বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ২৫ বছর, বৈশ্বিক গবেষণায় যে চিত্র উঠে এল
১৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০২৬। এ উপলক্ষে সহস্রাব্দের শুরুতে ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিভিন্ন বাঁক ও পরিবর্তনের দিকে ফিরে তাকিয়েছে স্ট্রিম।
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি নড়বড়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে তুলনামূলক স্থিতিশীলতায় ফিরলেও গণতান্ত্রিক মানে ছিল চরম ওঠানামা। এ সময়ে অনুষ্ঠিত ছয়টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে ২০০১, ২০০৮ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনকেই কেবল আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য বিবেচনা করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘ, কার্টার সেন্টার ও এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসসহ (আনফ্রেল) আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, স্থানীয় গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের মূল্যায়নে এ তিনটি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল।
তবে ২০০৮ সালের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, বিরোধী দলকে বাইরে রাখা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের ফলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা দ্রুত ধসে পড়তে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে।
গতকাল ১৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০২৬। এ উপলক্ষে সহস্রাব্দের শুরুতে ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিভিন্ন বাঁক ও পরিবর্তনের দিকে ফিরে তাকিয়েছে স্ট্রিম।
বিএনপি, ২০০১–২০০৬: প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, তবে বিতর্কিত শাসন
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৯৩টি পেয়ে সরকার গঠন করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হলেও পাঁচ বছরের শাসনামল গণতন্ত্রের আদর্শ উদাহরণ ছিল না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই) ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ছিল এবং ২০০৫ সালে আফ্রিকার দেশ চাদের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকে।
২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনাকালে হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ২০০৪ সালে গুরুতর অপরাধ দমনে গঠিত হওয়া র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) পরবর্তী সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। এছাড়া নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের জেরে স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে এবং ২০০৭ সালের ১/১১-তে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।
ইআইইউর গণতন্ত্র সূচক
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গণতন্ত্র সূচক পাঁচটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করে স্কোর নির্ধারণ করে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্কোর ছিল ৬ দশমিক ১১, যা দেশটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ শ্রেণিতে রেখেছিল। অর্থাৎ সহস্রাব্দের শুরুতে বিএনপির সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ থাকলেও দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বড় ধরনের সংকট ছিল।
২০০৮ সালের নির্বাচন
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৩০ আসনে জয় পায়। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য এ নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন এবং টানা ১৫ বছরের শাসনের সূচনা হয়।
আওয়ামী লীগ, ২০০৯–২০১৩: শক্তিশালী নির্বাচনী ম্যান্ডেট, তবে সতর্ক সংকেত
২০০৮ সালে বাংলাদেশের ইআইইউ স্কোর ৫ দশমিক ৫২ থেকে ২০১৩ সালে বেড়ে ৫ দশমিক ৮৬ হলেও দেশটি ‘হাইব্রিড রেজিম’ শ্রেণিতেই থেকে যায়। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে থাকা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে, যা পরবর্তী সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
২০১৪: যে নির্বাচন বদলে দেয় রাজনৈতিক গতিপথ
২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসনে জয়ী হয় এবং ভোটার উপস্থিতি নেমে আসে ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশে। ইআইইউ স্কোর কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৮-এ এবং ২০১৭ সালে তা সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৪৩-এ নেমে আসে। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকরের পর ভিন্নমত দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়।
২০১৫–২০১৯: আওয়ামী লীগ আমলে গণতান্ত্রিক অবনতির চিত্র আরও স্পষ্ট
এ সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফ্রিডম হাউস বাংলাদেশকে ‘আংশিক মুক্ত’ এবং ভি-ডেম ইনস্টিটিউট ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচন: কাগজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাস্তবে একতরফা ফল
২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ জোট সংসদের ৯৫ শতাংশের বেশি আসনে জয়ী হয়। ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে বিরোধী দল ফল প্রত্যাখ্যান করে।
২০২০–২০২২: আওয়ামী লীগ আমলের শেষ পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্কোর
এ সময়ে ইআইইউ স্কোর বেড়ে ৫ দশমিক ৯৯ হলেও বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড রেজিম’-এর বাইরে যেতে পারেনি।
২০২৩–২০২৪: গণতান্ত্রিক অবনতি থেকে রাজনৈতিক পতন
২০২৩ সালে স্কোর নেমে ৫ দশমিক ৮৭ এবং ২০২৪ সালে নাটকীয়ভাবে কমে ৪ দশমিক ৪৪-এ দাঁড়ায়, যা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সীমারেখার খুব কাছাকাছি ছিল। বিরোধী দলের বর্জনে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের তদন্তে এ আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়।
ভি-ডেম: আওয়ামী লীগ আমল নিয়ে আরও কঠোর মূল্যায়ন
ভি-ডেম তাদের গণতন্ত্র প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়কে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্বৈরতান্ত্রিকীকরণের পর্ব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
ফ্রিডম হাউস
ফ্রিডম হাউসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪০ (আংশিক মুক্ত)। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৫ হলেও ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪৪-এ। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দেশটি এখনও ‘মুক্ত’ শ্রেণিতে উন্নীত হতে পারেনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বড় পতন
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬৫তম স্থানে নেমে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে ১৪৯তম হলেও ২০২৬ সালের সূচকে অবস্থান ১৫২তম। অর্থাৎ গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় টেকসই উত্তরণ এখনও ঘটেনি।
দুর্নীতি: সমস্যা আওয়ামী লীগ-পূর্ব এবং আওয়ামী লীগ-পরবর্তীও
বিএনপি আমলে বাংলাদেশ দুর্নীতি সূচকে তলানিতে থাকলেও আওয়ামী লীগের আমলেও এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হয়নি। ২০২৫ সালের সিপিআই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪ এবং অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম। ফলে দুর্নীতি কেবল কোনো একটি দলের সমস্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংকট।
বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ: সংখ্যাগুলো কী বলে
আন্তর্জাতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে কোনো একটি দলকে সরলভাবে ‘গণতান্ত্রিক’ আর অন্যটিকে ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রমাণের সুযোগ নেই। গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, সংকটের মূল বিষয় হলো ক্ষমতার পালাবদলের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, বিরোধী দলের কাজের সুযোগ, মানবাধিকার ও আইনের শাসন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ তাই ক্ষমতায় কোন দল রয়েছে—তার চেয়েও বেশি নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির ওপর।
.png)
-40e58c.jpeg)


-b04cb2-256x144.webp)

-3d2c06-256x144.webp)
