সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশির মা

‘বিশ্বাস করতে পারতেছি না, এরা আমার সোনা বাজান’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নওগাঁ

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২০: ৫৬
মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বজনরা। সংগৃহীত ছবি
মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বজনরা। সংগৃহীত ছবি

‘ঘটনার কতদিন পর আজকা লাশ পাঠাইলো। এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুন আমার ছেলে দুটাকে কয়লা বানায়া দিছে। বিশ্বাস করতে পারতেছি না যে এরা আমার সেই সোনা বাজান।’

এসব কথা বলে আহাজারি করছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুন। তাঁর দুই ছেলে সুমন ও মোহন গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।

রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তাদের সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। তাঁরা হলেন—আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং উপজেলার পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাতজনের একসঙ্গে জানাজা হয়। জানাজা শেষে মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা।

গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে।

দুই ছেলের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরে ময়না খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে দুটো বলত, “মা আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। একসঙ্গে সুখে থাকব।” আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল।’

গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার মতো আর কারও কোল যেন খালি না হয়।’

গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে এতগুলো মরদেহ কখনো দেখিনি। এ ঘটনার পর থেকেই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উপার্জন সক্ষম ছেলেদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছে।’

উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেটাই আমাদের ভরসা আছিল। পেটের টানেই পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে!’

লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সংগৃহীত ছবি
লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সংগৃহীত ছবি

ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, ‘সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে! তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল?’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই আত্রাইয়ের। সৌদি কর্তৃপক্ষ বাকি পাঁচজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না করায় তাদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, ‘ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। আমার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছোঁয়াও পাব না? সরকারের কাছে আবদার, ছেলের লাশটা দ্রুত নিয়ে আসে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। অন্য মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান। ডিএনএ মিললে দ্রুত তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত