গায় ছাড়া হচ্ছে যেখানে প্রচুর জেলে ও সাধারণ মানুষের চলাচল রয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন আরও ঝুঁকিতে পড়বে।'

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর করমজল খালের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন এম এ আজিজ। তিনি জানান, ওই দিন সুব্রত মন্ডল নামের এক জেলে সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে সাঁতরে খাল পার হচ্ছিলেন। সে সময় একটি কুমির তাঁকে আক্রমণ করে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় কুমিরটি ওই জেলের নিথর দেহ মুখে নিয়ে খালের বিভিন্ন স্থানে ভেসে বেড়ায়। ২০২৩ সালে খুলনার সুতারখালী নদীতেও একইভাবে এক মৎস্যজীবী কুমিরের পেটে যান।

বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের খালের পাড়ে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সহাবস্থান দিন দিন রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠছে। লোকালয় থেকে ধরে নেওয়া কুমিরগুলো বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে শিকার ধরতে না পেরে সহজ লক্ষ্য হিসেবে জেলেদের ওপর চড়াও হতে পারে। অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, কুমির বা বাঘের মতো হিংস্র প্রাণীর ব্যবস্থাপনায় কেবল আবেগ বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায়, লোকালয়ের বিপদ বনের মানুষের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দেখা দেবে।

সম্পর্কিত